সাথে সাথে ফর্সা হাতটা ভেতরে ঢুকে সশব্দে দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেল। শুভ চৌধুরী টুম্পার দিকে তাকিয়ে দুর্বল ভাবে হাসলেন। আবার দরজায় শব্দ করে বললেন, দরজা খোলো বুলবুল। তোমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে?
ভেতরে দীর্ঘসময় কোনো শব্দ নেই, তারপর একটা ভয়ার্ত গলা শোনা গেল, কে?
দরজা খুললেই তুমি দেখবে।
না আমি দেখতে চাই না। তুমি চলে যেতে বলো।
তুমি আগে দরজা খুলে দেখো।
না। ভেতর থেকে প্রায় আর্ত চিৎকারের মতো শব্দ হলো, না। আমি দেখতে চাই না। তুমি চলে যেতে বল–চলে যেতে বল!।
শুভ চৌধুরী বললেন, ছিঃ বুলবুল, ছিঃ! এভাবে চিৎকার করে না। তুমি দরজা খোলো–দরজা খুললেই দেখবে তোমার মেয়ে দেখা করতে এসেছে।
কে?
তোমার মেয়ে।
প্রায় চিৎকার করে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলো, কে?
বলেছিতো, তোমার মেয়ে টুম্পা।
মিথ্যা কথা বলবে না শুভ। খবরদার তুমি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলবে না। খবরদার শুভ–খবরদার—
তুমি দরজা খোলো তাহলেই দেখবে। আমি মিথ্যা বলছি না। তোমার মেয়ে টুম্পা এসেছে।
টুম্পা?
হ্যাঁ টুম্পা।
টুম্পা?
হ্যাঁ বললাম তো, টুম্পা।
তুমি মিথ্যা কথা বল না শুভ, টুম্পাকে ওরা আমেরিকা নিয়ে গেছে, আমি জানি।
আমেরিকা থেকে টুম্পা এসেছে তোমার সাথে দেখা করতে। তুমি দরজা খুললেই দেখবে।
এতো ছোট টুম্পা কেমন করে আমেরিকা থেকে আসবে?
শুভ চৌধুরী হাসার মতো শব্দ করে বললেন, টুম্পা এখন আরো ছোট নেই বুলবুল। টুম্পা এখন বড় হয়েছে। দরজা খুললেই দেখবে।
না না না। ভেতরে হঠাৎ আর্ত চিৎকারের মতো শব্দ হতে থাকে, আমি দেখব না। দেখব না। চলে যাওয়া তোমরা চলে যাও। চলে যাও।
হঠাৎ করে ভেতরে ঝন ঝন করে কী একটা যেন ভেঙে পড়লো। শুভ চৌধুরী টুম্পার দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আজকে মনে হয় হবে না।
আমি একটু কথা বলি?
আমার মনে হয় এখন না বলাই ভালো।
আমার আব্বুর সাথে আমি দেখা করতে পারব না?
শুভ চৌধুরী ইতস্তুত করে বললেন, দেখতেই পাচ্ছ কাজটা কঠিন। অনেক কঠিন। আমরা চেষ্টা করব। ঠিক আছে? শুভ চৌধুরী টুম্পার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি মন খারাপ করো না টুম্পা।
ইয়েলো ক্যাবে টুম্পা নিঃশব্দে ছোটখালার কাছে বসে ছিল। শুভ চৌধুরী তার নিজের মতো করে চলে গেছেন, ছোট খালা টুম্পাকে নিয়ে বাসায় ফিরছেন। ক্যাবটি আসাদগেটের কাছে আসতেই টুম্পা বলল, ড্রাইভার ক্যাবটা ঘোরান।
ক্যাব ড্রাইভার অবাক হয়ে বলল, ঘোরাবো?
হ্যাঁ, কোথায় ঘোরাব?
যেখান থেকে এসেছেন সেখানে আমাকে নামিয়ে দেন।
ছোট খালা অবাক হয়ে বললেন, কী বললি টুম্পা?
হ্যাঁ ছোট খালা আমি যাব। টুম্পা ছোট খালার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাও। আমি আমার আব্বুর সাথে দেখা না করে যাব না।
কিন্তু– কোনো কিন্তু নেই ছোট খালা। টুম্পা তার ছোট খালার দিকে তাকিয়ে হাসলো, আমার আব্বু আমার সাথে দেখা করবে না এটা কী হতে পারে?
০৮. পরিচয়
টুম্পা খুব নিঃশব্দে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ভেতরে খুটখুট করে কিছু একটা শব্দ হচ্ছে, কিসের শব্দ কে জানে। টুম্পা বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে দরজায় ঠোকা দিলো, সাথে সাথে ভেতরের খুট খুট শব্দ বন্ধ হয়ে গেল, ভয় পাওয়া গলায় তার আব্বু বলল, কে?
টুম্পা বলল, আমি আব্বু। আমি টুম্পা।
টুম্পা? আব্বুর গলায় অবিশ্বাস, টুম্পা কে?
আমি তোমার মেয়ে আব্বু।
মিথ্যা কথা। আব্বু চিৎকার করে উঠলেন, সব মিথ্যা।
না আব্বু–টুম্পাও গলা উঁচিয়ে বলল, মিথ্যা না। সত্যি।
আমি জানি টুম্পাকে নিয়ে গেছে।
হ্যাঁ আব্বু। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। আমি এখন এসেছি। তুমি দরজা খোলো তাহলে তুমি দেখবে।
না।
প্লিজ আব্বু–তুমি দরজা খোলো।
না। তুমি চলে যাও।
টুম্পা কাতর গলায় বলল, কেন আমি চলে যাব?
আব্বু ভয় পাওয়া গলায় বললেন, আমি জানি তুমি কেন এসেছ। আমি সব জানি।
তুমি কী জান?
আব্বু দরজার কাছে এসে ফিস ফিস করে বললেন, আমি জানি তোমাকে ওরা পাঠিয়েছে।
কারা?
যারা আমাকে মারতে চায়!
কে তোমাকে মারতে চায়?
আব্বু গম্ভীর গলায় মাথা নাড়লেন, বললেন, আছে একজন।
টুম্পা নরম গলায় বলল, আব্বু আমি তোমার কাছে বসে থাকব, আমি কাউকে তোমার কাছে আসতে দেব না! তুমি একবার দরজা খুলে আমাকে দেখো, তোমার যদি ইচ্ছে না হয় তাহলে আমাকে ঢুকতে দিও না।
ঘরের ভেতর থেকে আব্বু কোনো শব্দ করলেন না। টুম্পা নরম গলায় বলল, তুমি না চাইলে আমি ভিতরে ঢুকব না। আব্বু। বিশ্বাস কর।
এবারেও ভেতর থেকে কোনো শব্দ এল না। টুম্পা বলল, তুমি শুধু একবার দরজা একটু খোলো, আমি তোমাকে শুধু একটু দেখতে চাই। তুমি আমার আব্বু, আমি তোমাকে কোনোদিন দেখি নাই।
ঘরের ভেতরে খস খস করে একটু শব্দ হলো। টুম্পা বলল, দরজা খুলো আব্বু, তুমি কি একবার তোমার মেয়েকে দেখতে চাও না?
ভেতর থেকে আব্বু বললেন, তুমি আমার মেয়ে না।
আমি তোমার মেয়ে। দরজা খোলো তাহলে দেখবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি ভিতরে ঢুকব না।
সত্যি?
সত্যি।
তাহলে তুমি দূরে দাঁড়িয়ে থেকো।
টুম্পা কয়েক পা পিছনে সরে গিয়ে বলল, এই দেখো আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
খুট করে দরজায় শব্দ হলো। তারপর খুব ধীরে ধীরে দরজাটা একটু খুলে যায়। সেখানে একটা মুখ উঁকি দেয়, ভীত, সন্ত্রস্ত একটা মুখ। মাথা ভরা এলোমেলো চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। গায়ের রং ফর্সা, চোখের নিচে কালি। টুম্পা হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে, এই মানুষটি তার আব্বু? তার এখনও বিশ্বাস হয় না সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
