আর একজন বললো–আমাদের রাজকুমারের বিয়ের কথা নাকি?
বড়োগিন্নি বললো–হা, সে উৎসবও নিশ্চয়ই অনেকদিন মনে রাখার মতো হবে।
অন্য একজন বললো, বিয়ের ঘটকালি নাকি ব্রহ্মঠাকরুণ করছেন? তিনি নাকি নতুন আসা নিয়োগীমাস্টারের বোন?
একজন বললো, জোগাড়ে লোক বলতে হবে। কদিন আর এসেছে, এরই মধ্যে খোদ রানীমার দরবারে।
বড়োগিন্নি কেটে দিয়ে বললো–ওটা কী আর দরকারি কথা!
কেট কৌতূহল নিয়েই শুনছিলো। আলাপটা একটু ঘোরাপথে হচ্ছে বটে, হয়তো মাধুর্যকে এমনভাবে গভীর করাই উদ্দেশ্য। সে বললো–এ বিষয়ে আসল কথা নয়ন ঠাকরুণের কাছে জানা যাবে বোধ হয়।
অনেকেই এদিক ওদিক চাইলো যেন।
কিন্তু আলাপটা এগোলো না। পটপট চড়বড় করে বাজি ফুটে উঠতেই আতস দেখবার জন্য নিমন্ত্রিতদের অধিকাংশ দরবার-ঘরের বাইরে চলে গেলো। শুধু পটকা নয়, ফানুস, উই, ফুলেন তুবড়ি, রংমশাল। কেট বসে বসে দেখছিলো। কিন্তু রংমশাল যখন কখনো নীল, কখনো লাল, কখনো সবুজ আলোয় কাছের লোকগুলিকে রঙে স্নান করাচ্ছে, ভারি সুন্দর তো বলে সে উঠে দাঁড়ালো।
বড়োগিন্নি বললো–সামনের বড়ো জানলাটার কাছে গেলে আরো ভালো দেখা যাবে। এই বলে সে নিজেও তেমন একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
যারা বাইরে গেছে তারা বাইরে, ঘরে যারা ছিলো তারা কোনো না কোনো দরজা বা জানলার কাছে। কেট একটা জানলায় একাই ছিলো। আতসবাজি যখন জ্বলে ওঠে তখন যারা তৈরী করে তারাও অবাক হয়ে যায়।
হঠাৎ যেন কেউ পাশে এসে দাঁড়িয়ে, আরো ভালো করে দেখার জন্য, অথবা আনন্দের উত্তেজনায় কেটের হাতের উপরে হাত রাখলো।
একটু ফিরে দাঁড়ালো কেট। বাইরের রংমশালের আলো এসে পড়েছে মহিলাটির মুখে, সবুজ পান্নার আলো, কিংবা তা কি তার গলার পান্নার কণ্ঠীর থেকে? মাথায় ঈষৎ ঘোমটা, ঘোমটা ঘিরে রক্তলাল শাল। কী বলবে, কী বলা উচিত ভাবলো কেট এক মুহূর্ত। রংমশালটা নিবতে সাদা আলোয় চিনতে পেরে সে হেসে বললো–নয়ন-ঠাকরুণ?
নয়নতারা নিজের হাতের নিচে ধরা কেটের হাতটায় চাপ দিলো। বললো–এসেছেন শুনেছিলাম। অসুবিধা হচ্ছে না তো?
না। কিন্তু এদিকে ওদিকে চেয়ে আপনার প্রত্যাশা করছিলাম। কেট দু হাতে তার হাতের উপরে রাখা নয়নতারার হাতটাকে ধরলো। হেসে বললো–এখন তো অভিনন্দন নেওয়ার সময়, আমার অভিনন্দন নিন।
নয়নতারা একটু বিব্রত হলো। কেটের চোখের দিকে সে কিছুক্ষণ চাইলো। ঠিক এই সময়েই একটা বড়ো আকারের ফানুস উঠতে শুরু করায় তার সুবিধা হলো, সে বললো– ওই দেখন, ওই দেখুন, ভারি সুন্দর, নয়?
ফানুসটা অবাক করে দিয়ে, প্রথমে ধীরে ধীরে, পরে বেশ জোরে আর সোজা উঠে গেলো। কিন্তু আচমকা কেঁপেও গেলো।
কেট বললো–সংবাদ পেয়ে আমি যে কী সুখী হয়েছি, আমাদের দেশে হলে আপনার ঘোমটা সরিয়ে ওই সুন্দর গালে চুমু দিতাম।
কিসের সংবাদ? নয়নতারা জিজ্ঞাসা করলো, কিন্তু হঠাৎ যেন নিজেই কিছুটা আন্দাজ করলো, তার গাল দুটোর যতখানি চোখে পড়ে তা যেন রংমশালের আলো পেয়ে লাল হলো।
-কিংবা, কেট বললো, রাজকুমার নিজে বলেননি বলে আমাদের চুপ করে থাকা উচিত? কিন্তু আপনিও তো বলেননি।
সাঁ করে একটা হাউই উঠলো চমকে দিয়ে, দুম করে সেটা ফাটলো, লাল, নীল, সবুজ আলোর কয়েকটি বল শূন্যে নেচে নেচে ফেটে ফেটে আকাশকুসুম রচনা করলো, তারপর নক্ষত্ৰচুতির মতো নিবে নিবে খসে খসে পড়লো।
আর তাতেই যেন অন্ধকার হলো। তখন নয়নতারা যেন কারো ডাক শুনতে পেয়ে একটু গলা তুলে বললো, যাচ্ছি।
কেটের হাতের উপরে এবার একটু জোরে চাপ দিয়ে যেমন নিঃশব্দে এসেছিলো তেমনি চলে গেলো। তার শাড়ির মৃদু খসখস শব্দ হলো একটা।
.
০৪.
আতসবাজির কাছে আসতে হরদয়ালের আধ ঘণ্টা দেরি হলো। সে বাগচীকে দেখতে পেয়ে বললো– ডানকানের জন্য অপেক্ষা করতেই দেরি। এবার ওরা আসছে! দেখছি। সেই কীবল ছোকরা বোধ হয় কালীপূজা নিয়ে আরো ঠাট্টা করেছে।
বাগচীর সেই লাঞ্চের কথা মনে পড়লো যেখানে ডানকানের কালীপূজা নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। সে কুণ্ঠিত হয়ে ভাবলো বিষয়টাকে। ডানকান ক্রিশ্চান, তা মনেপ্রাণে না-হোক, এতদিন এ উৎসবে যোগ দিতো, এবার দিলো না। এটা কি কোনো নতুন পরিস্থিতির সূচনা? কিন্তু কী আশ্চর্য, তার চোখের সামনে একটা ফুলবাগান যা বিভিন্ন রঙের আলোর তৈরী। বাগানটা মিলিয়ে গেলো। হরদয়াল হাসিমুখে বললো–আপনি কী ঘুরে ঘুরে দেখেছেন? আসুন, আমরা রাজবাড়ির কাছে যাই।
তারা উঠে যেদিকে থিয়েটারের মঞ্চ সেদিকে হাঁটতে শুরু করলো। হরদয়াল বললো– মিসেস বাগচীও বোধ হয় ঘুরে ঘুরে দেখেননি?
তারা যখন কাছারির চত্বরের মাঝামাঝি হরদয়াল একজন দাসীকে দেখতে পেয়ে বললো–বাগচীসাহেবের মেম অন্দরে আছেন। তাকে বলো আমরা এখানে অপেক্ষা করছি।
গ্রামে মেমসাহেব তো একজনই, কাজেই খুঁজে বার করে সংবাদ দিতে দাসীর অসুবিধা হলো না। ফলে থিয়েটারের সামিয়ানার কাছাকাছি হরদয়াল এবং বাগচী পৌঁছতেই কেট এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিলো।
তখন হরদয়াল বললো–এবার একটা কথা বলি। যাঁরাই উৎসবে এসেছেন তাদের সকলেরই জলযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি ভাবছিলাম মিসেস বাগচী এবং আপনার জন্য সে ব্যবস্থাটা আমার কুঠিতে কেমন হয়?
কেট বললো–না না, এসবের জন্য আপনি ভাববেন না। এটা কিছু নয়। আলোটাই আসল।
