টুম্পা উজ্জ্বল মুখে বলল, তুমি সেটা ভাব আব্বু। আমি তো সেইটাই চাই।
সেটার জন্যে তো সময় লাগে।
তুমি সময় নাও আব্বু। তোমার যত সময় লাগে তুমি ততো সময় নাও। আমি তোমাকে তাড়াহুড়া করবো না।
আব্বু তখন ক্যানভাসটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, টুম্পা দেখলো তার আব্বুর চোখ জ্বল জ্বল করছে, ভুরুগুলো কুঁচকে আছে দেখে মনে হচ্ছে তার কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। টুম্পা ঠিক বুঝতে পারল না, সে কী না জেনে তার আব্বুকে কোনো বিপদের মাঝে ঠেলে দিচ্ছে?
আব্বু অনেকক্ষণ ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে তার বিছানায় বসে বললেন, পারছি না।
আব্বুর মুখ দেখে টুম্পার খুব মায়া হলো। টুম্পা বলল, থাক আব্বু আজ থাক। যখন তোমার ইচ্ছে করবে তখন তুমি আঁকবে।
আব্বু আবার আরেকটা নিঃশ্বাস ফেললেন, আগেরটা থেকেও বড়, তারপর বললেন, আমি মনে হয় আর কোনোদিনই ছবি আঁকতে পারব না।
কেন এরকম কথা বলছ আব্বু?
কততদিন আমি ছবি আঁকি না জানিস? জোর করে কী আর ছবি আঁকা যায়?
ঠিক আছে তোমার জোর করে ছবি আঁকতে হবে না। যেদিন তোমার ইচ্ছে করবে সেদিন আঁকবে। চল এখন আমরা বাইরে থেকে হেঁটে আসি।
আব্বু চোখ বড় বড় করে বললেন, হেঁটে আসি? বাইরে থেকে?
হ্যাঁ। তুমি কী সারা জীবন দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবে না। কী? তোমাকে ঘর থেকে বের হতে হবে না?
কিন্তু–
আব্বু আমি তোমার কোনো কিন্তু শুনব না। চল আমার সাথে। একটু হেঁটে আসি। তারপর কোনো এটা ফাস্টফুডের দোকানে বসে আমরা খাব। বাবা এবং মেয়ের নিরিবিলি লাঞ্চ!
আব্বু আবার বললেন, কিন্তু–
কোনো কিন্তু না। চল আব্বু চল। ঘর থেকে বের হলেই তুমি দেখবে আসলে তোমার সব ভয় হচ্ছে মিথ্যা।
টুম্পা শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি আব্বুকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে এল। অভ্যাস নেই বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে আব্বুর রীতিমতো অসুবিধে হচ্ছিল, টুম্পা সাবধানে আব্বুকে হাত ধরে নামালো। গেট খুলে বের হবার সময় টুম্পা লক্ষ করল আব্বু অল্প অল্প কাঁপছেন। টুম্পা আব্বুর হাত ধরে রাখে, হাতটি বরফের মতো ঠাণ্ডা। আবুকে ধরে ধরে টুম্পা রাস্তায় নিয়ে আসে। রাস্তার দুই পাশে দোকান, দোকানের ভেতরে মানুষ। ফুটপাথ ধরে মানুষ হাঁটছে। রাস্তায় রিকশা, সি.এন.জি. ক্যাব আর গাড়ি শব্দ করতে করতে যাচ্ছে সেগুলোর ভেতরেও মানুষ। আব্বুকে দেখে মনে হচ্ছে প্রত্যেকটা মানুষকেই আব্বু সন্দেহ করছেন, তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন তারা আব্বুকে খুন করতে চাইছে কী না। টুম্পা নরম গলায় আব্বুর সাথে কথা বলতে থাকে, বলে, আব্বু তুমি অনেক টেন্সড আপ হয়ে আছ। একটু রিলাক্স করো আব্বু, দেখো তোমার ভয়ের কিছু নেই। ঐ ছোট বাচ্চাটাকে দেখো আব্বু কতো কিউট, দেখেছ? এইটুকুন ছোট বাচ্চা পত্রিকা বিক্রি করছে, দেখে কী মায়া লাগে, তাই না? আমেরিকা থেকে এই দেশে এসে আমার সবচেয়ে বেশি অবাক লেগেছে কী জান? এই দেশে ছোট বাচ্চাদের কতো কষ্ট! খুব মায়া লাগে।
আব্বু টুম্পার কোনো কথা শুনছিলেন কী না বোঝা যাচ্ছিল না, টুম্পার হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকলেন। টুম্পা অনুভব করল আব্বু খুব ধীরে ধীরে একটু সহজ হয়েছেন। পুরো শরীরটা এতোক্ষণ শক্ত হয়েছিল শেষ পর্যন্ত সেটা একটু শিথিল হয়েছে, এতোক্ষণ মনে হয় নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিলেন, এখন সহজ ভাবেই নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। শুধু ভয়ে ভয়ে মানুষের মুখের দিকে না তাকিয়ে এখন অন্য সব কিছুই দেখছেন। একটা গরু হেলতে দুলতে যাচ্ছিল আব্বু খুব মনোযোগ দিয়ে সেটা দেখলেন এবং একটু হেসে ফেললেন। রাস্তার পাশে ময়লা জমে আছে সেখানে কয়েকটা কাক জোরে জোরে কা কা শব্দ করে ঝগড়া করছিল আব্বু সেটাও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। হাঁটতে হাঁটতে থেমে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর ইলেকট্রিক তারের দিকে তাকালেন, ঘরের কার্নিশে বসে থাকা চড়ুই পাখিগুলো দেখলেন। দেখে খুব মজা পেলেন বলে মনে হলো।
টুম্পা জিজ্ঞেস করল, আব্বু, তুমি কোথাও বসবে?
কেন?
তোমার তো হেঁটে অভ্যাস নেই। টায়ার্ড হয়ে যাও নাই?
না। টায়ার্ড হই নাই।
টায়ার্ড হলে বলো, তাহলে আমরা কোথাও রেস্ট নেবো।
ঠিক আছে, বলব।
দুজনে আরও কিছুক্ষণ হাঁটলো। রাস্তার পাশে একটা আধুনিক শপিং মল পাওয়া গেল। আব্বু ঢুকতে রাজী হচ্ছিলেন না টুম্পা বুঝিয়ে শুনিয়ে ভিতর নিয়ে গেল। ভিতরে ঢুকে অবশ্যি আব্বু খুব মজা পেলেন বলে মনে হলো, খুব আগ্রহ নিয়ে দোকানগুলোকে দেখলেন। একটা বইয়ের দোকানের ভেতরে সাহস করে ঢুকে অনেক সময় নিয়ে বইগুলো দেখলেন।
একটু পরে টুম্পার নিজেরই খিদে লাগতে লাগলো, সে আব্বুর হাত ধরে বলল, আব্বু খিদে লেগেছে।
খিদে লেগেছে?
হ্যাঁ আব্বু। খাব।
আব্বুকে একটু দুশ্চিন্তিত দেখায়, কোথায় খাবি?
এই যে বাইরে একটা ফাস্ট ফুডের দোকান আছে।
ফাস্ট ফুড? আব্বুকে দেখে মনে হলো আব্বু ফাস্ট ফুড কথাটাও ঠিক ভালো করে বুঝতে পারলেন না।
হ্যাঁ। ফাস্ট ফুড। আস আমার সাথে। টুম্পা তার আব্বুর হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। একটু হেঁটে ফাস্ট ফুডের দোকানটা খুঁজে বের করে দুজনে ভিতরে ঢুকলো। আব্বুকে এক জায়গায় বসিয়ে সে গেল খাবার আনতে।
.
দুজনে খেয়ে যখন বের হয়েছে তখন আব্বু বললেন, এখন বাসায় যাব।
