টুম্পা ভয় পাওয়া গলায় বলল, সমস্যা কোথায়?
তোমাকে বলেছি যে তোমার আব্বুর স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে। তার একটা ইলিউশন আছে যে তাকে কিছু মানুষ মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। আজকের ঘটনার পরে তোমার আব্বুর ধারণা একবোরে কনফার্ম হয়েছে। তার ধারণা–
কী ধারণা?
ডাক্তার সাহেব একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, আমি ঠিক কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না।
শুভ চৌধুরী একটু এগিয়ে এসে বললেন, আমি বলছি। তারপর টুম্পার দিকে তাকালেন। ডান হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো সোজা করতে করতে বললেন, দেখো মেয়ে আমি কোনো ভূমিকা না করে সোজাসুজি বলি। তুমি বুলবুলের মেয়ে, থাকো আমেরিকায়। দুইদিনের জন্যে দেশে বেড়াতে এসে বুলবুলের জীবন নষ্ট করার তোমার কোনো রাইট নাই।
ছোট খালা বাধা দিয়ে বললেন, আরে! আপনি কী বলছেন?
শুভ চৌধুরী চোখ কটমট করে ছোট খালার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখেন–আপনারা কোনো কথা বলবেন না। গত দশ বছর এই মানুষটার কেউ খোঁজ খবর নেয় নাই। খোঁজ নিয়েছি আমি। বুঝেছেন? তাই আপনারা বড় বড় কথা বলবেন না।
শুভ চৌধুরী টুম্পার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি সেদিনের বাচ্চা মেয়ে এখানে এসে বুলবুলকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেলে কোন সাহসে?
টুম্পার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। সে ফ্যাকাসে মুখে শুভ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রইলো। চৌধুরী বললেন, লাইফটা একটা নাটক না যে তুমি দুইদিনের জন্যে আমেরিকা থেকে এসে একটা পার্ট করে চলে গেলে। এই মানুষটাকে তোমরা কেউ দেখে রাখবে না। তাকে দেখে রাখব আমরা। কাজেই তোমরা যখন খুশি এসে তাকে নিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেলিং করতে পারবে না।
টুম্পা ফিস ফিস করে বলল, আই এম সরি।
শুভ চৌধুরী বলল, তুমি জান তুমি তোমার আব্বুর কতো বড় ড্যামেজ করেছ? চারজন মানুষ মিলে ধরে রাখতে পারে না। হাসপাতালের বেডে জন্তুর মতো দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়েছে। সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়েছে– ঘুম থেকে ওঠে কী করবে কেউ জানে না। ডু ইউ নো?
টুম্পার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি বের হয়ে গাল বেয়ে নিচে নেমে এল। শুভ চৌধুরী সেটা লক্ষ্য করল বলে মনে হলো না, নিষ্ঠুরের মতো বললেন, তোমার কী লাভ হলো? তোমার আব্বু নিজে এখন বিশ্বাস করে তুমি তাকে খুন করার জন্যে নিয়ে গেছো। তোমার মুখ দেখলে মানুষটা ভয়ে চিৎকার। করতে থাকে! এই সব কিছু হয়েছে তোমার জন্যে। বুঝেছ?
টুম্পা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরল, ডাক্তার সাহেব বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে যথেষ্ট হয়েছে।
না না যথেষ্ট হয় নাই। শুভ চৌধুরী রেগে ওঠে বললেন, দশ বছর কেউ মানুষটার কোনো খোঁজ নেয় নাই। এখন হঠাৎ করে এসে মানুষটাকে নিয়ে নাটক? শোনো মেয়ে, আমি তোমাকে স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই। হাসপাতাল থেকে বুলবুল যখন রিলিজ পাবে, সে যখন তার বাসায় যাবে আমি তোমাকে তার ধারে কাছে দেখতে চাই না। বুঝেছ?
টুম্পা হাত দিয়ে চেপে চোখ মুছতে মুছতে বলল, বুঝেছি।
তুমি তোমার আপুকে যদি শেষবার দেখে যেতে চাও, তাহলে যাও কেবিনের ভেতরে গিয়ে দেখে আস। যখন ঘুমিয়ে আছে তখন। মানুষটা জেগে উঠলে তুমি আর তার সামনে যেতে পারবে না– দড়ি দিয়ে একটা মানুষকে বেঁধে রাখলে মানুষকে কেমন দেখায় সেটাও তুমি দেখে আস।
টুম্পা মুখ তুলে সবার দিকে তাকাল, তারপর বলল, ঠিক আছে। আমি আপুকে গুড বাই বলে আসি।
সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, টুম্পা বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে কেবিনের ভেতর ঢুকে গেল। ছোট খালা ভেতরে ঢুকতে গিয়ে থেমে গেলেন, ভেতর থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। এই মায়াবতী মেয়েটির কষ্ট নিজের চোখে দেখতে চান না ছোট খালা।
১১. ফিরে আসা
সুমি টুম্পার হাত ধরে বসেছিল। দুজনে বারান্দায় বসেছে কারো মুখে কোনো কথা নেই। বাইরে অন্ধকারে নেমেছে, ওরা তবু কোনো আলো জ্বালায় নি। সুমি নরম গলায় বলল, টুম্পা আপু তুমি মন খারাপ করো ন। তোমাকে মন খারাপ করতে দেখলে আমার অসম্ভব খারাপ লাগে।
শোন সুমি, এরকম একটা কিছু হলে যেটুকু মন খারাপ হবার কথা তার থেকে আমি একটুও বেশি মন খারাপ করছি না।
টুম্পা আপু– সুমি নিচু গলায় বলল, ঐ লোকটা তোমাকে যে খারাপ খারাপ কথা বলেছে, তুমি সেটা নিয়ে মন খারাপ করো না।
টুম্পা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, লোকটা আসলে খারাপ খারাপ কথা বলে নাই। সত্য কথা বলেছে। কথাগুলো শুনতে খারাপ লেগেছে কিন্তু প্রত্যেকটা কথা সত্যি।
সুমি মাথা নাড়ল, বলল, না সত্যি না।
সত্যি। টুম্পা বলল, আমি এখানে থাকব না, এসেছি মাত্র কয়েকদিনের জন্যে আমার উচিত হয় নি আব্বুর সাথে এইভাবে জড়িয়ে পড়া। কিন্তু কিন্তু–তুইই বল, আমি যদি জানি আমার আব্বু এভাবে আছেন আমি তাহলে তার সাথে দেখা না করে থাকতে পারতাম? আর দেখা হলে তার সাথে না মিশে পারতাম?
না, পারতে না।
কিন্তু পারা উচিত ছিল। আব্বু তো আর অন্য দশটা মানুষের মতো না। আব্বু স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগী। আব্বুকে এভবে ঘর থেকে বের করে আনা ঠিক হয় নাই। আমি একবারও বুঝতে পারি নাই এই রকম কিছু হবে। সুমি তুমি বিশ্বাস কর যখন আমি দেখলাম আব্বুর মাথায় একটা রিভলবার ধরেছে, আমার যা ভয় লেগেছিল—
সুমি টুম্পার হাত ধরে বলল, কেন ওই কথাগুলোর কথা মনে করছ? ভুলে যাও টুম্পা আপু।
