নিউ মার্কেট। এসবের জন্যে নিউ মার্কেট সবচেয়ে ভালো।
টুম্পা ছোট খালাকে বলল, আমাকে একটু নিউ মার্কেট নিয়ে যাবে ছোট খালা?
সুমি বলল, আমিও যাব তোমার সাথে।
রুমি বলল, তাহলে আমিও যাব।
টুম্পা একবার রুমির দিকে আরেকবার সুমির দিকে তাকিয়ে বলল, আই এম রিয়েলি সরি।
কেন তুমি রিয়েলি সরি?
কোথায় আমাদের সবাই মিলে কক্সবাজার রাঙ্গামাটি যাবার কথা, তার বদলে আমরা যাচ্ছি নিউমার্কেটে রং কিনতে!
না, টুম্পা আপু–
আমার খুব খারাপ লাগছে! তোমাদের সবার সব রকম প্ল্যান আমার জন্যে উল্টাপাল্টা হয়ে গেল।
সুমি বলল, না টুম্পা আপু, তুমি এরকম বলো না। কক্সবাজার রাঙ্গামাটি গেলে আমাদের যত আনন্দ হতো তোমাকে এতো খুশি দেখে আমাদের তার চেয়ে বেশি আনন্দ হচ্ছে।
ছোট খালু বললেন, সুমি কথাটা ভুল বলে নাই। ঠিকই বলেছে। আমরাও যদি কিছু করতে পারতাম তাহলে আরও ভালো লাগতো।
ছোট খালু, আপনাদের আর কিছু করতে হবে না। আমার এই সব সহ্য করছেন সেইটাই অনেক বেশি। থ্যাংকু। থ্যাংকু থ্যাংকু।
ছোট খালা ইলিশ মাছের আরেকটা বড় টুকরো প্লেটে নিয়ে বললেন, আরে এই মেয়েটাকে নিয়ে দেখি মহা মুশকিল। কথায় কথায় খালি বলে থ্যাংকু।
.
টুম্পা যখন ঘাড়ে করে বড় ইজেলটা নিয়ে ঢুকলো আব্বু একটু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন। টুম্পা বলল, দেখো তোমার জন্যে কী এনেছি।
আব্বুর চোখ কেমন যেন চক চক করে উঠলো। ইজেলটা ধরে তার উপরে হাত বুলালেন। টুম্পা বগল থেকে ফ্রেমে লাগনো ক্যানভাসগুলো নামাতে নামাতে বলল, কয়েক সাইজের ক্যানভাস এনেছি। তোমার যেরকম ইচ্ছা করবে সেরকম আঁকবে।
ইজেলের মাঝে মাঝারী সাইজের একটা ক্যানভাস লাগিয়ে বলল, এই দেখো কী সুন্দর। দেখলেই ছবি আঁকার জন্যে হাত চুলবুল করে, তাই না আব্বু?
আব্বু কোনো কথা না বলে সাবধানে ক্যানভাসের উপর হাত বুলালেন। টুম্পা তার পিঠ থেকে ব্যাকপেকটা নামিয়ে ভেতর থেকে এক্রেলিক রংগুলো বের করে বলল, বারোটা রঙয়ের একটা সেট এনেছি। ইন্ডিয়ান। দোকানদার বলেছে কোয়ালিটি না কী ভালোই, সবাই এগুলোই ব্যবহার করে। জার্মান রংগুলোর দাম অনেক বেশি।
টুম্পা চারটা আলাদা আলাদা সাইজের তুলি বের করে বলল, আব্বু এই তুলিগুলো এনেছি তোমার জন্যে। কাজ চলবে না?
আব্বু তুলিগুলো খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন, কোনো কথা বললেন না। টুম্পা ইজেলটা টেনে জানালার কাছে নিয়ে পর্দাটা টেনে দিতেই ঘরের ভেতর এক ঝলক আলো এসে ঢুকলো। আব্বু হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে দুইপা পিছিয়ে গিয়ে একটা ভয়ের মতো শব্দ করলেন। টুম্পা বলল, কী হয়েছে?
জানালাটা বন্ধ কর। কেউ দেখে ফেলবে।
কেউ দেখবে না আব্বু। আর দেখলেও কোনো ক্ষতি নেই।
কেন ক্ষতি নেই?
টুম্পা শান্ত গলায় বলল, আব্বু, তুমি তো খুব স্মার্ট একজন মানুষ, তাই আব্বু?
কেন?
তুমি আগে বল, তুমি স্মার্ট মানুষ কী না? যদি তুমি স্মার্ট না হতে তাহলে তুমি কী এতো বড় আর্টিস্ট হতে পারতে? এতো কম বয়সে জাতীয় পুরস্কার পেতে? বল।
এর সাথে স্মার্ট হওয়ার কোনো সম্পর্ক নাই।
আছে। টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, সম্পর্ক আছে। তোমার একটা জিনিষ বুঝতে হবে।
কী জিনিষ?
তোমার একটা অসুখ আছে সেইটার নাম স্কিৎজোফ্রেনিয়া। খুব ভয়ংকর অসুখ। তোমার সেই অসুখটা নিয়ে বাঁচা শিখতে হবে।
আব্বুকে কেমন জানি অসহায় দেখালো, মাথা নেড়ে বললো, টুম্পা, তোর কোনো কথা আমি বুঝতে পারছি না।
তুমি সব সময় বল তোমাকে সি.আই.এ. মার্ডার করার জন্যে আসছে। তুমি নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে তাদের দেখতে পাও। পাও না?
হ্যাঁ। দেখতে না পেলে কখনো বলতাম?
তোমার এখন বুঝতে হবে যে আসলে তারা নাই। তোমার তাদের দেখা পাওয়াটা হচ্ছে তোমার অসুখ। তোমার স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে বলে সেটা তুমি দেখো। এটাই তোমার অসুখ।
তুই কী বলছিস আবাল তাবোল?
আমি আবোল তাবোল বলছি না আব্বু, আমি একেবারে সত্যি কথা বলছি। তুমি যখন দেখবে কোনো সি.আই.এ. তোমাকে মার্ডার করতে আসছে তখন তুমি নিজেকে বলবে, আসলে এরা মিথ্যা। আমি এদেরকে দেখতে পাচ্ছি কিন্তু এরা মিথ্যা। আমার স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে বলে আমি এদেরকে দেখি। মিথ্যা মিথ্যা দেখি।
আব্বু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। টুম্পা আব্বুর হাত ধরে বলল, আব্বু। আমি তোমার মেয়ে। তোমাকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। অসম্ভব অসম্ভব ভালোবাসি। অমি কী তোমাকে মিথ্যা কথা বলব?
আব্বু মাথা নাড়লেন, বললেন, না। তাহলে? আব্বু কোনো কথা না বলে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। টুম্পা বলল, আব্বু, তুমি আমার কথা বিশ্বাস কর। আমি চাই তুমি আস্তে আবার নরমাল হয়ে যাও। হাসো, কথা বল, ঘর থেকে বের হওঁ, সবার বাসায় বেড়াতে যাও, আর সবচেয়ে বড় কথা– তুমি আবার ছবি আঁকা শুরু করো।
আব্বু একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। টুম্পা আব্বুকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি জানি তুমি পারবে আব্বু। তুমি পারবেই পারবে। তুমি চেষ্টা করো ছবি আঁকতে। নাও এই তুলিটা ধরো–।
টুম্পা আব্বু হাতে তুলিটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, বল তুমি আগে তোমাকে কোন রংটা গুলে দেব। বল।
আব্বু কিছু বললেন না তুলি হাতে সাদা ক্যানভাসটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ক্যানভাসে আঁকার আগে সেটা মাথার ভেতরে আঁকতে হয়। ছবিটার কথা ভাবতে হয়।
