সন্ধ্যা থেকে আলো কিন্তু রাত যত বাড়ছে তত যেন উজ্জ্বলতর। যারা আগেও দেখেছে তাদের মনে হচ্ছে সেবার কাছারির বারান্দাগুলোতে, কামরায় কামরায়, রাজবাড়ির ঘরে ঘরে এত আলো ছিলো না। অন্যদিকে সেবারের দেওয়ানকুঠি যত উজ্জ্বল ছিলো এবার তা নয়। অনুমান সত্যই হবে। শিশাওয়াল তো এখনো ঘুরছে এখানে ওখানে তার সেই সাহেব সহকারী নিয়ে এখনো এখানে একটা বিচিত্র চেহারার ডোম, ওখানে একটা দেয়ালগিরি বসিয়ে চলেছে। কাছারি আর রাজবাড়ির মাঝের চত্বরে সেবার সামিয়ানার নিচে বেলদার ঝাড়ের আলো, সামিয়ানার থামে থামে হারিকেন ঝুলিয়ে বিদ্যাসুন্দরের পালা হয়েছিলো। এবার সেখানে থিয়েটারের মঞ্চ আলোয় ঝকঝক করছে।
একজন কর্মচারী কেটকে পথ দেখিয়ে রাজবাড়ির দিকে নিয়ে গেলো। বাগচী যেখানে বসলো কাছারির সেই ঘরে গ্রামের বিশিষ্টদের আসন। বাগচী যেন চোখ বুলিয়ে দেখলো, নিয়োগী সেখানে কোথাও আছে কিনা। নায়েবমশাই সেখানেই উঠে এলো, বললো–একটু বসে নিই, বুড়ো হয়েছি তো; কী বলে?
নায়েবমশাই বসতেই তার হুঁকাবরদার তামাক নিয়ে এলো। সে-ই বাগচীকে জিজ্ঞাসা করলো তাকেও তামাক দেওয়া হবে কিনা। বাগচী পাইপ বার করলো, হেসে বললো–আমার হুঁকো সঙ্গেই থাকে।
একজন অভ্যাগত জোতদার বললো– আমাদের এই গ্রামে আর একজনকে মাত্র এমন দেখা যেতো, শিরোমণিমশায়ের জ্যেঠা সার্বভৌমকে।
–তিনিও পাইপ নাকি? বাগচী জিজ্ঞাসা করলো।
–না, থেলো হুঁকো থাকতো সঙ্গে, কিন্তু তেমন নিটোল ছোটো খোলটি পাওয়া কঠিন। একজন রসিকতা করে বললো–কেউ জাত মেরে দেবে ভয় ছিলো নাকি?
সাধ্য কী? প্রথমজন বললো, ব্রাহ্মণের হুঁকোতেও খেতেন না। বলতেন উচ্ছিষ্ট উচ্ছিষ্টই, তা ব্রাহ্মণের হলেও।
নায়েব বললো–কড়া লোক ছিলেন। শুনেছি, নিজের গৃহবিগ্রহ নারায়ণের প্রসাদ ছাড়া অন্য পূজার প্রসাদও পেতেন না।
মনে হলো পূজার প্রসাদ দেবতার উচ্ছিষ্ট কিনা এ নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু কাছে পিঠে সদর-আমিন সোনাউল্লা কাজী ছিলো। পিছন থেকে সে বললো, তিনি কি–অর্থাৎতার কি ব্রাহ্মণী ছিলো না?
-তা ছিলো বৈকি?
–তাহলে আর উচ্ছিষ্ট মুখে না-দেওয়ার প্রতিজ্ঞা থাকে না, জী।
–মানে? নায়েব বললো–আ, সোনাউল্লা!
মুখের হাসি আড়াল করে নায়েব উঠে পড়লো। বললো, তুমি এদিকে আছো, সোনাউল্লা, আমি ওদিকে দেখি। যিনি যখনই যান, কিন্তু জলযোগ না করে নয়, দেখো।
কুল্লাযুক্ত শিরপেঁচ দুলিয়ে হেসে সোনাউল্লা জমিয়ে নেবে মনে হলো, কিন্তু একজন সোনাউল্লার কানে ফিসফিস করে বললো–মুসলমান জোতদাররা যেখানে জলযোগে বসেছেন সেখানে একবার যাওয়া দরকার। কিছু ত্রুটি থাকায় তারা মুখ টিপে হাসছেন। সুমারনবিশ ঠিক পারছেন না। পীরজাদা আপনাকে বলতে বললেন।
ঠিক এই সময়েই, সদর-দরজার পাশে পটপট দুমদুম শব্দ হলো। মঞ্চের সামনে যারা হৈ-হুঁল্লোড় করছিলো সেই ছেলের দল হো হো করে ছুটলো সদর দরজার দিকে। কাছারির বারান্দায় ভিড় করে দাঁড়ালো অনেকে। রাজবাড়ির আলোর মালার নিচে নিচে নড়াচড়া দেখে বোঝা গেলো সেখানেও আতসবাজি দেখার জন্য ভিড় হয়েছে।
একতলার হলঘরে, যাকে দরবার-হলও বলা হয়, সেখানেই মহিলা অভ্যাগতদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা। সেখানে তেমন ভিড় ছিলোনা। কারণ সেখানে কিছুক্ষণ থেকেই মহিলারা প্রতিমা দেখতে অথবা জলযোগের ঘরে সরে যাচ্ছে। তাহলেও দরবার-ঘরের সৌন্দর্য, বিশালতা ইত্যাদির আকর্ষণ আছে। কিছু কিছু স্ত্রীলোকের যাওয়া-আসা ছিলোই। বিশেষ তারা তো ছিলোই যাদের সকলের পরনে একই রকম লালপাড় শাড়ি এবং গায়ে রেশমের চৌখুপি বোড়। কেট বুঝলো, এরা কর্মচারী। সে ঘরে একজন বর্ষীয়সীরই প্রাধান্য। কেটকে সেই কর্মচারী তার কাছে এনে উপস্থিত করে চলে গিয়েছিলো। কেট অনুমান করেছিলো, রানী অবশ্যই নয়, কারণ সেই বর্ষীয়সীর কপাল-ছোঁয়া সাদা চুলে ওড়া করে দেয়া সিঁদুর; পরনে হালকা রঙের হলেও উজ্জ্বল ব্রোকেড এবং কণ্ঠা থেকে বুক-ঢাকা। অলঙ্কার স্তরে স্তরে যেন ব্লাউজের কাজ করছে।
লোকের কথায় ঠাহর করলো কেট উনি বড়োগিন্নি। ইংরেজিতে তর্জমা করে অনুমান করলে চিফ মেট্রন হবে। তার অবশ্যই জানার উপায় ছিলো না তিনিই দোর্দণ্ডপ্রতাপ নায়িব-ই-রিয়াসতের স্ত্রী।
কেটকে তার পাশের শোফায় বসতে বললেন।
কেটের সঙ্গে গ্রামের কজনেরই বা পরিচয়! কিন্তু সে তো কৌতূহলের বিষয়। কাজেই তার চারিদিকে কিছু ভিড় হলে আবার।
যখন কেট বললো–আপনিই বড়োগিন্নি? তখন এই ভাষা শুনে এমনকী বড়োগিন্নির দূরে সরে যাওয়া দৃষ্টি যেন হেঁটে এসে কেটের সিঁদুরহীন কপালে দস্তানায় ঢাকা পুরো বাহুতে পড়লো। কিন্তু বড়োগিন্নির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেলো যখন তার সেই অনুত্তেজিত মুখে, বয়স এবং সাদা চুল সত্ত্বেও, ব্রীড়ার গভীর রং দেখা দিলো।
বড়োগিন্নি বললো–রানীমা বড়োগিন্নি বলেন। আসলে আমি গোবর্ধনের মামী। আমি কি আপনার নাম জানি?
কেট বললো–ক্যাথারিন।
বড়োগিন্নি বললো– সুন্দর নাম। ভারি সুন্দর নাম। তা, শাড়ি পরে গণেশ কোলে বসলে কাত্যায়নীর মতোই দেখাবে।
হলঘরের ভিতরে এবং বাইরে সবকিছুই উৎসবের কথাই মনে করিয়ে দিতে থাকে। গতবার, তার আগেরবার কেমন হয়েছিলো এসব আলোচনা শুরু হলো।
একজন বললো–কিন্তু যা আসছে তার তুলনায় এ কিছুই নয়।
