কিন্তু কাব্য পাঠের কথা হচ্ছিলো। সময় হয়েছে বটে। কাব্যের রস ও ব্যক্তির ইন্দ্রিয় কর্তৃক উপভোগ-জাত সুখ এক নয় তা বুঝতে হবে। কিন্তু রাজীবনোচন পৌত্রের বাহুও তো পরিঘসদৃশ হওয়া উচিত। কাব্যের রস সেই রকম ব্যঢ়োরস্ক পুরুষের জন্যই কি? কাব্যের স্মৃতি শিরোমণির কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করায় সে যেন তার সম্মুখে রসপিপাসু কয়েকটি যুবাকে দেখতে পেলো।
কিন্তু কল্পনা অনেকসময়েই বাস্তবকে বৈপরীত্যর সাহায্যে স্পষ্ট করে। এসব কাব্য যাদের, মহাকাল যাদের উপাস্য, তারা চার হাতে ধনুতে জ্যা রোপণ করতে পারতো। যবন ধ্বংসী সেই সেনা নিশ্চয় ক্ষুধাখিন্ন ছিলো না।
তার চতুষ্পঠীতে কি তেমন যুবক আছে? কিংবা গ্রামে? মাংসল স্কন্ধ, সুবলিত বাহু। আর ধনুর অনুকল্প তো বন্দুক।
বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে নিজের চিন্তাগুলোকে লক্ষ্য করে সে লজ্জিত হলো। এসব কেন ভাবছে? যখন এসব কাব্য লেখা হয়েছে তখনো অপরাধগুলো সবই ছিলো, অবশ্যই ক্ষুধা, তৈল, ইন্ধন, লবণ চিন্তা ছিলো, কিন্তু একরকমের বলিষ্ঠতাও ছিলো। এইসব যে সে ভাবছে কে জানবে? শালগ্রামশিলা? ক্ষুধার অভাব, দৃপ্ত যৌবন, ধীরোদাত্ত পুরুষ শত সহস্র কুটির থেকে ছুটে আসছে, যাদের অপরাধকে ভুল বলে ক্ষমা করা যায়, তাদের জন্য কার কাছে প্রার্থনা করা যায়?
বাগচীও বাতাসের ঝাপটায় পড়েছিলো। পথের ধারের গাছগুলোর ব্যস্তসমস্ততা দেখতে পেলো। আকাশে যে হালকা মেঘ তাতে আর কি বৃষ্টি হবে? কী যেন ভাবছিলো সে? শিরোমণির কথা? সে কি তবে নিজেই জানে না তার কথাগুলোর উৎস কোথায়? এ কি নতুন দার্শনিক চিন্তার দিকে চলেছে তার মন, অসীম অকম্পিত কালকেসময়কে–সে যাকে হিন্দুরা ব্রহ্ম বলে তার প্রতিভাস মনে করছে? এ কি নতুন দার্শনিক চিন্তা যা এই গ্রামে বলা হচ্ছে? কী জানি! কিন্তু তা কি ভালো? তাহলে কি বিপন্ন হতে হয় না? ঈশ্বর থাকে না।
ঠিক এই সময়ে নিয়োগীও চিন্তা করছিলো। সে মাথা নিচু করে হাঁটছিলো, যেন সে পরাজিত। কিন্তু মনের জোরে সে এই অলীক কল্পনা থেকে মুক্ত করে নিলো নিজেকে। বাগচীকে দেখেই সে ভদ্রতায় থেমে গিয়েছিলো কেননা শিরোমণি তখন নিতান্ত অরুচিকর যৌন বিষয়ক কথা বলছিলো। কী আশ্চর্য, দেওয়ানজি এঁকেই উপনিষদের ব্যাখ্যা করার উপযুক্ত বিবেচনা করেন! কালিদাস! শকুন্তলম্! ঈশ্বর আমাদিগকে পাপ শ্রবণ ও পাপ কথন থেকে রক্ষা করুন। একবার তার মনে হলো সে নিজেকে এবং নিজের সন্তানদের পাপ থেকে উৎপন্ন মনে করে কিনা। পরমুহূর্তেই সে ভাবলো এই যে তার ঈশ্বরচিন্তায় বারবার যৌনতা যুক্ত হয়েছে এর জন্য কি সে দায়ী? অথবা এই কি অসুলিনির্দেশ যে তাকে গ্রাম ত্যাগ করতে হবে?
আদর্শবাদীদের চিন্তা অনেকসময়ে বাধার সম্মুখে অনুপ্রেরিত হয়ে ওঠে। গ্রাম ত্যাগের কাল্পনিক শূন্যতার সামনে তার চিন্তা শক্ত হয়ে দাঁড়ালো যেন। না, না, সত্যধর্মের পরাজয় হয় না। সে অতি দ্রুত চিন্তা করতে লাগলো। এই গ্রামে দেওয়ানজি নিশ্চয়ই প্রচণ্ড শক্তিশালী, না না, তা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু তার শক্তির উৎস? তা কি আরো শক্তিশালী নয়? সে যেন পেয়েছি পেয়েছি বলে উঠবে। সে ভাবলো, আর দিদি ব্রহ্মবালার কথা সত্য। হলে, অবশ্যই তা সত্য, রানীমা গুণাঢ্যমশায়ের কন্যা সম্বন্ধে ভাবতে রাজী হয়েছেন। আগ্রা, মথুরা, পাটনার এবং বর্তমানে কলকাতারও এই পরিবারের ন্যায় কাদের এমন সত্যধর্মে নিষ্ঠা? গুণাঢ্যমশায় কমিশরিয়াটের কনট্রাকটাররূপে ধনাঢ্যও বটেন। তাঁর কন্যা যদি রাজকুমারের স্ত্রীরূপে এদেশে আসেন? না না, দিদিকে আজই পত্র দিতে হবে। এ সম্বন্ধ ঘটাতেই হবে। রানী হতেই কি রোমসম্রাট ক্রিশ্চান হননি?
.
০৭.
বাড়ি যাওয়ার কথা সকলের আগে মনে হলেও কৈলাসপণ্ডিত সকলের পিছনে ছিলো। সঙ্গে চরণদাস। চরণদাস তো দাঁড়িয়ে থেকে স্কুলের দরজা জানালা বন্ধ করায়। কৈলাসপণ্ডিতের গন্তব্যই হারিয়ে গিয়েছে, কোথাও কোনোরকমে পৌঁছে গেলে সেখানেই নিজেকে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করে। বয়স শিরোমণির চাইতে কম হবে, এমন জরাজীর্ণ যে কেউ প্রতিকারের কল্পনা করে না।
তার এই এক সুবিধা, সে দারিদ্র্যকে অনুভব করতে পারে না আর। দ্বিতীয় সুবিধা ইদানীং দেখা দিয়েছে, সে ক্রমশই অতীতকে ভুলে যাচ্ছে। তার মনে আছে বটে, এই স্কুলটা হওয়ার আগে বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজির দু-এক কথা শিখতে তার পাঠশালাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিলো, আর দেওয়ানজির বদান্যতায় স্কুল হলেও তাকে সেখানে কাজ সুতরাং জীবিকার পথ দেওয়া হয়েছে। এখন কৈশোর-যৌবনের ঘটনাগুলোকে তার অলীক মনে হয়। সে যে কায়স্থ তা নিশ্চয় মনে আছে; পিতার নাম গোত্র মনে আছে, কিন্তু তার মুখখানা স্মৃতিতে আর আসে না। মায়ের? তা যেন ভাসে, দোলে, ডুবে যেতে চায়। কায়স্থের বিধবা। কিন্তু কী কঠোর বামনাই! সেই কঠোর একাগ্রতা ধরা পড়তো চরকা নিয়ে বসলে। তেমন সূক্ষ্ম রেশম মাকড়সাও পারে না। ফরাসডাঙার সাহেব কিনতে। আর তাতেই মা-ছেলের ভাত? মা যখন সব-সেরা কাটুনি তখনই মাসে দুটো করে উপবাস, প্রতি রাত্রিতেই অরন্ধন, মায়ের প্রতি রাত্রিতেই অভক্ষণ। শুভঙ্করে দড় পণ্ডিত জানে এসবে ভাতের প্রয়োজন এক-তৃতীয়াংশ কমে আসে। কৈলাসের আর এক সুবিধা হয়েছে এখন, বালকের মতো কথায় কথায় চোখে জল আসে, চিন্তা ভেসে ভেসে হারিয়ে যায়।
