আব্বু ইতস্তত করে বললেন, খিদে পেয়েছে?
হ্যাঁ।
তাহলে, তাহলে–কী করবেন বুঝতে না পেরে আব্বু এদিক সেদিক তাকালেন।
আমি কী ঠিক করেছি জান?
কী?
এই রাস্তার মোড়ে একটা ফাস্টফুডের দোকান আছে। সেখানে তুমি আর আমি খেতে যাব।
আব্বুর মুখ দেখে মনে হলো টুম্পা কী বলছে সেটা যেন বুঝতেই পারেন নি। আস্তে আস্তে বললেন, ফাস্ট ফুড?
হ্যাঁ আব্বু। অনেক মজার মজার খাবার আছে।
খাবার? হ্যাঁ। আব্বু, চল যাই।
আব্বু কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন, তুই কী বলছিস? আমি বাইরে যাব? আমি?
হ্যাঁ।
তুই জানিস না সি.আই.এ, আমাকে মারার জন্যে ঘুরছে?
আব্বু, এটা তোমার কাল্পনিক ভয়।
কাল্পনিক?
হ্যাঁ। তুমি শুধু শুধু এরকম একটা মিথ্যা ভয় পাও। আসলে কেউ তোমাকে মারার জন্যে ঘুরছে না।
আব্বু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন, ধীরে ধীরে কেমন যেন রেগে উঠলেন, ধমক দিয়ে বললেন, খবরদার। যেটা জানিস না সেটা নিয়ে কথা বলিস না। আমি কী বাচ্চা ছেলে নাকি যে কিছু বুঝি না? তুই জানিস আমি কী বিপদের মাঝে থাকি–
আব্বু! কেন সি. আই. এ তোমাকে মারতে আসবে? তুমি কী করেছ?
সেটাই তো আমি বোঝার চেষ্টা করি বুঝতে পরি না।
টুম্পা অনুনয় করে বলল, আব্বু, আমি তোমাকে বলছি, তোমার কিছু হবে না। শুধু একটু বের হব। এই রাস্তার মোড় পর্যন্ত গিয়ে আবার চলে আসব। সি. আই.এ র লোকেরা জানতেও পারবে না।
আব্বু বললেন, না। তারপর ওঠে গিয়ে জানালার পর্দা একটু ফাঁক করে উদ্বিগ্ন মুখে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
টুম্পা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে রইল।
.
ডাক্তার সাহেব চশমার উপর দিয়ে টুম্পার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তুমি বুলবুল রায়হানের মেয়ে?
জী।
আমেরিকা থেকে এসেছ?
কতোদিন থাকবে?
চার সপ্তাহ।
ও। ডাক্তার সাহেব একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি তো ছোট মেয়ে, তোমাকে ঠিক কী বলব বুঝতে পারছি না। বড় কেউ হলে সুবিধা হতো।
আব্বুর ফেমিলিতে বড় কেউ নাই।
টুম্পা বলল, আমাকে একটু বলবেন আব্বুর কী সমস্যা। সব সময়ে বলেন সি.আই.এ, তাকে মারতে আসছে। কেন এরকম একটা অসম্ভব জিনিষ বিশ্বাস করেন?
ডাক্তার সাহেব আঙুল দিয়ে টেবিলে ঠোকা দিতে দিতে বললেন, তোমার আব্বুর যে ডিজঅর্ডার সেটার নাম স্কিৎজোফ্রেনিয়া। এটাকে বলা যায় সবচেয়ে ভয়ংকর মানসিক ডিজঅর্ডার। কেন এটা হয় এখনো কেউ জানে না। এর মাঝে বায়োলজিকেল কারণ আছে আবার এনভায়রনমেন্টাল কারণ আছে—
ডাক্তার সাহেব অনেক্ষণ ধরে স্কিৎজোফ্রেনিয়া অসুখটার খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বললেন। টুম্পা তার কিছু বুঝলো কিছু বুঝলো না। ডাক্তার সাহেব যখন থামলেন তখন টুম্পা জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু আমি কী আব্বুকে বোঝাতে পারি না যে তাকে কেউ মারতে আসছে না। আসলে সব মিথ্যা—
আমি কী তোমাকে বোঝাতে পারব যে আমি মিথ্যা? পারব না। কারণ তুমি আমাকে দেখছ। আমার সাথে কথা বলছ। ঠিক সেরকম তোমার আব্বু সে-গুলো দেখেন, তাদের কথা শুনেন। কেমন করে অবিশ্বাস করবেন?
তাহলে কী কিছু করার নেই?
আজকাল ভালো ভালো ওষুধ বের হয়েছে। তাদের এংজাইটি কমিয়ে আনা যায়, ইফ ইউ আর লাকী তারা প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। ক্রিয়েটিভ কাজ করতে পারে–
আব্বু কী আবার ছবি আঁকতে পারবেন?
পারবেন না কেন? নিশ্চয়ই পারবেন। চেষ্টা করলেই পারবেন। আমার পরিচিত একজন স্কিৎজোফ্রেনিয়া পেশেন্ট ছিল–
ডাক্তার সাহেব সেই রোগীটার কথা বলতে লাগলেন, টুম্পা শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার আব্বু কী আবার ছবি আঁকতে পারবেন?
.
ফার্মেসি থেকে আব্বুর, ওষুধগুলি কেনার সময় দোকানদার জিজ্ঞেস করল, কার ওষুধ এইগুলি?
এটা কী রকম প্রশ্ন? কার জন্যে ওষুধ সেটা আবার কেন জিজ্ঞেস করবে, আমেরিকায় এরকম একটা প্রশ্ন কেউ কখনো করবে না। এখানে মনে হয় এটা বিচিত্র কিছু না, ছোটখালা বেশ সহজ ভাবেই বললেন, আমার দুলাভাইয়ের।
মাথায় গোলমাল? টুম্পার ইচ্ছে করল লোকটার মুখে একটা ঘুষি মারে, অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত রাখল। ছোট খালা এবারে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঘাড় ঝাঁকালেন।
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, অনেক কড়া ওষুধ। সময়মতো খেতে হবে। মিস যেন না হয়।
টুম্পা বলল, মিস হবে না।
আর ঘুম দরকার। অনেক বেশি ঘুম! ভালো মানুষের সাথে মাথা খারাপ মানুষের পার্থক্য হচ্ছে ঘুমে। ঘুম ইয়েস আর ঘুম নো—
টুম্পা ওষুধের প্যাকেটটা নিয়ে ছোট খালার হাত ধরে বলল, চল যাই।
লোকটা পিছন থেকে বলল, গরুর গোশত যেন না খায়। অমাবশ্যা পূর্ণিমা সাবধান।
টুম্পা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, বলল, আপনিও সাবধান। খালি অমাবশ্যা পূর্ণিমায় না আপনি তার মাঝখানেও সাবধান।
ছোট খালা টুম্পার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, কী হলো? তুই হঠাৎ খেপে গেলি কেন?
না ছোট খালা খেপি নাই। খেপলে লোকটার মুখে একটা ঘুষি মারতাম না? ঘুষি মেরেছি?
না। তা মারিস নি। টুম্পা ছোট খালার হাত ধরে বলল, ছোট খালা আমাকে আব্বুর ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসার জন্যে অনেক থ্যাংকু।
ছোট খালা হাত ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, কথায় কথায় তোর ঐ আমেরিকানদের মতো থ্যাংকু বলা বন্ধ কর দেখি।
.
আব্বু একটু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। টুম্পা প্যাকেটটা উঁচু করে বলল, বল দেখি আব্বু, এই প্যাকেটটার মাঝে কী আছে?
