সর্বরঞ্জনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। তার মুখে যে শক্ত শক্ত শব্দগুলো আসছে সেগুলো আয়ত্তে রাখা কঠিন হচ্ছে। সে বললো–সত্যি গোপন করা আমার অভ্যাস নয়। স্বীকার করি আপনি যাকে আড়াকাঠ বলছেন সেই ক্রুশ দেখলে যুক্ত করে শ্রদ্ধা জানালে লজ্জার কিছু দেখি না। আপনি ইংরেজি জানলে আপনাকে কেশব সেন মশায়ের বক্তৃতা পড়তে দিতাম। দেখতেন বড়ো বড়ো ইংরেজরাও কেন তাকে প্রশংসা করছে। না, না, একথা আমাকে বলতেই হবে, আমাদের এই দেশে এমন প্রতীকও পূজা করা হয়, যা স্বীকার করতেই হবে, যে কোনো ভদ্ৰব্যক্তিকে লজ্জিত করে। তার তুলনায় ক্ৰশ?
চরণ জিজ্ঞাসা করলো নিয়োগীমশায় ওলাবিবি, শীতলা ঠাকুরানীর কথা বলছে কিনা।
নিয়োগী বললো–আমি তোমাদের দেবতার দেবতা। মহাদেবের কথা বলছি।
কোনো কোনো কথা একটা আলগা আলগা ধরনের আলাপকে যেন বিদ্যুতের আঘাতে সজীব করে তোলে। এই ক্লাসটা শেষ হলে শনিবারের ছুটির ঘণ্টা পড়বে। শিরোমণির তখন গৃহে ফেরার কথাই মনে হচ্ছে। টেবিলের উপরে তার হাতের কাছে স্কাইলাইট থেকে রোদ এসে পড়ছে। শিরাবহুল বৃদ্ধ হাত দুটিরও যেন রোদ পোহানোর ভঙ্গি।
চরণ বললো–সে তো এক থাবা কাদা কিংবা একটুকরো পাথর । লজ্জার কী?
–কিন্তু আকৃতি? বিশেষ করে এই গ্রামে–সর্বরঞ্জনপ্রসাদ জুগুল্পিত বোধ করে থেমে– গেলো।
শিরোমণি বললো–অ। তা বিশেষ করে এই গ্রামে কেন?
নতুবা শিবলিঙ্গের গোড়ায় কারো বুকের রক্ত দেয়া হয়?
–তাকেও যৌনতাগন্ধী বলছেন? শিরোমণি হাসলো যেন।
–আপনি ব্রাহ্মণ, স্বীকার করবেন শিবপূজায় রক্তচন্দন অবিধেয়। রানীমা সম্বন্ধে আপনি যে কথা বললেন এই গ্রামে বসে আমি সেকথা মুখে আনতে চাই না।
–অর্থাৎ চিন্তা গোপন করছেন? শিরোমণি হাসলো আবার!
–তাহলে শুনতে চান? ওকে আমি পশুত্ব পূজা বলি।
শিরোমণির কৃশ শরীরে অনেক শিরাই প্রকাশমান। কপালের ঠিক মাঝখানে একটা শিরা যেন রক্তের চাপে দপদপ করছে। হঠাৎ সে ঠা-ঠা করে হেসে উঠলো। সে বললো–খুব বলেছেন। আমি শুনেছি সাহেবদের শিশুরা রুমালে বাঁধা অবস্থায় সারস দ্বারা নীত হয়। আপনি বাঙালি, আপনাদেরও তা হয় কিনা জানি না। ভেবে দেখুন নিজের জন্ম, নিজের সন্তানের জন্ম পাপপঙ্কে পশুত্বের ফলে কিনা। আমরা স্বর্গদ্বার থেকে ভূমিষ্ঠ হই কিন্তু। যদি বলেন একবারই জন্মানোর সুযোগ পেয়েছি, এ জন্ম সার্থক, তবে সেই সার্থকতার উৎস, জীবনের সবটুকু আনন্দের উৎস, মাতৃযোনির মতো কি এমন পবিত্র, মশাই?
-ছি-ছি-ছি, এসব আপনি কী বলছেন। নিয়োগী দুহাতের তর্জনীদুকানে খানিকটা করে। ঢুকিয়ে দিলো।
শিরোমণি বললো–মস্তিষ্কের সাহায্যে ব্যাপারটাকে বিবেচনা করুন। পবিত্রতার বোধ বদলাবে। রক্ত মাখানো কাঠ, যা মৃত্যু, বেদনা, প্রতিহিংসার কথা মনে আনতে পারে, তা যদি আপনারা সামনে রাখতে পারেন, তাহলে আমরা যদি আনন্দ ও জন্মের প্রতীককে সামনে রাখি তাতেই কি দোষ?
ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজলো। ছুটির ঘণ্টা শুনে সেই হলের বাইরে ছেলের দল হৈ হৈ করে বেরোচ্ছে! শিরোমণি উঠে দাঁড়ালো। বললো–নমস্কার মশায়। বুড়োর কথায় দোষ নেবেন না। আজ মাছি, কাল নেই।
কিন্তু সেদিন ভবিতব্য অন্যপ্রকার ছিলো। ভিতরের দিকের এই হলে বসে বাইরে গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে তা বোঝা যায়নি। বাতাসও ছিলো। শিরোমণি হলের দরজা পর্যন্ত গিয়ে ভিজে বাতাসের ঝাপটা খেয়ে পিছিয়ে এলো। টেবলের কাছে এসে বললো–খুব ধমক খেলাম হে চরণ, জল হচ্ছে।
চরণ বললো–তাড়া কী? বসুন।
নিয়োগীর বোধ হয় এমন স্পষ্ট, তার কাছে যা নির্লজ্জ, কথা শোনার অভ্যাস ছিলো না। সে কথা খুঁজে পাচ্ছিলো না। শিরোমণিকে ফিরে চেয়ারে বসতে দেখে সে বেশ তিক্তস্বরে বললো–আপনার এই অনুভূতিগুলিকে আমি নিতান্ত নিম্নস্তরের মনে করি। এ কথাটা আপনাকে জানানো খার।
শিরোমণি বললে–আপনি ঠিকই বলেছেন। এগুলো সেই স্তরের কথাই যখন মানুষ শিবলিঙ্গে জগৎ পিতাবৌকে দেখতে পাচ্ছে না, দেখতে পাচ্ছে না তাদের স্নেহ ঢল ঢল মুখ। হ্যাঁ হে চরণ, তুমি বাইবেল পড়ো শুনি, কালিদাস পড়েছে?
নিয়োগী বললো–আমি পড়েছি, আমাকে বলুন। কৈশোরে সে দুর্ভাগ্য হয়েছিলো আমার। কালিদাস শৈব ছিলেন, এই বলবেন তো? তাতে কিছু প্রমাণ হয় না।
শিরোমণি বললো–প্রমাণ নয়, তুলনা। আপনি হয়তো শকুন্তলমও পড়েছেন। প্রথমে শিবকে প্রণাম শেষে ভরতবাক্যেও তাই, মাঝখানে কামজ মিলন থেকে আর এক কুমারসম্ভবের পবিত্রতায় পৌঁছানো। এই এক ব্যাখ্যা হয় যে মানুষ কামজ অস্তিত্ব থেকে শিবত্বে পৌঁছাতে পারে। আদিরসকে বাদ দিয়ে নয়, তাকে দেবত্বের সার্থকতায় চালিত করেই কাব্য হয়। যদিও আপনারা ভাবেন ভগবান আদিম মানুষকে কোন এক উদ্যান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন, এ পতন হয়নি, বরং পশুত্ব থেকে ঊর্ধ্বে চলেছে মানুষ। কিছু উন্নতি হয়েছে।
সর্বরঞ্জন বললো–থাক থাক। এতেও আপনার শিশ্নপূজার সমর্থন হয় না। সে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো।
শিরোমণি স্মিত হাস্যে বললো–হয়। যতক্ষণ না তাকে জগৎপিতা যোগীশ্বর বলে বোধ হয়, জন্ম জীবন মৃত্যুর হেতু বলে মনে হয়, ততক্ষণ না হয় নিজের প্রাণশক্তির প্রতীকরূপে পূজা করুক।
শিরোমণি অভ্যাসবশে শিখায় হাত রাখলো, যেন সেটাকে বাঁধবে ফুল দিয়ে, কিন্তু আচমকা অন্যদিকে গেলো ঘটনার গতি। কে যেন জিজ্ঞাসা করলো–আপনি কি শৈব, শিরোমণিমশায়?
