আব্বু তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ফিস ফিস করে বললেন, তুমি টুম্পা না। আমার টুম্পা অনেক ছোট।
আমিও ছোট ছিলাম আব্বু। আমি অনেক বড় হয়েছি।
আব্বু দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন, টুম্পা অনুনয় করে বলল, আব্বু তুমি দরজাটা বন্ধ করো না, প্লিজ। আমি ভেতরে ঢুকবো না। এই দেখো আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।
আব্বু দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেলেন, আবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফিস ফিস করে বললেন, তুমি কেন এসেছ?
তোমাকে দেখতে।
আমাকে দেখেছ। এখন চলে যাও।
আমি আরো দেখতে চাই। টুম্পা অনুনয় করে বলল, আমি এখানে বসি?
আব্বু কোনো কথা বললেন না। টুম্পা নিজেই তখন সিঁড়ির উপর বসে গেলো। নরম গলায় বলল, এই দেখো আমি ভিতরে ঢুকছি না।
আব্বু এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন। টুম্পা বলল, আব্বু। তুমি একটা চেয়ার নিয়ে বস।
কেন?
আমরা দুইজন একটু গল্প করি।
আব্বু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর সত্যি সত্যি একটা চেয়ার টেনে এনে দরজায় বসলেন। টুম্পা তার আব্বুর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আব্বু, তুমি ভালো আছ?
আব্বু কোনো কথা বললেন না। টুম্পা আবার জিজ্ঞেস করল, ভালো আছ তুমি?
আব্বু মাথা ঝাঁকালেন, বোঝালেন ভালো নেই।
কেন তুমি ভালো নেই, আব্বু?
ঘুমাতে পারি না তো তাই।
কেন তুমি ঘুমাতে পার না?
সব সময় আমাকে খুব সাবধান থাকতে হয় তো সেইজন্যে। একটু থেমে যোগ করলেন, কেউ যদি চলে আসে।
টুম্পা অবাক হয়ে তার আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইলো। আহা! এই মানুষটি কোনো কারণ ছাড়া শুধু শুধু কী ভয়ানক একটা আতংকে থাকেন? টুম্পা নরম গলায় বলল, আব্বু।
আব্বু কোনো কথা না বলে তার দিকে তাকালেন। টুম্পা বলল, আব্বু, তুমি এখন একটু ঘুমাতে চাও?
কেন?
আমি বসে বসে পাহারা দেব, যেন কেউ না আসতে পারে।
আব্বু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন, পাহারা দেবে? তুমি?
হ্যাঁ।
কেন?
আমি তোমার মেয়ে, সেজন্যে। মেয়েরা সবসময় তাদের আব্বুদের কাছে থাকে। তাদের আব্বুদের পাহারা দেয়।
আপু অদ্ভুত একটা দৃষ্টিতে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, তুমি সত্যিই আমার মেয়ে?
হ্যাঁ আব্বু। তুমি দেখতে চাও?
কীভাবে দেখব?
আমাকে একটা কাগজ দাও। তোমাকে দেখাই—
কাগজ? কাগজ? আব্বুকে কেমন যেন বিভ্রান্ত দেখা গেল।
দাঁড়াও, আমার কাছেই কাগজ আছে। টুম্পা তার ব্যাগ থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে তার কোলের উপর রেখে হাতে একটা কলম নেয়, বলে, আব্বু, তুমি নড়বে না।
আব্বু অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন, টুম্পা কাগজে কলম দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করলো–দুই মিনিটের মাঝে ছবিটা শেষ করে সে উঠে দাঁড়ায়, একটু এগিয়ে গিয়ে তার আব্বুর হাতে কাগজটা দিয়ে বলল, এই দেখো।
কাগজটা হাতে নিতেই তার আব্বুর মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো, টুম্পা অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে! হাসিটি কী সুন্দর, একেবারে ছোট বাচ্চার মতো। এই প্রথম সে তার আব্বুকে হাসতে দেখলো, আব্বু মুখে হাসিটা ধরে রেখে বললেন, কী সুন্দর! এতো তাড়াতাড়ি তুমি আমার ছবি এঁকেছ?
হ্যাঁ আব্বু। স্ট্রোকগুলো কী পাওয়ারফুল। মাই গড।
আমি কেমন করে এঁকেছি জান?
কেমন করে?
কারণ আমি তোমার মেয়ে সেজন্যে! আমি এটা তোমার কাছ থেকে পেয়েছি।
আব্বু কেমন যেন অবাক হয়ে টুম্পার দিকে তাকালেন তারপর আস্তে আস্তে বললেন, তার মানে, তার মানে তুমি তুমি মানে তুই তুই আসলেই আমার মেয়ে?
হ্যাঁ আব্বু।
তুই একটু কাছে আয়–বলে আব্বু উঠে দাঁড়ালেন।
টুম্পা একটু এগিয়ে গেল, আব্বু খুব সাবধানে টুম্পার হাত একটু স্পর্শ করলেন, তারপর তার মাথায় হাত বুলালেন, তারপর তার থুতনিটা ধরে তার মুখটা উঁচু করে সেদিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে বললেন, তোকে যখন শেষবার দেখেছি তখন তুই এই এতোটুকু ছিলি।
আমার মনে নেই।
কীভাবে মনে থাকবে? তুই তখন মাত্র এইটুকুন। আব্বু খুব সাবধানে টুম্পার মাথায় পিঠে হাত রাখলেন, তাকে দেখে মনে হতে লাগলো একটু জোরে স্পর্শ করলেই টুম্পা বুঝি টুকটুক করে ভেঙে যাবে। টুম্পা ফিস ফিস করে বলল, আব্বু।
কী মা?
আমি তোমাকে একটু ধরি?
ধরবি? ধর।
টুম্পা তার আব্বুকে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগলো। আব্বু কেমন জানি ভয় পেয়ে গেলেন, টুম্পাকে টেনে সরিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, কী হয়েছে টুম্পা? কী হয়েছে?
টুম্পা চোখ মুছে বলল, কিছু হয় নি আব্বু। কিছু হয় নি।
পেট ব্যথা করছে?
টুম্পা হেসে ফেলল, না আব্বু।
খিদে লেগেছে?
না আব্বু খিদে লাগে নাই।
তাহলে তুই কাঁদছিস কেন?
আমি আর কাঁদছি না আব্বু। এই দেখো– টুম্পা তার চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করল।
আব্বু বললেন, হ্যাঁ। কাঁদিস না।
টুম্পা বলল, আব্বু, আমাকে ভেতরে আসতে দেবে না?
হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি ভেতরে আয়। এই দরজাটা বন্ধ করে দিই। পরে আমাদের দেখে ফেলবে।
কে দেখে ফেলবে?
বলেছি না? আব্বু গলা নামিয়ে বললেন, সি.আই.এ।
টুম্পা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এটাকেই নিশ্চয়ই স্কিৎজোফ্রেনিয়া বলে। অবাস্তব একটা জিনিস নিয়ে ভয়। যে জিনিসটাকে নিয়ে ভয় সেটা অবাস্তব হতে পারে কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি বাস্তব। আব্বুর মুখ দেখে সেটা বোঝা যায়।
টুম্পা আব্বুর পিছু পিছু ঘরে ঢুকলো। ঘরের সবগুলো জানালার পর্দা টেনে রাখা আছে। দিনের বেলাতেই ঘর অন্ধকার, মাথার ওপর একটা লাইট মিট মিট করে জ্বলছে। ঘরের দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে আঁকা বিচিত্র ছবি। ঘরে আসবাবপত্র বলে কিছু নেই, একটা খাটে অগোছালো বিছানা। এক কোণায় স্কুপ করে রাখা ময়লা কাপড়। একটা টেবিলের উপর কয়েকটা প্লেট আর বাটি সেখানে কিছু অভুক্ত খাবার।
