শিরোমণি পিছন ফিরে দেখলো, তার চেয়ারের পিছনেই বাগচী, এবং তার কাছাকাছি অন্যান্য শিক্ষকরাও। শিরোমণি বিশেষ বিব্রত বোধ করলো, কিছুটা যেন ভীতও। সে জিভ কাটলো। সে ইতস্তত করে বললো–না মশায়, বিষ্ণুকে পূজা করার চেষ্টা হয়।
বাগচী বললো–ও আচ্ছা। কিন্তু আপনি যোগীশ্বর রূপের কথা কী বলছিলেন, জগৎপিতাও বলছেন। বৃষ্টি থামেনি, আপনি বলতে পারেন।
শিরোমণি লজ্জায় অপোবদন হলো। কিন্তু সে লক্ষ্য করলো যে অন্য অনেকেই তার মুখের দিকে চেয়ে আছে। যেন সে ধিকৃত পরাজিত এক জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ এরকম একটা অনুভব হলো তার।
সে বললো, তারপরও, কল্পনা করি, তার অনুভূতিতে যোগীশ্ব সেই রূপ ক্রমশ এক আনন্দময় জ্যোতিস্বান্ কালস্রোতে মিলিয়ে যায়। সে হয়তো অনুভব করে সেই মহাকালস্রোতে সূর্য-চন্দ্রাদি জন্মাচ্ছে, লোপ পাচ্ছে, সে নিজেকে সূর্য-চন্দ্রাদির মতো মহাকালপ্রসূত এবং তাতেই বিলীন মনে করে। সেই জগৎ-জনয়িতা মহাকালকে অনুভব করে তার জন্মের আনন্দ নেই, মৃত্যুর ভয় নেই, তার সুখ দুঃখ নেই, সে কাউকে ভয় করে না, বিদ্বেষ করে না। সে যদি কখনো বলে আমিই শিব তাহলে তা মিথ্যা হয় না।
এই বলে সে থামলো। তাকে বিশীর্ণতর দেখালো। সে মনে মনে ভাবলো : এই বিধর্মী মানুষটির কাছে কেমন বা কটু বোধ হলো তার কথা!
কিছুক্ষণ কেউই কিছু বললো– না। কিন্তু কেউ কেউ করিৎকর্মা খাকে। কৈলাসপণ্ডিত ইতিমধ্যে উঠে দরজা পর্যন্ত গিয়েছিলো। সে বললো– ধরেছে সার। এবার যাওয়া যাবে।
বাগচী হেসে বললো–পণ্ডিতমশায় দেখছি আলোচনাটা চালাতে চান না। চলুন তবে।
পথে বেরিয়ে শিক্ষকেরা শীতের এই ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টি শীত বাড়াবে কিনা, ফসলের পক্ষে ক্ষতিকর হবে কিনা, ধান-চালের দাম এবার গতবারের চাইতে বেশি কেন ইত্যাদি আলোচনায় ব্যস্ত হলো।
শিরোমণি সকলের পিছনে হাঁটছিলো। বাগচী শিক্ষকদের পরে স্কুল থেকে বেরিয়েছিলো। কখন সে শিরোমণির কাছে এসে পড়েছে। সে বললো–এগুলো কি আপনার নিজেরই ব্যাখ্যা? কিংবা কোনো দর্শন থেকে বলছেন? হ্যাঁ, মশায়, ওই উদাসীন মহাকালের কথা? সবাই উদাস হলে কি চলবে?
শিরোমণি নিজের মনের মধ্যে খোঁজ করলো যেন, বললো–নিশ্চয়ই পূর্বসূরীদের কাছ থেকে পাওয়া। কিন্তু হঠাৎ বিশেষ কারো নাম মনে করতে পারছি না। কাল ছাড়া কি কুম্ভকারই একটা ঘট বানাতে পারে? কিন্তু উদাস না হলেও চলে। যোগীশ্বর রূপে তাঁকে আদর্শ করে লোক সংগ্রহ করা যায়। তিনি অপরের জন্য বিষ পান করেন। শিরোমণি নিতান্ত কুণ্ঠিত হয়ে হাসলো।
বাগচী এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ শিরোমণির পাশে চললো। সে বিস্ময় বোধ করলো। জন্মান্তরবাদ নয়, কর্মফল নয়, সবই যেন এক উদাসীন মহাকালস্রোতে ভাসমান। কী সাংঘাতিক কথা, তাহলে ক্রাইস্ট দূরের কথা, ঈশ্বরই থাকেন কি?
শীতের এই এক পশলা বৃষ্টি ধুলোকে জব্দ করতে পারেনি। বরং বাতাস এনে ধুলোর উৎপাত বাড়িয়েছে। একবার তা উঠে শিরোমণিকে ব্যতিব্যস্ত করলো! সে চাঁদরে নাক-মুখ ঢাকলো বটে, তার পাকা চুলে, শীর্ণ দেহে ধুলোর স্তর পড়লো যেন। ধুলোয় ঢাকা ক্লান্ত শীর্ণ এক হতাশ মানুষ যেন সে।
নিজের বলা কথা চিন্তার সূচনা করতে পারে। শিরোমণি মনের তলায় চলে নিজের অজ্ঞাতে রামায়ণের ভাষায় চলে এলো। কিছু বদল করে সে ভাবলো : উনষোড়শ বর্ষ পৌত্র যে রাজীবলোচন। আজ সন্ধ্যা থেকে তাকে মেঘদূত পড়াতে হবে। বালবিধবা ভ্রাতুস্পুত্রী গৃহে থাকায় টোলেও ভট্টি ছাড়া কাব্য পড়ানো হতো না। এখন তা যায়। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে ভাবলো : কিন্তু তা কি ভালো হচ্ছে? পৌত্র ও পুত্রতে কি বিবাদ দেখা দেবে? এ কি সত্য যা সে কখনো আশঙ্কা করে? নিজের গৃহের পরিস্থিতি সে বিশ্লেষণ করলো। এবার নিয়ে সাত বছর হলো পুত্র বিজয়কুমার কলকাতায় অর্থোপার্জনের জন্য। মাঝে কী এক পরীক্ষা দিয়ে জজ-পণ্ডিত হওয়ার চেষ্টায় ছিলো, কিন্তু জজ-পণ্ডিত কি এখনো হয়? তা কি গুজবনয়? এই সাত বছর বিজয় কালের সঙ্গে অনেক আপোস করেছে। সে ধর্মান্তরিত হয়নি বটে, কিন্তু স্মৃতিতে বিশ্বাস অনেকটাই কমেছে। সে গতবার হাসতে হাসতে তার মাকে বলেছিলো, সময়ও মুনিদের কাছে বেদের মতো প্রমাণ। কিন্তু সে আজকের নিয়োগীর মতোই উত্তেজিত ছিলো। সেদিন টোলের দু-তিনজন ছাত্র তার মায়ের পক্ষ নেওয়ায় কণ্ঠস্বরগুলো ক্রমশ উচ্চতর হচ্ছিলো। তার সে মা আর নেই। কথাগুলো কি তার সঙ্গে গিয়েছে? সে বলেছিলো, দোষটা ভাগ্যের যে ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছি, কুল ত্যাগ করতে পারছি না। কিন্তু শীল, সোনার বেনে, কৈবর্ত, কায়েতের মুখে বামুন বামুন ঠাট্টাও শুনবো আর তাদের দেওয়া নামমাত্র বৃত্তি ভোগ করবো–তাই বা কেন? আমরাই যদি নিজেদের স্বার্থে ধর্ম তৈরী করে থাকে আমরাই তা চুরমার করে দিই না কেন? তুমি কি বলবে এই গ্রামের বাইরে শিরোমণি শব্দটাকে কেউ শ্রদ্ধা করে? তার চাইতে বামুন বিদ্যাসাগর ভালো। কলকেতায় বাস করলে খানিকটা কলকেতার মতোই হবে, বিজয়েরও হয়েছে। কিন্তু পৌত্র বৈজয়ন্তের উপরে বাড়ির প্রভাব বেশি। পৌত্রের প্রতি স্নেহাবিষ্ট হয়ে, অথবা সপরিবারে পুত্রের কলকেতায় থাকা অসুবিধার হবে এই যুক্তিতে পৌত্রকে নিজের কাছে রাখা কি ভালো হচ্ছে?
