গোপাল চলে গেলে চরণ তার দাওয়ায় গুম হয়ে বসে রইলো। ডানকানের পাঁচটা ধরেও ধরতে পারছে না। জমি খাস করতে চায় রেহানে জমি রেখে-রেখে। নাকি দাদনে ঘাটতি লাগিয়ে মণ করা আরো কম দাদন দেবে?
বনদুর্গা দরজার আড়াল থেকে শুনছিলো। গোপালের ঘোড়ার শব্দ মিলিয়ে যেতে বেরিয়ে এসে বললো–বসি তাহলে এখেনেই।
চরণ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বললো–চলো যাই।
বনদুর্গা বললো–হাত মুখ ধোও। রির্সেল থেকে ফেরার সময়ে একটু চুয়া আনবে।
চরণ বললো–দোক্তা ধরবে নাকি? তাকে কিন্তু দাঁত -সাধ্যি কী দাঁত কালো করি? আমার লোভই বুঝি কম? চুয়া ধূপে দিলে সুগন্ধ বেশি হয় তুলসীতলায়। আর শোনো, তোমার ঠিয়াটার দেখতে কিন্তু আমি যাবোই, আর ছেলে। নিয়ে। আমাকে একটু ভালো দেখে বসার জায়গা দিতে হবে। রানীমার জন্মতিথি কিন্তুক এসেই গেলো।
১০. বড় সংবাদ
দশম পরিচ্ছেদ
০১.
তখন রাজনগরের সবচাইতে বড় সংবাদ রানীমার জন্মতিথির উৎসব। তা যে সমাসন্ন তা ক্রমশই গ্রামবাসীদের চালচলন কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছিলো। আর তার নিকটবর্তী গ্রামগুলোর পণ্য-উৎপাদকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।
মুনিষ লেগেছে মাটি ঢেলে পিটে গ্রামের প্রধান পথগুলোকে সমান করতে, পথের ধারের আগাছা কেটে তুলতে। অত বড়ো রাজবাড়ি সাফ সুতরো করা, রং করা এসব তো আছে। যারা কিছু করছে না তারাও আলো, আতসবাজি, ভোজ, থিয়েটারের চিন্তায় উত্তেজিত আলাপ করছে। গ্রাম ভেঙে আসবে সেই সন্ধ্যায় রাজবাড়িতে।
প্রকৃতপক্ষে বলা যায় না এ রকম কেন হতো। বোধ হয় সেবার উৎসবে আমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজনগরের একজনই মাত্র যোগ দেয়নি। অন্যান্যবার বাগচী অনুপস্থিত থাকতো। সেবার, তার ডায়েরিই প্রমাণ, সর্বরঞ্জনপ্রসাদই ছিলো একমাত্র আমন্ত্রিত যে যায়নি।
উৎসবের দিন সকালে, ছুটির দিন, একটু বেলায় ব্রেকফাস্ট শেষ করে উঠেছে তখন বাগচী, সর্বরঞ্জনপ্রসাদ তার কুঠিতে এসেছিলো, তার কথা অনুসারে, সম্মান জানাতে। রবিবারে ছুটি থাকে বটে, কিন্তু সকালগুলো তার প্রার্থনাতে কাটে, এবং সে অনুমান করে হেডমাস্টার সাহেবেরও তাই হয়। আজ অন্য একটা ছোট্ট প্রশ্ন তার মনে নেই এমন নয়।
এসব আলোচনার পর সে একটু চিন্তা করে নিয়ে সেই প্রশ্নটায় এলো। সূত্রপাতে বললো–মিস্টার ও সুলিভানের সঙ্গে দেখা হলো। অনেকটা আলাপ করলেন।
মিস্টার শব্দটা বাগচীকে বিপথে নেওয়ার সে জিজ্ঞাসা করলো কে?
নিয়োগী বললো–দু-তিন দিন হয় এসেছেন আবার। এক নৌকা মদ এনেছেন নাকি।
বাগচী বললো–ওহো, ওসুলিভান! এত আগেই এসে গিয়েছে? তা তো আসবেই, সে তো ফেলিসিটার নামে মদ-ব্যবসায়ীর কর্মচারী। এই প্রথম দেখলেন বুঝি? ওসবই বোধ হয় মরেলগঞ্জের জন্য।
নিয়োগী বললো–শুধু কি তাই, রাজবাড়িতেও আলো আতসবাজি ইত্যাদিতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হবে। সেসবেও আর এক নৌকো।
বাগচী হাসিমুখে বললো, তাহলে এজন্যই তাড়াতাড়ি এসেছে। আলো আতসবাজিতে এমন অনেক খরচ হয় বলেই গ্রামের লোকেরা তার প্রতীক্ষা করছে। আমাদের কাছে পাঁচ হাজার টাকা অবশ্যই অনেক, এক বৎসরে উপার্জন হয় না।
-তাহলেই দেখুন। আর তা শুধু এক বীভৎস পুতুলপূজার আড়ম্বর বাড়াতে। কী অপব্যয়, অর্থের কী অপচয়! আশ্চর্য, গ্রামের লোকেরা একটা প্রতিবাদ করে না, বরং নির্লজ্জের মতো উত্তেজিত! ভাবতে গিয়ে আজ সকালেই মনে হলো, এসব টাকাও তো রায়তকে শোষণ করে। উৎসব তো রাজবাড়ির, তোমাদের কী? এমন নির্বুদ্ধিতা দেখলে রাগ হয় না?
বাগচী আলাপটাকে হালকা রাখার চেষ্টায় একটু ভেবে নিয়ে বললো– রায়তের কাছে খাজনা পৃথিবীর সব দেশেই এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়, তাই না? তাছাড়া যদি ভেবে দেখেন, ভগবানই যেন মানুষকে কেমন নির্বোধ করেছেন! বিখ্যাত একটা মন্দির বা চার্চের ছবি দেখলে আমরা খুশি হই, অন্যের বাগানে ফুলের সমারোহেও তা হই, আকাশে রামধনুর মতো অলীক নিয়ে তো কবিতাই আছে। হিমালয়ের কাছে গেলে সে আমাকে ক্ষেপও করে না, অথচ তার জন্য আমার বলে গর্ব বোধ হয়।
সর্বরঞ্জন আলোচনায় সুবিধা করতে পারলো না। সে বললেও–তাহলেও কিন্তু এই উৎসবে, আমন্ত্রিত হলেও আমাদের যাওয়া উচিত হচ্ছে না। আপনি কি এই উৎসবে যোগ দিয়ে থাকেন?
বাগচী বললো–এবার যাবো স্থির করেছি।
নিয়োগীকে চিন্তিত দেখালো। একটু পরে সে বললো–আমার এই প্রথম শিক্ষক হিসাবে আমন্ত্রিত হয়েও না-যাই যদি তবে তাকীরাজবাড়ির, বিশেষ দেওয়ানজির, অসন্তুষ্টির কারণ হয়?
বাগচী বলল–তা আমার মন হয়না। আমন্ত্রিতদের কে এলো গেলো তা খেয়াল রাখার জন্য নিশ্চয়ই কেউ কেউ আছেন, কিন্তু আপনি না-গেলে তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে মনে করি না।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে থেকে সর্বরঞ্জন ভারী মনে বিদায় নিয়েছিলো।
সর্বরঞ্জনপ্রসাদ চলে গেলে বাগচী অনুভব করলো, কী যেন একটা ব্যথার কথা হচ্ছিলো? ও, সার্ক–রায়ত। হ্যাঁ, নিদারুণ পরিশ্রম আর দারিদ্র্য। কিন্তু ওরাই পাবে। সে আপন মনে হাসলো। না, এটা কারণ নয় যে দরিদ্র বলে পাবে। হয়তো দারিদ্র্য আর শ্রমে পাপ-বিলাসের অবকাশ কম। রোমের সেনেটার লাঙল দিয়ে জমি চাষ করতো এমন গল্প আছে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে, সেই গমের ক্ষেতে এবং অলিভ-বাগিচায় যারা কাজ করতো তারা ক্রীতদাস, যেমন এখনো আমেরিকার তুলার ক্ষেতে। হয় ক্রীতদাস, নয় রায়ত। ইংল্যান্ডে তো বটেই, ফরাসী বিপ্লবের পরেও ইউরোপে রায়ত থেকে গেলো। আর তারা খাজনা দেয়। আচ্ছা, আচ্ছা, মনে মনে এই বলে সে হাসলো, খাজনা মানে ফসলের উদ্বৃত্ত অংশ পরিবারের যা লাগে তার উদ্বৃত্ত। ওহো, এই উদ্বৃত্ত যদি রায়ত না-দেয় হেডমাস্টার খায় কী? উদ্বৃত্ত নিজের ইচ্ছায় দেবে এমন হয় কি? অন্যদিকে দ্যাখো, কি ইংল্যান্ডে কি ভারতে রায়ত সুখে নেই।
