সে আজ ধর্মের কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছে। ধর্ম? ভাবতে গেলে মায়ের সেই শীর্ণ, ক্ষুধাখিন্ন মুখটাকে মনে আসে। এখন বাতাসা-টাতাসা মানত করার দায়িত্ব তার স্ত্রীর। তার মেয়ে চারু এখন বড়ো হয়েছে, সে বরং এ ব্যাপারে মাকে সাহায্য করে। কিন্তু এই ধর্ম নিয়ে একটা বিপদ যেন ঘনিয়ে আসছে। আজ আবার নিয়োগীমশায় শিরোমণিকে চটিয়ে দিলেন।
মুশকিল! সে কিছুদিন থেকে নিয়োগীমশায়ের কাছে ঋণী বোধ করছে। অসময়ে বিনা সুদে দুচার টাকা ধার দেওয়া তো বটেই। আসল কথা তার মেয়ে চারু। বছর দুয়েক আগেও সে গ্রামের সব চাইতে গেছোমেয়ে ছিলো! এখন বিষণ্ণ হয়েছে, যোলো-সতেরো হলো তার। তার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বছর দুয়েক আগে শেষ চেষ্টা করেছিলো সে। সে কুলীন নয় আর কুলের কথা ভাবেনা। তা সত্ত্বেও তখনই পাত্রপক্ষ সোনায় নগদে চারশো চেয়েছিলো যা তার এক বছরের উপার্জন। চারুকে দরজা বন্ধ করে থাকতে হতো যদি না নিয়োগীমশায়ের স্ত্রী তাকে ডেকে নিতেন। দিনমানের দু-পাঁচ ঘণ্টা চারু তার কাছে কাটায়, তার ছোটোছেলেটিকে বুকে করে রাখে, কুটনো কেটে দেয়, সব কাজেই সাহায্য করে। একটু রুগ্নই তিনি, সন্তানও বেশ কয়েকটি। কিন্তু তিনিও চারুকে ভালো মন্দ খেতে দেন, সেলাই শেখান, খাতা বেঁধে হাতের লেখা শেখান।
হাতের লেখা সে নিজেই পাঠশালায় শিখিয়েছিলো। কিন্তু এটা তার চিন্তার বিষয় নয়। সে নিয়োগীমশায়ের দিকে ঝুঁকেছে, তার কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করছে। তিনি যেমন দয়াবান তেমন যদি নরম হতেন! কিন্তু তিনি দলাদলির দিকে চলেছেন। কৈলাসের আতঙ্ক হলো–এ রকম চলতে থাকলে সে নিয়োগীমশায়ের দলে গ্রামের অন্য অনেকের বিরুদ্ধে গিয়ে পড়তে পারে। উদাসীন, নিস্পৃহ শিরোমণি, আর ক্রুদ্ধ অপমানিত শিরোমণি এক নয়। কী হবে তখন গুরুর?
ভয়ে ভয়ে কৈলাস বললো–চরণ, তুমি ধর্ম-টর্ম বোঝো?
–তেমন বুঝি কোথায়?
কথাটা এগোলো না। কৈলাসের মনে তার মেয়ে চারুই ফিরে এলোদ্রুত চলেছে এমন চারু, দ্রুত কাজের হাত চলেছে এমন চারু, হাস্যময়ী এক চারু, যার হাসি দেখে তার দুঃখ। বোঝা যায় না। কিন্তু সে আজ মনকে ভেসে যেতে দেবে না। গোপনে চরণকে পাওয়া গিয়েছে। চরণের একরকম বেপরোয়া সাহস আছে যা এ-গ্রামে দুর্লভ। ভাবো নিজের বিধবা ভ্রাতৃবধূকে প্রকাশ্যে বিবাহ করা! কিন্তু কৈলাসের চোখ দুটি ছলছল করে উঠলো।
তার অনুভূতিতে এই কান্না উঠলো–ও মা, উমা, পাষাণ বলেই কি সইবে? তা সত্ত্বেও মনকে শক্ত করে সে বললো–আচ্ছা, চরণ, তুমি কি জানো, সুরেন সাঁপুই কী জাতি? বামুন কায়েত নয় বোধ হয়? তোমরা তো একসঙ্গে ওঠো বসো, খাওয়া-দাওয়া করো?
চরণ বললো–জাতি তো জানি না পোনমশাই, আর আড্ডায় অত বিচারও নেই।
–চরণ, শুনলাম, নিয়োগীমশায় ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু সুরেন হেঁসেলে ঢোকে, খায়।
-ওদের সমাজে ওসব চলে।
এতক্ষণে কৈলাসের চিন্তা যেন একাগ্র হলো, আর তার তীক্ষ্ণতায় সে ভীত হয়ে এদিক ওদিক চাইতে লাগলো। নিয়োগীর স্ত্রী কাল বিকেলে বেড়াতে এসেছিলেন। তখন চারুর মাকে অনেক কথার মধ্যে বলেছেন, সুরেন সাঁপুই, যে নাকি রাজবাড়িতে কাজ করে, আশি টাকা বেতন পায়, যার স্ত্রী একটিমাত্র শিশু রেখে দু বছর হয় গত হয়েছেন, সেই সুরেন্দ্রর বয়স কখনই পঁয়ত্রিশের বেশি নয়। সে নাকি নিয়োগীর বাড়িতে চারুকে দেখেছে; দেখে বলেছে বেশ মেয়ে চারু।
চরণ বললো–আমি এখান থেকে কাট করবো পোনমশাই।
কৈলাস তার এই পুরনো ছাত্রটিকে যেন ইংরেজি ছড়াই পড়াচ্ছে এমনভাবে বললো– হেসে-কাট, কাট, কাট, কাটান।
চরণ চলে যাওয়ায় সে যেন বেঁচে গেলো। বললো–এসব কি লোকজনের মধ্যে ভাবা যায়? কিন্তু নির্জনে ভাবতে গিয়েও সে থরথর করে কেঁপে উঠলো। হে ঈশ্বর, করুণাসিন্ধু, রক্ষা করো, রক্ষা করো।
সে কী করে চারুকে সুরেনের স্ত্রীরূপে কল্পনা করলো! কৈলাসপণ্ডিতের শুকনো গাল বেয়ে জলের ধারা নামলো। পথের উপরে দাঁড়িয়ে যেন চারুকেই বলছে এমনভাবে যুক্তকরে কেঁদে উঠলো : ও মা, ভবদারা, পাষাণ ফেটে যায় দ্যাখো।
.
তখন চরণের খুব তাড়াতাড়ির সময়। কৈলাসপণ্ডিতকে ছাড়িয়ে এসে সে খুব তাড়াতাড়ি চলতে লাগলো। তার নিজের কৃষাণরা আসবে কাজকর্মের হিসাব দিতে, রোগীরা আসবে ডিসপেনসারিতে, ওদিকে রিহার্সালেও যাওয়া দরকার। এসব কাজ না থাকলেও তাকে তাড়াতাড়ি করতে হতো। সে জানে এ সময়ে বনদুর্গা মাঝে মাঝেই তার শোবার ঘরের জানলায় এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞাসা করলে স্বীকার করে না।
কয়েক পা গিয়ে সে ভাবলো, সে পোনমশাইকে ঠকায়নি। ধর্ম সম্বন্ধে সে কিছুই কি জানে? আত্মা, পরমাত্মা, দেব দেবী, ব্রহ্ম–এসব কথা সে শুনেছে। কলকাতা-ফেরত গৌরী, বেজো এরাও, সুরেনবাবু, নরেশবাবু তো কলকেতারই মানুষ, নিয়োগীমশায় তো তাকে বাইবেলই পড়ান যা ধর্মেরই বই, কাজেই ধর্মের কথা উঠে পড়েই। সেও কালই এক কঁকিবাজ ক্ষেতমজুরকে বলেছিলো–অতটা নয়, ধর্মে সইবে না।
কিন্তু ধর্ম বলে কি কিছু সত্যিই আছে যা থেকে অন্যায়ের পাপের শাস্তি হয়? কে শাস্তি পায়? সেই আত্মা বলেই কি কিছু আছে? পায় নাকি ডানকানরা শাস্তি? নাকি ওদের ধর্মে তেমন করে মানুষকে পীড়ন করা অন্যয় নয়? পাপ হয় না, বাঘ মানুষ খেলে যেমন তার পাপ নেই, যেমন আমরা মোষ-গোরুকে পিটলে পাপ নেই?
