হরদয়াল বললো–আপনাদের বিশেষ ব্যবস্থা নায়েবমশায় নিশ্চয়ই করে রেখেছেন, তার বদলে যদি আমার কুঠিতে একটা ছোট্ট ডিনার-জাস্টটু কিপ এ লোশলি ব্যাচেলর কম্পানি?
বাগচী হেসে ফেলো। এরপরে আর আপত্তি করা চলে না। নটায় সে ডিনার হবে স্থির করে তারা আলোকজ্জ্বল প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেলো।
তারা একটা উঁচু আলোকিত খিলানের পথে এসে পড়লো। এরকম খিলান আরো আছে, সেগুলোর নিচে দরজা এবং সম্মুখে সিঁড়ি, এটার তলায় একটা প্রকাণ্ড ঝাড় যা নিচের পথটাকে আলোকিত করে রেখেছে। হরদয়াল বললো–এদিকেই পূজা।
বাগচী বললো–দেখবার মতো কাছে যাওয়া যায় না-ছুঁয়ে? যাবে কেট। মনে করো ডানকান বেকায়দায় একবার কালীপূজা করেছিলো।
এরপরে যা ঘটলো তা ইতিহাসের পক্ষে অপ্রয়োজনের। তারা কাছাকাছি যেতে যেন জোড়ায় জোড়ায় অনেকগুলো ঢাক বেজে উঠলো। নাচছে ঢাকীরা। ঢাকের উপরে চামরগুলো তালে তালে নাচছে, লাফাচ্ছে, ঢাকীদের মাথায় বাঁধা রঙিন নতুন গামছার পাগ। দুলছে। প্রতিমার দালানে আলোয় আলোময়। প্রতিমার দালানের মুখোমুখি রকে অনেক স্ত্রীলোকের ভিড়। তাদের রেশমে আর সোনারূপায় আলো পড়ছে। তারা থেকে থেকে বহু কণ্ঠে উলু দিয়ে উঠছে। সেই রক আর প্রতিমার দালানের মাঝখানে নিচু গলিপথ। সেই পথে অনেক পুরুষ। তারা যুক্তকরে প্রতিমার মুখের দিকে চেয়ে। প্রতিমার দালানে লোহার রেলিংয়ে দুটি ভাগ, তা যেন প্রতিমাকে কিংবা পূজার স্থলকে পৃথক করেছে। সেই ঘেরের বাইরে একজনমাত্র মহিলা যার পরনে দুধ-শাদা গরদের থান, যিনি প্রতিমার মুখের দিকে মুখ করে স্তব্ধ। ঘেরের এপারে নামাবলি গলায় দুজন পুরুষ, যারা নিশ্চয় পুরোহিত এবং তন্ত্রধার, এবং চার-পাঁচজন মহিলামাত্র। তারা একটা চালনে প্রদীপ ইত্যাদি রেখে চার পাঁচজনে একসঙ্গে ধরে প্রতিমার মুখের কাছে তুলছে, পায়ের কাছে নামাচ্ছে। কেট একটু ঠাহর করে তাদের মধ্যে বড়োগিন্নিকে দেখতে পেলো।
তারা অবশেষে সেই চালন পূজার ঘেরের মধ্যে একপাশে রেখে বেরিয়ে এলো। কেট অবাক হলো দেখে বড়োগিন্নি মুখে আঁচল দিয়ে নিঃশব্দে ফুলে-ফুলে কাঁদছে। কেট বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা না করে পারলো না।
হরদয়াল বললো–এসব আমরা বুঝি না। হয়তো মেয়ে বাড়িতে আসছে এরকম অনুভব করছেন। হয়তো সঙ্গে-সঙ্গে নিজের দুঃখের কথাও সেই মেয়েকে বলতে চাইছেন। বোধ হয় উনি নায়েবমশায়ের স্ত্রী।
কিন্তু আলোর প্রদীপমালার মধ্যে যে মধ্যমণির মত, যার সামনে দুজন পুরুষ অতি সন্ত্রস্তভাবে পূজার উপকরণ নামাচ্ছে, যা একইসঙ্গে সুন্দর, ভয়ঙ্কর, হাস্যময়ী, লোলজিহ্বা, লজ্জিতা অথচ দিগম্বরী।
কেটের মুখ নীল হয়ে উঠলো। সে বিড়বিড় করে কিছু বললো।
হরদয়াল কী লক্ষ্য করছে তা সবসময়ে বোঝা যায় না। বাগচী কথা বলার জন্য কেটের মুখের দিকে চেয়েছিলো। সে বললো–তোমার কি গরম লাগছে ডারলিং, এই শীতেও অনেক প্রদীপে জায়গাটা গরম।
হরদয়ালও বললো–হ্যাঁ চলুন, আমরা ফাঁকা জায়গায় যাই।
রাজবাড়ির বাইরে কাছারির দিকে আতসবাজি তখনো। কিন্তু লোক-চলাচলে অনুমান উৎসবের টান এখন অন্যদিকে। তাদের পথনাটকের সামিয়ানার পাশ দিয়ে। শুধু ভিড় নয়, বাজনাও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বেহালা, সারেঙ্গী কে কে করছে, সানাই বাঁশি বাজছে, ডোল তাল ঠুকছে, সব মিলে একটা পরিচিত সুরের দিকে, কিন্তু তুলনায় শব্দ বেশি।
আড়াআড়ি ঘাসে-ঢাকা চত্বর পার হয়ে সামিয়ানার কাছে যেতেই সেদিকের এক কর্মকর্তা আসুন হুজুর; আসুন স্যার; আসুন ম্যাডাম বলে অভ্যর্থনা করলো।
সামিয়ানার নিচে মঞ্চের সামনে ডাইনে-বাঁয়ে কিছু নিচু সুদৃশ্য কৌচ। তারপর থেকে চেয়ার ও বেঞ্চ। সামনের সারিটা উচ্চস্তরের জন্য বোঝা যায়। রাজকুমার আসেননি। অভ্যর্থনাকারী হরদয়াল প্রভৃতিকে সেদিকে নিয়ে গেলো। দেখা গেলো, বাঁদিকের একটা কোচে নায়েবমশাই একা বসে, তার মুখে বিড়ম্বনা।
হরদয়াল এবং বাগচী দম্পতী বসলে নায়েবমশাই বললো–তবু যা হোক, একা ভয়ই করছিলো।
হরদয়াল হেসে বললো– রাজবাড়ির প্রাচীরের মধ্যে কী ভয়?
কিন্তু দারুণভাবে কনসার্ট বেজে ওঠায় কথা বলার সুবিধা থাকলো না। কিন্তু বাজনাটা দপ করে থামলো। তখন সেই অভ্যর্থনার কর্মচারী বললো–আর একবার ছোট্ট একটু বেজেই পর্দা উঠবে।
সেই অবসরে হরদয়াল বললো–কী নাটক হচ্ছে শেষ পর্যন্ত?
নায়েব বললো– কী যেন, একেই বলে বুড়ো শালিখ।
অভ্যর্থনাকারী বললো–আসলে নায়েবমশাই কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না দুটো নাটক।
নায়েব বললো–বেশ করেছে, বাপসকল, টাকাটা যে খরচা করলে তার যেন মান থাকে।
হরদয়াল হেসে বললো–অনেক চাইছে বুঝি?
-আর বলেন কেন? পোশাক রে, পরচুলা রে, রং রে, আবার কী ছিন-ছিনারি! তা পটো এঁকেছে ভালো। আর এবারে শিশাওয়ালও মজা পেয়েছে। সেও সব ঘোমটা পরা আলো দিয়েছে শুনি। ঠাহর পাচ্ছি না, কত বা হাঁকে।
সেই ছোটো বাজনা বেজে উঠলো। নায়েবমশায় আর হরদয়ালের গড়গড়া এসে গেলো তাদের হুঁকা বরদারদের হাতে। এটুকু করতে না-পারলে তাদের আর চাকরি কীসের? এখন বেশি আলাপের সময় নয়, সিন উঠে গেলো। নাটকটা মনে হচ্ছে প্রহসন। নাট্যকার যেভাবে হাসাতে চেয়েছিলো হাসিটা তা থেকে স্বতন্ত্র ধরনের হতে লাগলো মাঝে মাঝে। স্ত্রীচরিত্রে অভিনেতা এক ছোকরা পরচুলা নিয়ে ফ্যাসাদ ঘটাতে না-ঘটাতে, তার বক্তব্য অন্যে বলে ফেলে জিভ কাটালো। কথা শেষ করার আগেই কেউ নেপথ্যে গিয়ে ওদিকের তাড়া খেয়ে গলা বাড়িয়ে বক্তব্যের বাকিটুকু বলে দিলো। তা সত্ত্বেও ব্যাপারটার অভিনবত্ব দর্শকদের টানছে।
