আব্বু বললেন, সেটা তো জানি না।
টুম্পা প্যাকেটটা খুলে দেখালো, বড় এটা ড্রয়িং খাতা। তার সাথে অনেকগুলো নানা ধরণের পেন্সিল। টুম্পা খাতাটা তার আব্বুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নাও, আব্বু। এইটা তোমার জন্যে। তুমি এইটাতে ছবি আঁকবে।
আব্বু যেন খুব অবাক হলেন, বললেন, আমি?
হ্যাঁ। তুমি।
আব্বু খাতাটা হাতে নিয়ে একটা সাদা পৃষ্ঠা বের করে বসে রইলেন। টুম্পা আব্বুর হাতে একটা সিক্স বি পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাও আঁকো।
আব্বু অদ্ভুত ভাবে পেন্সিলটা ধরে বসে রইলেন, টুম্পা আবার বলল, কী হলো আব্বু, আঁকো।
কী আঁকবো?
তোমার যেটা ইচ্ছা।
আব্বু পেন্সিলটা হাতে নিয়ে কাগজে দাগ দেবার মতো ভঙ্গী করলেন। কিন্তু কোনো দাগ দিলেন না। টুম্পা বলল, কী হলো? আঁকছ না কেন?
পারি না।
পার না কে বলেছে। তুমি পার আমি জানি। ছোট খালার বাসায় তোমার আঁকা আমার একটা ছবি আছে। কী সুন্দর!
আব্বু মাথা নাড়লেন, বললেন, পারি না।
পার। তুমি চেষ্টা কর, আমি দেখি।
আব্বু আরেকবার পেন্সিলটা নিয়ে কাগজে দাগ দেবার ভঙ্গী করতে লাগলেন, কিন্তু কোনো দাগ দিলেন না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে হতাশ গলায় বললেন, পারি না।
কেন পার না?
জানি না।
আচ্ছা আব্বু আমি যদি তোমার জন্যে ক্যানভাস ইজেল রং তুলি আনি তাহলে তুমি ছবি আঁকবে?
আব্বু তার হাতের দিকে তাকালেন, তারপর টুম্পার দিকে তাকালেন, তারপর মাথা নেড়ে বললেন, আমি জানি না।
আব্বু তাহলে আমি ছবি আঁকি, তুমি দেখো। আমি যদি ভুল করি তাহলে তুমি ঠিক করে দাও। দেবে?
আব্বু কোনো কথা না বলে টুম্পার হাতে খাতাটা দিয়ে দিলেন। টুম্পা জিজ্ঞেস করল, কী আঁকব আব্বু?
তোর যেটা ইচ্ছা। টুম্পা ঘরের এদিকে সেদিকে তাকালো তারপর জানরার কাছে গিয়ে পর্দাটা টেনে দিলো, আব্বু ভয় পাওয়া গলায় একটা শব্দ করলেন। টুম্পা জিজ্ঞেস করল, কী হলো আব্বু?
জানালার পর্দা টেনে দে। তাড়াতাড়ি। দেখে ফেলবে। টুম্পা মাথা নাড়ল, বলল, না আব্বু। কিছু হবে না। কেউ দেখবে না। তুমি শান্ত হয়ে বস। আমি ঐ যে রাস্তাটার পাশে দোকানটা দেখেছ, সামনে কয়জন বসে চা খাচ্ছে সেইটা আঁকব। দেখেছ– একট কুকুর শুয়ে আছে, দেখেছ? কী সুন্দর!
আব্বু কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন, খপ করে টুম্পার কাধ ধরে ফেললেন। টুম্পা আব্বুর হাতটা ছুটিয়ে তাকে পাশে টেনে বসালো, বলল, আব্বু তুমি বস, তুমি দেখো আমি কেমন আঁকি।
আব্বু জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন, টুম্পা আর দেরি না করে পেন্সিল দিয়ে আঁকতে শুরু করলো। পেন্সিলের দু তিনটা টান দিতেই আব্বু কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন। টুম্পা ধীরে ধীরে ছবিটা আঁকতে থাকে আর আব্বু চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলেন। মাঝে মাঝেই হঠাৎ করে টুম্পাকে কিছু একটা বলতে যান কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলেন না। টুম্পা চোখের কোণা দিয়ে আব্বুকে দেখতে দেখতে ছবিটা আঁকতে থাকে।
ছবি আঁকতে তার কীই না ভালো লাগে! তার আব্বু পাশে বসে দেখবে আর সে ছবি আঁকবে এটা কী সে কোনোদিন কল্পনা করেছিল?
» ১০. ঘরের বাইরে
খাবার টেবিলে টুম্পার প্লেটে ছোট খালা একটা বড় ইলিশ মাছের টুকরো দিলেন, টুম্পা আপত্তি করতে গিয়ে থেমে গেল। তার ইলিশ মাছ খুব ভালো লাগে, কাটা বেছে খেতে খুব সময় লাগে তবুও সে ধৈর্য ধরে ইলিশ মাছ খায়।
সুমি বলল, টুম্পা আপু আজকাল রাত না হলে তোমার সাথে দেখা হয়
আই এম সরি–
সুমি বলল, না–না–তুমি সরি হবে কেন। মেজো খালুর সাথে তোমার দেখা হয়েছে শুনে আমাদের যে কী ভালো লাগছে। আমাদেরও মেজো খালুকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
আব্বুর সাথে দেখা করা এতো সোজা হবে না! স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে তো–খুব খারাপ অবস্থা!
রুমি বলল, দেখা না হলেও ঠিক আছে। তোমার কাছ থেকে গল্প শুনতেই এতো মজা লাগে আমার!
সুমি বলল হ্যাঁ। টুম্পা আপু তুমি এতো মজা করে গল্প করতে পার। আজকে কী হয়েছে বলবে আপু! সবকিছু
ছোট খালা একটা ধমক দিলেন, বললেন, মেয়েটাকে খেতে দে দেখি। সারাক্ষণ নিজেরাও বকর বকর করবি অন্যদেরকেও বকর বকর করাবি?
টুম্পা হেসে বলল, আমারও বকর বকর করতে খুব ভালো লাগে ছোট খালা?
এতো ভালো লাগিয়ে কাজ নেই, আগে খা। এখানে এসে যদি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাস তোর আম্মু আমাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।
টুম্পা মাথা নাড়লো, বলল, না ছোট খালা, আরও খুশি হবে। আমেরিকাতে শুকনা থাকা হচ্ছে স্টাইল। যে যত শুকনা সে তত সুন্দরী। কিন্তু তোমার সেইটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না– আমি রাক্ষসের মতো খাচ্ছি। শুধু যদি ইলিশ মাছে এতো কাটা না থাকতো–
দেব আমি কাটা বেছে?
না না ছোট খালা–
আমার সাথে ঢং করিস না। দে বেছে দিই–বলে সত্যি সত্যি টুম্পার মাছটা নিয়ে কাটা বেছে দিতে লাগলেন। সুমি আর রুমি চোখ বড় বড় করে টুম্পার দিকে তাকিয়েছিল, টুম্পা বলল, তোমরা এইভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছ কেন? আগে কখনো কাউকে মাছের কাঁটা বেছে দিতে দেখ নাই? নাকি তোমাদের হিংসা হচ্ছে।
রুমি মাথা নাড়ল, না টুম্পা আপু মোটেও হিংসা হচ্ছে না।
টুম্পা খুব সখ করে ইলিশ মাছ খেতে খেতে বলল, ছোট খালু, এখানে ভালো আর্ট সাপ্লাই কোথায় পাওয়া যায়?
ছোট খালু জিজ্ঞেস করলেন, কী রকম আর্ট সাপ্লাই?
আমি আব্বুকে দিয়ে ছবি আঁকানোর চেষ্টা করছিলাম, আব্বু দেখি কিছুতেই আঁকতে চান না। তাই ভাবছিলাম একটা ইজেল, কয়েকটা ক্যানভাস আর এক্রেলিক পেইন্ট কিনে দিই। সবগুলো রং থাকলে মনে হয় আঁকতে ইচ্ছে করবে। কোথায় পাওয়া যাবে ছোট খালু?
