এটা সে সময়ের একজনের চিন্তার প্রতিচ্ছবি হতে পারে, ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রের এক পাশ। এমনও বলা যায়, বাগচী উৎসবে যোগ দেওয়া স্থির করেছিলো বলেই তার চিন্তা এই পথে চলেছিলো; নিয়োগী উৎসবে যোগ দেবে না বলেই রায়তদের কথা তুলেছিলো।
বাগচী পায়ের শব্দে মুখ তুলে দেখলো, বসবার ঘরে যেখানে বেশ খানিকটা রোদ এসে পড়েছে সেখানে কেট চেয়ার টেনে কিছু করছে। সে আবার মনে মনে হাসলো, ওয়েল, ওয়েল, এটা সেই এমারেল্ড গাউনটা। ক্যাপ আর গ্লাভস, দ্যাখো, গ্লাভসটাও এমারেল্ড! আর সব ঢেকে গাঢ় নীলের এই ক্যাপটা থাকবে কেটের। এটা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, দারুণ সাহসী পদক্ষেপ এটা কেটের এই নিজে থেকে উৎসবে যাওয়া। কিন্তু পদক্ষেপটা কোন দিকে? কেট তার হালকা নীল সোয়েডের উঁচু গোড়ালির জুতোজোড়া রোদে দিতে। এসে থমকে দাঁড়ালো। বিবর্ণ হলো তার মুখ। বাগচীও উৎকর্ণ হয়েছিলো। হেসে বললো, ঢাক বলে। বোধ হয় একসঙ্গে একশোটা।
.
০২.
একশো না-হোক পঞ্চাশ হতেই পারে। পূজার বা উৎসবের অঙ্গ হিসাবে না-হতে পারে, হয়তো তারা এতক্ষণ পুরো দলটা একত্র হয়েছে বলেই তারা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠে ঢাকগুলোর মাথায় খাড়া করা চামর দুলিয়ে, দুলে দুলে, বাতাসে হেলান দিয়ে জোড়কাঠিতে তেহাই দিয়ে হাসি হাসি মুখে পরস্পরের ওস্তাদির তারিফ করলো।
তা হতেই পারে। পূজা তো সেই মাঝরাতে, উৎসব শুরু হয়েছে ভোরের সানাইয়ে। সন্ধ্যায় তা হাউই, তুবড়ি, রংমশালের ঝাড়ে উৎসারিত হবে! হাউই-তুবড়ির উচ্ছ্বাস মিটতে মিটতে কাছারির চত্বরে শুরু হবেনাকি ঠিয়াটার যা কলকেতায় হচ্ছে। ভিনগ্রামের আমন্ত্রিতরা। আগেই জলযোগে বসে যাবে কাছারির ঘরে ঘরে, এমনকী অন্দরেরও কোনো কোনো হলে। রাত গম্ভীর হবে ক্রমশ, ফেলিসিটারের চেষ্টা সত্ত্বেও অভিনয়ের আসর ছাড়া অন্যত্র আলোগুলো লালচে হয়ে আসতে থাকবে। আর তখন অন্দরে যাওয়ার পশ্চিমের খিলানের ওপারে একটা স্তিমিত ঔজ্জ্বল্য দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আর সেখানে তখন সারাদিন এখানে ওখানে কারণে-অকারণে চমকে দিয়ে যে ঢাকগুলো বেজেছে সে সবগুলো একসঙ্গে বেজে উঠবে, পুরোহিতের উচ্চকণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণ শোনা যাবে, আর তা ছাপিয়ে কারো কারো মা মা ডাক।
সকাল থেকে শুরু, মাঝরাত অবধি ভিড়। সে ভিড় বাড়ে, কমে, সরে, নড়ে, আর তাতে বোঝা যায় উৎসবের কোন অংশ কোথায় গুরুত্ব পাচ্ছে। আর ভিড়ও উৎসবকে মনে করিয়ে । দিচ্ছে, তা সারাদিন ধরেই। কর্মচারী, দাসদাসী, বরকন্দাজ, বরদার, এরা তো ভিড়ের সর্বত্রই, সকলেই সজ্জিত। তাদের পরনে নতুন কোরা ধুতি শাড়ি, পুরুষদের মাথায় নতুন গামছা, কারো মাথায় তা পঙ্গু করে বাঁধা। দাসীদের মুখ পানে রাঙা, পায়ে আলতা, তাদের অনেকেই রেশমী ধাকড় পেয়েছে, কেউ কেউ পশমী বনাতও।
উৎসবের আসল ব্যাপারটা অর্থাৎ যেখানে পূজা সেখানে সকাল থেকে ভিড়ের চেহারা স্বতন্ত্র। উঁই করা ফুল বেলপাতা প্রকাণ্ড রূপার পুষ্পপাত্রে বেছে দেখে সাজানো হচ্ছে। ডাঁই করা আনাজ তেমনি প্রকাণ্ড পিতলের কাঁসার পরাতে। চাল, ডাল, মশলার স্তূপগুলোকে ঝেড়ে বেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া চলছে। হাত চলেছে, মাথা দুলছে, কোথাও চুড়ি বালার শব্দ, কিন্তু কথা কম, খুবই কম, হু-হার বেশি নয়। সাবধান থুতু না-ছেটায়। এ তো সেই ভয়ঙ্করী, এই ভয়ানক দুঃসময়ে যার কঠোর কর্কশতায় লুকানো স্নেহই একমাত্র ভরসা।
এসব তো প্রতি উৎসবেই। এবার কি কিছু পার্থক্য চোখে পড়ছে? মণ্ডপে রানীমাকে দেখা যাচ্ছে না বরং নয়ন-ঠাকরুণ মাঝে মাঝে ঘুরছে। রানী কাল তাকে গোপনে ডেকে বলেছিলেন বটে, মণ্ডপে থাকতে হবে, আমি পারছি না। মণ্ডপে যেমন নয়নতারা, অন্দরের জলযোগের হলগুলোতে তেমন হৈমী, দরবার হলের মাঝামাঝি তেমন নায়েবগিন্নি।
শীতের সন্ধ্যা ঝুপ করে নামে। বাইরে আকাশে কিছু আলো, কিন্তু মণ্ডপের দরদালানে আলো জ্বালাতে হয়। প্রতিমার চোখ আর তিলক নিয়ে কিছু অসুবিধা ঘটেছে। এখানেই এক দিনেই তো কাঁচা মাটির প্রতিমাকে আকারে রঙে জীবন্ত করে তুলতে হবে। কী অসম্ভব ব্যাপার! নিচের মাটি সরস, উপরে রংয়ে চোখ ধাঁধাবে। আচার্যিকারিগরমশায় সাগরেদ নিয়ে তুলি হাতে রং ছোঁয়াচ্ছে, পিছিয়ে পিছিয়ে দেখছে। সন্দেহ হয়, তার চোখে কিসের চাপে জল আসছে যেন। চোখগুলি একইসঙ্গে ডাকাতের মতো তীব্র আর মায়ের মতো স্নিগ্ধ করতে হবে না? আচার্যিমশায় ফিরে ফিরে নয়নতারাকে বলছে–দেখুন, মা, এবার। ভয়ের কথা বৈকি! মাঝরাতে রানীমা নিজে এসে প্রতিমার দিকে মুখ করে বসবেন না? এখনো প্রতিমার তিনফুল নাকে সোনার নথ ওঠেনি, কানে দোলেনি কাঁধছোঁয়া কুণ্ডল।
.
০৩.
উৎসবটা ধর্মের সঙ্গে জড়িত, তারা বিশেষ নিমন্ত্রিত হলেও ক্রিশ্চান। কোন দিকে গেলে অশোভন হয় না এরকম চিন্তা ছিলো বাগচীর। রাজবাড়ির সদর-দরজায় পৌঁছলে যারা অভ্যর্থনায় তারা তো এগিয়ে এলোই, নায়েবমশাইও তাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে নির্দেশ দিলোবাগচীসাহেবকে নিয়ে আমার কামরায় বসাও। মেমসাহেবকে বড়োগিন্নির কাছে পৌঁছে দিও। নাকি, আপনারা দেওয়ানকুঠিতে যাবেন?
বাগচী মনে মনে বললো, সমস্যাটা অন্যরকম হলো দেখছি। সে বললো–এ দিকেই তো আলো, আলোরই তো উৎসব।
