আব্বু একটা জানালার কাছে গিয়ে পর্দা একটুকু সরিয়ে খুব সাবধানে বাইরে তাকালেন। মনে হলো খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছেন। টুম্পা আব্বুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী দেখো আব্বু?
আব্বু ফিসফিস করে বললেন, মানুষগুলো ঐখানে থাকে।
কোন মানুষগুলি?
সি.আই.এর মানুষগুলো। চুপি চুপি চলে আসতে চায়। আব্বুর মুখ গম্ভীর হয়ে যায়, সেইজন্যে সাবধানে থাকতে হয়। ঘুমাতে পারি না।
আব্বুর জন্যে টুম্পার এতো মায়া হলো সেটা বলার মতো না। আব্বুর হাত ধরে বলল, আব্বু তুমি এখন ঘুমাও। আমি পাহারা দিব যেন কেউ আসতে না পারে।
তুই পারবি না।
কেন পারব না?
ওরা খুব ডেঞ্জারাস, ওদের কাছে কতো কী থাকে তুই জানিস?
থাকলে থাকুক। আমি ওদেরকে কাছেই আসতে দিব না।
কীভাবে কাছে আসতে দিবি না?
আব্বু, আমি আমেরিকা থাকি তুমি ভুলে গেছো? ইংরেজিতে আমি এমন বকা দেব যে, পালাবার রাস্তা পাবে না!
আব্বু অবাক হয়ে বললেন, বকা দিবি? ইংরেজিতে বকা দিবি?
হ্যাঁ।
না, না, সর্বনাশ–ওরা খুব ডেঞ্জারাস। ওরা যদি টের পায় তুই আমার মেয়ে তাহলে তোরও অনেক বড় বিপদ হবে? আব্বুকে খুব দুশ্চিন্তিত দেখালো।
টুম্পা অসহায় বোধ করে। তার আব্বুর সাথে এরকম একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে তার কেমন যেন লজ্জা করে! নিজেকে কেমন যেন প্রতারক মনে হয়। তবু সে চেষ্টা করল, বলল, ঠিক আছে আব্বু, তাহলে আমি ওদেরকে কিছু বলব না।
সেটাই ভালো। দরজাও খুলবি না।
দরজা খুলব না।
যদি আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে—
তাহলে বলব তুমি এখানে থাকো না।
আব্বুর কাছে কথাটা পছন্দ হলো। বললেন, হ্যাঁ সেটাই ভালো।
টুম্পা তার আব্বুকে বিছানার দিকে টেনে নিয়ে বলল, তুমি এখন একটু ঘুমাও। আস। তোমার ঘুমানো খুব দরকার।
আব্বু টুম্পার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। টুম্পা জিজ্ঞেস করল, তুমি হাস কেন আব্বু?
তুই দেখি ডাক্তারের মতো কথা বলিস। সেও খালি বলে আপনি ঘুমাবেন। বেশি করে ঘুমাবেন।
তোমার ডাক্তারের নাম কী আব্বু?
জানি না। শুভ নিয়ে আসে। আমি ঢুকতে দিতে চাই না।
কেন ঢুকতে দিতে চাও না।
বলা তো যায় না–যদি সি.আই.এর লোক হয়।
টুম্পা বলল, ও!
আব্বু বললেন, খুব বিপদের মাঝে থাকি।
তুমি নিজে ডাক্তারের কাছে যাও না?
আব্বু ভয়ের ভঙ্গী করলেন, বললেন, সর্বনাশ! যদি দেখে ফেলে?
টুম্পা বলল, কারা দেখে ফেলে?
আব্বু বললেন, কারা আবার? সি.আই.এ।
টুম্পা বলল, ও! তারপর তার আব্বুর হাত ধরে তাকে বিছানার কাছে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে বলল, তুমি এখন একটু ঘুমাও। কোনো চিন্তা না করে ঘুমাও। আমি এইখানে বসে থাকব।
আমাকে না বলে চলে যাবি না তো?
না আব্বু। চলে যাব না।
টুম্পা তার আব্বুর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, তুমি চোখ বন্ধ কর। ঘুমাও।
আব্বু চোখ বন্ধ করলেন তারপর সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে গেলেন। টুম্পা তার আব্বুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটা কী সুদর্শন, চেহারাটা একেবারে শিশুর মতো! টুম্পার এখনো বিশ্বাস হয় না সে তার নিজের বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে!
আন্তু যতক্ষণ ঘুমালেন টুম্পা ততক্ষণ একটুও নড়লো না। আব্বুর ঘুমটা প্রথম দিকে ছিল একটু অস্থির, শুয়ে একটু ছটফট করলেন তারপর এক সময় শান্ত হয়ে ঘুমালেন। ঘণ্টা দুয়েক পর আবার ছটফট করলেন, এক সময় চোখ খুলে তাকালেন কিছু দেখলেন বলে মনে হলো না। বিড় বিড় করে কিছু একটা বললেন তারপর আবার ঘুমিয়ে গেলেন। ঘণ্টা দুয়েক পর যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন চোখ খুলে টুম্পার দিকে তাকিয়ে রইলেন, চোখের দৃষ্টিটা একটু অন্যরকম! টুম্পা ভয়ে ভয়ে ডাকলো, আব্বু।
আব্বু উঠে বসে হাত দিয়ে টুম্পাকে স্পর্শ করলেন, মনে হলো যেন পরীক্ষা করে দেখছেন টুম্পা কী সত্যিই আছে নাকি মিথ্যে। টুম্পা আবার ডাকলো, আব্বু।
আব্বু দুর্বলভাবে হাসলেন, বললেন, কোনটা যে স্বপ্ন আর কোনটা যে সত্যি বুঝতে পারি না। আমি ভাবছিলাম তুই বুঝি স্বপ্ন।
না আব্বু। আমি স্বপ্ন না। আমি সত্যি।
হ্যাঁ তুই সত্যি। আব্বু
বিছানায় পা তুলে গুটিশুটি মেরে বসে রইলেন। টুম্পা বলল, আব্বু তুমি হাত মুখ ধোবে না?
হাত মুখ ধুয়েছিলাম তো।
ঘুম থেকে উঠে আরেকবার ধুলে ভালো লাগবে। টুম্পা আব্বুকে ঠেলে বিছানা থেকে নামালো। বলল, যাও, গোসল করে ফেলো, যা গরম।
কে বলেছে গরম?
আমি তো আমেরিকা এসেছি। আমার অনেক গরম লাগে।
আমার গরম লাগে না।
আমি তোমার বাসাটা দেখি একটু। দে
খবি? আব্বু কেমন সন্দেহের চোখে তাকালেন, কেন দেখবি?
এমনি। তুমি কেমন আছ আমার দেখার ইচ্ছা করে না?
দেখ তাহলে।
টুম্পা তখন বাসাটা ঘুরে দেখলো। দুইটা রুম, একটা বাথরুম আরেকটা রান্নাঘর। রান্নাঘরে চুলার উপর একটা তোবড়ানো কেতলি। কিছু নোংরা বাসন। হতশ্রী বাথরুম–একটা প্লাস্টিকের বালতি কাৎ হয়ে পড়ে আছে। একটা শুকনো টুথপেস্টের টিউব আর পুরানো একটা টুথব্রাশ ছাড়া আর কিছু নেই। ঘরের মাঝে ইতস্তত বই ছড়ানো। কিছু বাংলা কিছু ইংরেজি। বইগুলোর কোনো মাথামুণ্ডু নেই, কোনোটা কবিতা, কোনোটা ধর্ম, আবার কোনোটা শিল্প ইতিহাস। টুম্পা তার জীবনে এরকম একটা হতচ্ছাড়া বাসা দেখে নি। তার আব্বু কীভাবে দিনের পর দিন এরকম একটা জায়গায় থাকেন, ব্যাপারটা চিন্তা করেই টুম্পার চোখে পানি চলে আসে।
