হরদয়াল বললো–এটা এমন সময় যে কী দিয়ে আপনার পরিচর্যা হয় বুঝি না। তাছাড়া আমার তো চাকরবাবুর্চির সংসার। আপনাকে কি কিছু পানীয় অফার করতে পারি? কী পছন্দ করেন? এটা বার্গান্ডিই, যদিও রংটা গাঢ়।
এই বলে সে বোতলের দিকে হাত বাড়ালো।
সর্বরঞ্জন জীবনে এমন বিপন্ন হয়েছে কিনা সন্দেহ। যা উপস্থাপিত হলে ডানকান সাগ্রহে অগ্রসর হয়। পিয়েত্রো যার অনুপস্থিতি অসম্মানজনক মনে করতো, এমনকী বাগচী যার কথায় হয়তো হেসে বলতো লুব্ধ হচ্ছি, সন্ধ্যায় আসবো; সর্বরঞ্জনকে তা একেবারে নির্বাক করে দিলো। সে কি উঠে দাঁড়িয়ে স্থান ত্যাগ করতে পারে? সে কি মদ্য সম্বন্ধে তার ঘৃণা প্রকাশ করতে পারে এই মানুষটির সম্মুখে?
কিন্তু মুহূর্তটি নির্বিঘ্নে পার হলো। এমন হয় যে কোনো বিষয় কোনো বিশেষ অঞ্চলের অনেক মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। হরদয়ালের চিন্তাকে আজ সকাল থেকেই গৌরীদের নাট্যাভিনয় ব্যস্ত রেখেছিলো। সে বললো–মিস্টার নিয়োগী, বাগচীমশায় আপনার সাহিত্যজ্ঞানের বিশেষ প্রশংসা করে থাকেন। আপনি কিন্তু গ্রামের যুবকদের বিশেষ এক উপকার করতে পারেন।
অন্য আলাপে যেতে পেরে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারলো নিয়োগী। সে সাগ্রহে বললো– কীভাবে, সার? সাধ্য হলে নিশ্চয়ই করবো।
হরদয়াল বললো–গ্রামের যুবকদের একাংশ হঠাৎ অভিনয় করতে উদ্যত হয়েছে। কিন্তু ভালোনাটক কই? বুড়ো শালিখআর একেই কি বলে এবার করতে চাইছে। আমার কাছে ভালো লাগেনি।
সর্বরঞ্জন ক্রমশ অনুভব করলো সে নাচাইতে সমস্যাটার কথা উঠে পড়লো। এটায় কি সে আশ্চর্য হবে? কিংবা দ্যাখো সপ্ৰয়াস কীভাবে ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করে। দ্যাখো এবার দেওয়ানজির মতের সঙ্গে তার মত মিলছে। সে ইতিমধ্যে চরণ দাসদের আড্ডায় একবার অন্তত রিহার্শালে গিয়ে পড়েছিলো, ফলে নাটক যে কত কুৎসিত সে বিষয়ে তার সংশয় ছিলো না। সুতরাং সে একটু সাহস করে বললো–ভালোলাগার কথাও নয়, সার। যদি অনুমতি দেন, বলবো তা জঘন্য। আমার তো মনে হয় রাজবাড়ির কোথাও এরকম নাটকের অভিনয় হওয়া উচিত হয় না।
হরদয়াল ভাবলো সেটা খুব বড় সমস্যা নয়, রানীমা আদৌ নাটক দেখতে আসবেন । রাজকুমার যদি আসেও নাটকে যেসব পুরুষের কথা বলা হয়েছে তারা এত নিম্নবিত্ত শ্রেণীর যে তাদের সস্তা দুশ্চরিত্রতাকে তার কাছে ভাঁড়ের ভাড়ামি মনে হবে। সে বললো–আপনি কি শেকপীয়রের দু-একটা কমেডি অনুবাদ করে দিতে পারেন? কী হবে বলছেন? মানুষ নাটক করতে চায়, কিন্তু ভালো নাটকই নেই।
-হয়তো তা করা যায়, কিন্তু
আমি তাও ভেবেছি। সেকষ্পীয়রের কাব্যগুণ অনুবাদে ধরা যায় না। আমার মনে হয় শেরিডান অথবা কংগ্রিবের নাটক অনুবাদ করা তার তুলনায় সহজ হবে।
সর্বরঞ্জন এক সমস্যা থেকে উঠতে গিয়ে যেন অন্য সমস্যায় ডুবে যাচ্ছে এরকম বোধ করলো। বুড়ো শালিক কুৎসিত-দেওয়ানজির সঙ্গে এই পর্যন্ত তার মত মেলায় সে উৎসাহিত হয়েছিলো, এখন সে তো এক চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। কংগ্রিব! সে তো ব্ল্যাকগার্ডদের সম্বন্ধে ব্ল্যাকগার্ডদের জন্য এক ব্ল্যাকগার্ডের লেখা। সে কি চূড়ান্ত নির্লজ্জ আদিরসের কথা নয়?
সে কিছুই বলতে পারলো না। সে অনুভব করলো এই অবস্থায় এই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেই মাত্র তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। কলকাতার কারো বৈঠকখানা হলে তা সে অবশ্যই করতো। কিন্তু এখানে দেওয়ানজি হরদয়ালের ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় না, কেননা প্রকৃতপক্ষে এই লাইব্রেরি ঘরের বাইরে যে রাজপথ, যে স্কুল, শিক্ষকদের আবাসিক বাড়ি, এবং তারও পরে গ্রামের পরে গ্রাম, কতদূর কে জানে, সবই দেওয়ানজির বৈঠকখানা।
সাক্ষাৎ শেষ হয়েছে অথচ বিদায় নেয়ার ঠিক কথাটা ভেবে ওঠা যাচ্ছে না বলে বসে আছে এমন অবস্থাই যেন তার। এই সময়ে ঘড়িতে কোন এক আধঘণ্টা সূচনা করলো। পদার কাছে হরদয়ালের ভৃত্যের সাড়া পাওয়া গেলো। সে যেন গোসলখানায় জল দেয়া হয়েছে একরম বললো।
নিয়োগী বললো–আপনার স্নানাহার? আপনার স্নানাহারের সময় হলো?
হরদয়াল বললো–সে হবে। আপনি কংগ্রিব অথবা শেরিডান অনুবাদ করা ভেবে দেখুন।
হরদয়াল উঠে দাঁড়ালো। নিয়োগী যেন কিছু লজ্জিতভাবে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
ভৃত্য পর্দার এপারে এসে বললো– রান্না শেষ হলো।
তখন চিন্তার সময় নয়। তাহলেও চলো তবে বলে ভৃত্যের পিছন পিছন যেতে যেতে হরদয়াল চিন্তা করলো, আমাদের এই নতুন মাস্টারমশায়ের মনে ধর্মাভাব যত প্রবল সাহিত্যপ্রীতি কি ততটা প্রবল নয়? ধর্মের ভাব কিন্তু এখন প্রবল হচ্ছে কলকাতাতেও। একে কি ইংরেজি শিক্ষার ফল বলবে? তাহলে ও-জাতটাকেই ধার্মিক বলতে হয়।
পথে বেরিয়ে সর্বরঞ্জনও ভাবছিলো, তাহলে এতদিন যা ভেবে এসেছে তা কি সবই ভুল? তাহলে মেট্রোপলিটানের ভাদুড়ীমশাই তাঁর বন্ধুকে চেনেন কি? ভাবো দুপুরের স্নানাহারের আগে ওই মদ্যপান। না, না, এ কখনোই গোপন করা যায় না তিনি মদ্যাসক্ত। এবং ঈশ্বরেও বিশ্বাস আছে কি? ভাবো শিরোমণিকে, উপনিষদ-অভিজ্ঞ ভাবেন! অথচ ইংরেজিনবিশ সে বিষয়ে সন্দেহ কী? গায়ের সেটা অবশ্যই ড্রেসিংগাউন, কত দাম কে বলবে? সে হঠাৎ আবিষ্কার করলো। তাহলে দেওয়ানজি ডিরোজিও ধারার মানুষ, নিরীশ্বর, দুর্বিনীত, মদ্যপায়ী আধুনিকদের একজন যারা নষ্ট স্ত্রীলোক সংসর্গে সঙ্কুচিত নয়? না, না, একথা আমাকে বলতেই হবে দেওয়ানজি সেই প্রজন্মের মানুষ একসময়ে ভয়ঙ্কর রকমে আধুনিক ছিলো, কিন্তু এখন কলকাতার চোখে আর আধুনিক নয়। না, আধুনিক নয়।
