আর আত্মা? …চরণ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। শিরোমণি আজ নতুন ধরনের কথা বলেছেন। মানুষ নাকি দিবিহ্ত দেবতা নয়। পশু থেকে উঠছে। নিয়োগীমশায় আবার যেন বাইবেলের গল্পের মতো খানিকটা বিশ্বাস করেন। মানুষ নাকি আবার অমৃতস্য পুত্রা। ডানকানও? ওদিকে মানুষ যে দেবত্বে যাবে–শিরোমণির শরীরটা দ্যাখো। তার আর কী হবে? তবে কী আত্মা?
আত্মা সম্বন্ধে বলা ভালো নয়। নিজে সে একদিন বলেছিলো। বনদুর্গা বলেছিলো একদিন ঘাট থেকে ফিরে। আমাদের সেই পোস্টমাস্টার গোবর্ধনের কথা মনে পড়ে, চরণ?
মনে না-পড়ার কথা নয়। সে তো একইসঙ্গে তার আর বনদুর্গার বন্ধু ছিলো। তাদের বিবাহ তো তারই উদ্যোগে।
এখন তো জানাই যাচ্ছে বুজরুকের সঙ্গে সেই চলে যাওয়ার পরে আর কখনো সে ফিরবে না। কিন্তু বনদুর্গা জিজ্ঞাসা করলো–আচ্ছা চরণ, আবার কখনো কি গোবর্ধনবাবুর সঙ্গে আমাদের দেখা হতে পারে?
চরণের বলা উচিত ছিলো, তা হয় না বলেই আমরা শোকে কাদি। কিন্তু সে বোকার মতো বলেছিলো–হবে বৈকি, আমাদের আত্মা আছে না?
রাত্রিতে ছেলে ঘুমালে বনদুর্গা চরণের বিছানায় এসেছিলো। সে চরণের বক্ষসংলগ্না, কিন্তু তার চোখ দুটি প্রদীপের আলোয় অন্য সময়ের চাইতে আয়ত মনে হচ্ছিলো। সে বলেছিলো–আচ্ছা চরণ, তোমার সেই দাদার সঙ্গেও কি আবার দেখা হতে পারে-আমার কিংবা তোমার?
একটা অব্যক্ত নিষ্ঠুরতা আছে যেন কোথাও আত্মার ব্যাপারে, যার হিসাব আমাদের পৃথিবীর হিসাবকে তছনছ করে দেয়। আত্মা কি নিঃসঙ্গ যেমন সে মরেলগঞ্জের অত্যাচারে বিষণ্ণ বনদুর্গার পূর্ব-স্বামী, তার সেই জ্ঞাতি-ভ্রাতাকে কখনো কখনো কল্পনা করে?
চরণ তার বাড়ির কাছে এসে গিয়েছিলো। জানলায় বনদুর্গার চোখ দুটিকে দেখার আশায় সে চোখ তুলো, সে বরং তার বাড়ির বাইরের বারান্দার পাশে ঘোড়ার পিঠে একজনকে দেখতে পেলো।
চরণ সাগ্রহে এগিয়ে বললো–গোপালদা যে, কখন এলে? বসোনি কেন? ঘোড়ার পিঠে রয়েছো?
গোপাল বললো–তোমার সঙ্গে কইতে এলাম, চরণ, বেশ কিছুক দিন মরেলগঞ্জ যাচ্ছো নি। সেখেনে তোমার সুঁই ফাঁকা, চাষ পড়ছে না।
চরণ সলজ্জভাবে বললো–ঠিয়াটারের রির্সেল নিয়ে পড়েছি, আর কয়েকদিন। তার পরেই ভাবছি। এসো, বসিগে, পান-তামুক খাও।
না গো, চর চারিদিগে।
–এখানে চর কোথাকে? নদী ডেরকোশ।
–ভালো, ভালো। গোপাল গলা নিচু করলো, বললো, ডানকান এবার দাদন দিচ্ছে নি। চরণ বারান্দায় উঠতে থমকে দাঁড়ালো। একমুহূর্তে তার মনের আবহাওয়াই যেন বদলে গেলো। থিয়েটার, ধর্ম, বনদুর্গা এসব থেকে অনেক দূরে এই এক জায়গা। তার মুখটাই যেন সারাদিনের রোদে কালো এবং ক্লান্ত হয়ে উঠলো।
তা সত্ত্বেও সে হাসলো। বললো–বেশ যা হোক, না দেয় তোমার কী?
গোপাল বললো–মনোহর শা কইছে বিঘে প্রতি দু-দশ টাকা ঋণ দিতে পারে সাহেবকে ধরাধরি করলে।
-কেন, নীলের যন্তর কী তুলে দিচ্ছে?
–অনেক কইছে। কইছে নীলের দাম পড়ছে, ফাটকায় মার খেয়েছে সগলেই, কার ঠাকুর কোম্পানিই বরবাদ, দাদন আর হবে নি। বিঘেতে হদ্দ দশ টাকা ধার পেতে পারো।
চরণের ধোঁকা লাগলো, বললো, রসো-রসো, এর মধ্যে প্যাঁচ আসছে। অমন অখিদে হয় না। জমি বাঁধা দিয়ে ধার? ভাবতে হবে, গোপালদা।
–কিন্তুক ধার নেওয়া তো শুরু হয়েছে।
চরণের মুখ শুকিয়ে উঠলো, বললো–ভেবে দ্যাখো গোপালদা, ধার নয় নিলে, শুধবে তো সেই নীল বেচে? কিনবে তো সেই ডানকান? যদি বলে কেনার গরজ নি। যদি এমন বলে এক বিঘার নীলের দাম ঋণের টাকার কম হয়? সে মণ প্রতি দাদনের চাইতে খারাপ। না, গোপালদা, ভালো ঠেকছে নি। ঋণ নিও না। এখন তো সকলের হাতে কিছু ধান হবে। অন্তত পিছিয়ে দাও না ধার নেওয়া।
গোপাল কম অভিজ্ঞ নয়, বললো–ধান বেচে এগোতে কইছো, কজনা পারবে? খাওয়ার ধান বেচে, শেষে? সে ধান সগলে হাটে আনলে তার দামও পড়ে, বোঝো?
চরণ ভাবতে লাগলো। বললো–এতে কিন্তুক শয়তানী আছে–গোপালদা, কলকেতার শয়তানী। গত বছরের গোলমালের কথা ভাবো। যশোর-নদের কৃষকেরা এককাট্টা হয়েছিলো। আমার মনে হচ্ছে তো নীলে শালারাও এককাট্টা হচ্ছে। দু সন নীল আমদানী কম ছিলো, দাম কমে কেন?
গোপাল বললো–তোমার তো পুরো পঞ্চাশ বিঘে সেখেনে। ত্রিশে নীল করো! সব তো শুনলে, এখন?
–আরো শুনবো, গোপালদা।
–সগলে গিয়ে একবার ডানকানকে ধরলে হয় না!
না। ভাবতে দাও। অমর্ত্যদা কী বলে?
-দাবা খেলে চলতে বলছে। শোনো, চরণ, গতবার অন্য জেলার গোলমালে ডানকান নরম ছিলো। এবার?
-দাদন না-নিয়ে ইচ্ছামতো চাষ।
–কিন্তু চরণ, শেষে যদি সে তোমার নীল না-ছোঁয়, দাদনের টাকা আদায়ের তাগিদ থাকবে না। তোমার নীল কি তখন খড়ি হবে আখার?
শীতের বিকেল, তা সত্ত্বেও আঙুল দিয়ে কপালের ঘাম চেঁছে ফেলো চরণদাস। সে রেগে উঠে বললো– বললাম তো ভাবতে সময় দাও।
গোপাল বললো–আচ্ছা, চরণ, এখন তুমি খাটনি করে এসেছে। দিন তিনেকে আবার আসবো। তো দাবার মতোই ভেবো। এ সময়ে প্রতি সালেই দাদনের নগদ পায় চাষী। হঠাৎ দাদন বন্ধ হলে ধারই নিতে চাইবে। মনোহর শালা বলছিলো কলকেতায় নাকি কমিছন বসেছে। তাতেই দাদন বন্ধ। দাদনেই নাকি সাহেব কুলের বদনাম। সেজন্যেই নাকি কমিছন। রঙ্গ করে কয়েছে, তো দাদনের পাপই আর না। ভেবো নগদের অভাবে চাষীতে চাষীতে হাহাকার পড়বে।
