হরদয়ালও ভাবছিলো। সে ভাবলো, এদিকে লক্ষ্য করো। এই চার্লস ডারউইনকে যদি বিশ্বাস করো তবে এই লাল কাপড়ের মলাটের বইটা এখন একখানা ইট যার আঘাতে অনেক গির্জার অনেক কাঁচ ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে। যদি এঁকে বিশ্বাস করো ওটা আর বিশ্বাস করতে পারো না যে ঈশ্বর মানুষকে হাজার পাঁচেক বছর আগে নিজের আকারে সৃষ্টি করেছিলেন। একটা চাপা হাসি হরদয়ালের চাঁপা ঠোঁটে জড়িয়ে গেলো। অবশ্য ওদের কথা, হয়তো প্রমাণ করবে ডারউইন ঠিকই বলেছেন তবে তা লাল আর কালো মানুষ সম্বন্ধে। ঈশ্বর বেশ ব্লোন্ড এবং নর্ডিক, আর সেরকম মানুষ সৃষ্টির কথাই বাইবেলে আছে।
.
০৬.
স্কুলে পৌঁছে সর্বরঞ্জন নিজের আবিষ্কার নিয়ে নিতান্ত গম্ভীর হয়ে রইলো। সে কি আর কখনো দেওয়ানজির কাছে সাহায্য আশা করতে পারে? স্কুল ভাঙার আগে তার দুটো ক্লাস ছিলো, একটাতেও সে মন দিয়ে পড়াতে পারলো না।
সে শিক্ষকদের বসবার ঘরে গিয়ে একবার মনে করলো পরীক্ষার যে-প্রশ্নপত্র আগামী সপ্তাহে দিতে হবে সেগুলোকে আর একবার দেখে দিলে হয়। কিন্তু উৎসাহটা তৈলহীন প্রদীপের মতো নিস্তেজ। সে তখন দেরাজ থেকে একখানা খেরো বাঁধানো খাতা বার করলো। এটা তার একরকমের ডায়েরি। ক্লাসে কী পড়ানো হলো কী পড়ানো উচিত এসব যেমন থাকে, তেমনি লেখা থাকে তার নানা সময়ের চিন্তা। এটা অবশ্যই তার সেই ডায়েরি নয় যা সে বাড়িতে প্রত্যহ সন্ধ্যার উপাসনার পরে লেখে। বরং এই দুই নম্বর ডায়েরিতে যা সব থাকে তার কিছু কিছু পরিমার্জিত হয়ে বাড়ির এক নম্বর ডায়েরিতে স্থান পায়।
দুনম্বর ডায়েরি লিখতে সর্বরঞ্জন দেখলো গোলটেবিলটার একপ্রান্তে শিরোমণি এসে বসলো। কিছুপরে তার থেকে দুএকখানা চেয়ার বাদ দিয়ে চরণদাস বসলো এসে। সে একটা বাঁধানো খাতায় লাল কালো কালিতে রুল টানতে শুরু করলো। নতুন বছরের অ্যাটেন্ড্যান্স রেজিস্টার হবে।
চরণ দাসের পরনে বেঁটে আচকান জাতীয় পিরহান, পাকানো চাদর কোমর ঘিরে বুকে ক্রশ করে দুই কাঁধে। শিরোমণির গায়ে খাটো ঝুলের খাটো হাতার পাশে ডোরে বাঁধা মেরজাই, চাদরটা গলার দুপাশ দিয়ে ঝুলছে। গলার কাছে মোটা পৈতের গোছা। কিন্তু সব চাইতে দর্শনীয় তার অর্ধেকের বেশি কামানো মাথায় সাদা ধবধবে টিকির গোছাটা।
হয়তো নিঃসঙ্গতাবোধ নিয়োগীকে এত পীড়িত করছিলো যে নিজের অজ্ঞাতসারে তার মন তালাশের সুযোগ খুঁজছিলো। সে বললো–চরণদাসবাবু এখনই আগামী বছরের কাজ সেরে রাখছো? নাকি এটাও থিয়েটার সম্বন্ধে কিছু।
চরণ দাস মুখ না তুলে বললো, আগেকারটাই ঠিক। সে হাসলো। ইতিপূর্বেই থিয়েটার সম্বন্ধে নিয়োগীর সঙ্গে কিছু তর্ক হয়েছে।
সর্বরঞ্জন বললো, ভয় নেই তোমাদের। এখানে এই গ্রামে তোমাদের থিয়েটারকে কেউ নিন্দা করবে না। থিয়েটার নিয়ে আলোচনার ফলে দেখা যাচ্ছে শিরোমণিও শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। সে বললো–তা কি বলা যায়? থিয়াটার বা অভিনয় যাই বলুন, ভালো না হলে নিন্দা হবেই।
চরণ বললো–উনি বোধ হয় অন্য অর্থে বলছেন।
-কথাটা ঠিক ধরেছো। বললো– সর্বরঞ্জন। কিন্তু তারপরে সে নির্বাক হয়ে গেলো। সে কি কখনোই প্রকাশ্যে বলতে পারে দেওয়ানজি হরদয়াল থিয়েটার নাটক সম্বন্ধে কী জাতীয় নিন্দনীয় মত পোষণ করেন? সে কি এইমাত্র ডায়েরিতে যা লিখেছিলো সেই আশঙ্কার কথা বলবে? যে অতি শীঘ্রই এই নাটকের প্রশ্রয়ে ড্রপওয়ালী, খেমটাওয়ালী, সাধারণভাবে নষ্টা স্ত্রীলোক অভিনয়ের সুযোগে কীভাবে প্রকাশ্যে বহুলোকের চোখের সামনে ক্রমশ আদরণীয় হয়তো দেবীরূপে কথিতা হবে।
সে মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, মুশকিল কী জানো, চরণ দাসবাবু, মানুষকে দেখে দেখে যে ধারণা করো আর তার প্রকৃত ব্যবহারে অনেক তফাত। এবারেও নিয়োগীর মনে দ্বিধা দেখা দিলো। সে কি বলতে পারে হরদয়ালের ব্যবহার তাকে আজ কীরকম আঘাত দিয়েছে। সে বললো, জানো খিদিরপুরে এক মিত্তিরজা আছে যিনি নতুন সত্যধর্মকে আলিঙ্গন করেছেন। কিন্তু তা করার আগে নিজেদের গৃহবিগ্রহ গোপীনাথ প্রভৃতিকে এক মন্দিরে দিয়ে এসেছেন। যাতে সেই অবস্থাতেও পূজা হয় সেজন্য সে মন্দিরকে আট-দশ বিঘা জমিও কিনে দিয়েছেন।
শিরোমণি বললো–কৌতুকের ব্যাপার তো। বিবেকের সঙ্গে রফা?
-আমার কিন্তু মশায় তা নেই। মিথ্যা মিথ্যাই। আমাদের নারায়ণশিলা বিগ্রহ ছিলো চরণ বললো–তা বুঝি গঙ্গায় দিয়েছেন?
রস, রসো, চরণদাস, শিরোমণি বললো, গঙ্গায় দেয়া তো হিঁদুআনিই হলো।
নিয়োগী বললো–আপনি যদি দয়া করে আমার বাসায় যান, দেখতে পাবেন সে শিলা আমার টেবিলে কাগজ চাপার কাজ করছে। আমি চাই আমার পুত্রেরা তাকে নুড়ি বলে জানুক। সে বললো– আবার, না না, আমাকে বলতেই হবে, আজ পর্যন্ত সেই পাথর থেকে নূপুরের শব্দও শুনিনি, বাঁশিও বাজে না। এই বলে সে হাসলো মৃদু মৃদু।
শিরোমণি তাতে প্রচণ্ড শব্দে হা হা করে হেসে উঠলো, বললো–এখানেই চিন্তার ত্রুটি। যাকে নুড়ি জ্ঞান করলেন তার আবার নূপুর অথবা বাঁশি কী? এ যে পরম ব্রহ্মের দয়াময় হওয়ার মতোই।
চরণদাস বললো, আপনি বলছেন নুড়ি ভাবলে তা নুড়ি হয়?
-তাই তো হয়ে থাকে, শিরোমণি বললো, তোমার আমার কাছে যা রক্তে বসায় মাখানো আড়াকাঠ, কারো কারো কাছে তা আবার পূজনীয় অবতারের প্রতীক। হয়তো নিয়োগীমশায়ও এমন একখানা কাঠ দেখলে যুক্তকর অন্তত বুক পর্যন্ত ওঠান।
