টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। বাসায় গিয়ে তুমি এখন ঘুমাবে।
আব্বু বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন। ফিরে যেতে শুরু করায় একটু পরেই টুম্পা আবিষ্কার করলো সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। খানিকদূর গিয়ে বুঝতে পারলো ভুল রাস্তায় এসেছে তখন আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে নূতন করে রওনা দিতে হলো। খানিকদুর গিয়ে টুম্পার মনে হতে লাগলো রাস্তাটা অপরিচিত মনে হচ্ছে। টুম্পা তবুও আরেকটু এগিয়ে যায় অবাক হয়ে দেখে রাস্তাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে। আব্বু মনে হয় ঠিক বুঝতে পারছেন না, টুম্পার সাথে সাথে অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটছেন। টুম্পা তখন আবার ফিরে যাবার জন্যে রওনা দিতে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ কোথা থেকে কয়েকজন মানুষ ছুটে আসতে থাকে। তাদের ছুটে আসার ভঙ্গিটা দেখে টুম্পার বুকটা হঠাৎ ধ্বক করে ওঠে। সামনের মানুষটার হাতে একটা রিভলবার সেটা উঁচু করে রেখেছে। কিছু বোঝার আগইে মানুষগুলো তাদের দুজনকে ঘিরে ফেলল। রিভলবার হাতে মানুষটা আব্বুর বুকের কাপড় ধরে মাথার মাঝে রিভলবার লাগিয়ে চিৎকার করে বলল, যা আছে বের কর শূওরের বাচ্চা!
দুইজন এসে টুম্পাকে ধরে ফেলেছে, একজন তার গলায় লকেটটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে সেটা ছিঁড়ে নিয়েছে। টুম্পা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু টের পাচ্ছে ভয়াবহ একটা আতংকে তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন একটা চাকু বের করে তার গলায় ধরে বলছে, মোবাইল দে। মোবাইল দে ছেমড়ি।
টুম্পা কোনোমতে বলল, মোবাইল নাই।
খবরদার মিছা কথা বলবি না, জবাই কইরা ফালামু—
টুম্পা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই একজন তার আব্বুকে বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, মানি ব্যাগ বের কর–, আব্বু একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন, কপালের কাছে একটু কেটে গেল কিন্তু একটুও শব্দ করলেন না, তার চোখের মাঝে অদ্ভুত একটা শূন্য দৃষ্টি। মানুষগুলো আব্বুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলবারটা দিয়ে আব্বুর মাথায় মেরে বলল, মানিব্যাগ দে শূওরের বাচ্চা, দে মানিব্যাগ! আব্বু কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না– ঠোঁট দুটো শুধু নড়তে লাগলো।
টুম্পা টের পেলো কেউ একজন তার ব্যাগটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে নিয়েছে– খামচি দিয়ে তার চুল ধরে পিছনে টেনে নিতে গিয়ে ছেড়ে দিল। কিছু বোঝার আগে মানুষগুলো হঠাৎ করে তাদের ছেড়ে দিয়ে ধুপধাপ করে দৌড়ে চলে যেতে শুরু করে– টুম্পা তখনও পরিষ্কার করে কিছু বুঝতে পারছে না, মনে হয় একটা ভয়াবহ ঘোরের মাঝে আছে, মনে হচ্ছে বুঝি একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছে। টুম্পা তার আব্বুর কাছে গিয়ে আব্বুর হাত ধরলো, আব্বুর শরীর থরথর করে কাঁপছে, চোখ মুখে একটা অসহায় আতংক। কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে, মুখের একটা পাশ রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে। টুম্পা মুখ তুলে তাকালো, একটা গাড়ি আসছে, গাড়িটা তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল হঠাৎ করে থেমে গেল। দরজা খুলে একজন মানুষ নেমে এসেছে, অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে?
টুম্পা আব্বুকে ধরে রেখে বলল, আমার আব্বু– আমার আব্বু—
মানুষটা আবার জিজ্ঞেস করল, ছিনতাই?
টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল একটা ফোন করে দেবেন, প্লিজ?
মানুষটা পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল কত নম্বর? টুম্পা ছোট খালার নম্বরটা দেয়, শুধু এই নম্বরটা তার জানা আছে। মানুষটি ছোট খালার কাছে যখন ফোন করছে টুম্পা তখন তার আব্বুকে ডাকলো, আব্বু! আব্বু!
আব্বু মাথা ঘুরিয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন, টুম্পাকে দেখে হঠাৎ ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠে মুখ ঢেকে ফেললেন, মাথা নেড়ে বলতে থাকলেন, না—না-না।
আমি টুম্পা, অমি টুম্পা—
আব্বু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, চলে যাও–চলে যাও তুমি চলে যাও।
আব্বুর কথা শুনে হঠাৎ টুম্পার বুকটা ভেঙে গেল। তাকে তুমি করে বলছেন কেন? চলে যেতে বলছেন কেন?
গাড়ি থেকে নেমে আসা মানুষটা তার মোবাইল টেলিফোনটা টুম্পার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নাও। কথা বলো–
টুম্পা টেলিফোনটা হাতে নেয়, তাকিয়ে দেখে তাদের ঘিরে একদল মানুষের ভীড় জমে উঠছে। একটু আগে রাস্তাটা ফাঁকা ছিল, এখন হঠাৎ করে এতো মানুষ কোথা থেকে এসেছে? টুম্পা টেলিফোনটা হাতে নিতেই শুনতে পেল অন্যপাশ থেকে ছোট খালা চিৎকার করে বলছেন, কী হয়েছে টুম্পা? কী হয়েছে?
টুম্পা ভাঙ্গা গলায় বলল, ছোটখালা– তারপর ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগলো।
.
হাসপাতালের বারান্দায় টুম্পা দাঁড়িয়েছিল, টুম্পার হাত ধরে রেখেছে সুমি। টুম্পাকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন ভেতর থেকে ডাক্তার সাহেব, ছোট খালা, ছোট খালু, শুভ চৌধুরী এবং আরো দুয়েকজন বের হয়ে এলেন। টুম্পা একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, আব্বু কেমন আছেন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, ভালো।
মাথায় যে ব্যথা পেয়েছেন—
ডাক্তার সাহেব হাত দিয়ে ওটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ওটা খুব মাইনর একটু কাট। সারফেস উন্ড। ব্লিডিং হয়েছিল বলে সবাই ঘাবড়ে গেছে। কোনো স্টিচ পর্যন্ত লাগে নি।
টুম্পা বুক থেকে আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দেয়। ডাক্তার সাহেব বললেন, তবে–
তবে কী?
তোমার আব্বুর সমস্যাটা কিন্তু মাথার কাটাটা না। সমস্যা সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়।
