উত্তর দিতে হরদয়ালের একটু দেরি হলো। সর্বরঞ্জনের সঙ্গে তার এটা দ্বিতীয়বার আলাপ হচ্ছে। প্রথমটা হয়েছিলো এক বৎসর আগে চাকরিতে বহাল করার ইন্টারভিউ-এ। তখন নিয়োগীর ইংরেজিটা ক্রিস্পই বোধ হয়েছিলো। সর্বরঞ্জনের এই বিশেষ ধরনের বাংলা তাকে পুরোপুরি স্তম্ভিত করতে পারলো না, কেননা কলকাতায় তার। বন্ধু ভাদুড়ীমশায়ের চারপাশে এরকম বাংলাই শোনা যায়। সে বললো–তবে তো কথাই নেই। আপনার পরিবারের সকলের স্বাস্থ্য ভালো থাকছে তো? যে কারণেই হোক এ অঞ্চলটায় ম্যালেরিয়ার উৎপাতটা কম।
নিয়োগীআবার বললো–এবিষয়েও তারই মঙ্গলময় বিধান দেখতে পাই। সে সুন্দর করে হাসলো, অবশ্যই তার প্রচুর শ্মশ্রুজালের আবরণের বাইরে তা যতটা প্রকাশ হতে পারে।
হরদয়াল বললো–আগে করা যায়নি, এবার আপনাদের কোয়ার্টারগুলোকে বড়ো করে দেবো।
হরদয়াল তার মুখের দিকে চেয়ে কথা বলছে, কিন্তু তার দৃষ্টিটা বোতলের পাশে রাখা বইটার উপরেও পড়লো, আর তা যেন সস্নেহ। মদ ঢালতে কখন এক ফোঁটা কী করে মলাটে পড়ে থাকবে। হরদয়াল তা হঠাৎ দেখতে পেয়ে কোঁচার খোঁট তুলে বিন্দুটাকে মুছে নিলো।
কিন্তু আলাপটা গতি নিতে পারছে না। হরদয়াল তো শুনতেই প্রস্তুত কিন্তু নিয়োগী অনুভব করলো এখানে বাগচীর সঙ্গে সে উপরওয়ালা হলেও, কলকাতার সমাজনেতাদের সঙ্গে, এমনকী সেখানকার ধনী মানুষদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলা যায় এই স্থির মানুষটির সঙ্গে তার এই নিঃশব্দ লাইব্রেরিতে বসে সেভাবে কথা বলা যায় না। তার একবার মনে। হলো সে শিক্ষক, বই সম্বন্ধে কথা বলতে পারলে সুবিধা হতো। কিন্তু এই যে একখানা বই যা ১৮৫৯-এ প্রকাশিত এবং ইতিমধ্যে এখানে, তার সম্বন্ধে কি কিছুমাত্র বলার সুবিধা হচ্ছে? ওরিজিন অব স্পেসিস বাক্যাংশটার অর্থই বা কী? লেখক এই চার্লস ডারউইনবা কে? এ রকম কোনো কবির বা ঔপন্যাসিকের নাম সে কলকাতায় শোনেনি। অথচ এই নিস্তব্ধ লাইব্রেরিতে ঘড়ি টিক টিক শব্দে সময়টা দ্রুত চলে যাচ্ছে, অপব্যয়ই হচ্ছে, এবং সময়টা হরদয়ালের।
সুতরাং নিয়োগী তার মাথাটাকে কয়েকবার উঁচুনিচু করলো। অবশেষে বললো–সার, আজ যে আপনার মহামূল্যবান সময়ের খানিকটা এই যে অপব্যয় করতে উদ্যত হয়েছি, এই যে আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটিয়ে চলেছি, এসবেরই একটা উদ্দেশ্য আছে।
বলুন।
-এখানে একটি পরম করুণাময় সেই এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরের উপাসনা মন্দির হলে কি ভালো হয় না?
হরদয়াল বললো–উপাসনার ব্যাপার মিস্টার বাগচী সব চাইতে ভালো বোঝেন।
বাগচী বললো–আমি নবতর কোনো সংগঠনের কথা ভাবছিলাম, সার।
-সেটা কী ব্যাপার হচ্ছে?
সর্বরঞ্জন ক্রমশ তার চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিলো। বললো–বিষয়টা আনন্দজনক নয়, সার, তা আমাকে বলতেই হবে। না, না, তা না বলে উপায় নেই। কিন্তু ঈশ্বর নিরানন্দের মধ্যেও নিজেকে প্রকাশ করেন, এই তার অভিরুচি। আর এ তো আত্মসমালোচনাও বটে। ব্রাহ্মদের অর্থাৎ যারা পরম ব্রহ্মের উপাসনা করি তাদের কাছে কি কে শুদ্র কে ব্রাহ্মণ এ বিচার থাকা উচিত? অথচ আমাদের পুরোধা কারো কারো প্রার্থনাবেদীতে ব্রাহ্মণেতর কাউকে বসতে দিতে আপত্তি, এখনো কেউ কেউ উপবীতকে আঁকড়ে ধরে আছেন। এ বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়।
খানিকটা বাধা দেয়ার মতো করে হরদয়াল বললো, দেবেন্দ্র ঠাকুর মশায় কলকাতার লোক, যদিও নানা অঞ্চলে তাদের জমিদারি আছে; কিন্তু তাঁর বিষয়ে আমাদের এখানে করণীয় কিছু আছে কি? এ অঞ্চলটা তার জমিদারিতে পড়ে না।
আবেগের প্রাবল্যে নিয়োগীর মাথাটা দুলে উঠলো। বললো– সে,না,না, সার, এ আমাকে বলতেই হবে। এই গ্রামে গোড়া থেকেই সবদিকে বাঁধ দিয়ে অগ্রসর হওয়া কি ভালো নয়? এমন মন্দির হওয়া উচিত যার সংবিধান বলে আচার্য হিসাবে যে কোনো সম্প্রদায়ের লোকই উপাসনায় নেতৃত্ব দেবে।
হরদয়ালের মুখে সূক্ষ্ম একটা হাসি দেখা দিলো। গতবার কলকাতায় এসব ব্যাপারে সে কিছু কিছু শুনেছিলো বটে। এমনকী তার বন্ধু ভাদুড়ীমশায়ের চারিদিকেও এ বিষয়ে উত্তেজনা ছিলো। কৌতূহলের অভাবে তা সে ভুলে গিয়েছিলো। এখন মনে পড়লো এই স্ববিরোধে কেশব সেন মশায়ের নামও শোনা যাচ্ছিলো। হরদয়াল বললো, কিন্তু এখানে তো আপনি মাত্র একা। এখানে কে আর আপনার বিরুদ্ধতা করছে? আপনাদের শুনেছি। উপনিষদ নিয়ে ব্যাপার। আপনার ব্যাখ্যার সঙ্গে এ অঞ্চলে বিরুদ্ধ মত মাত্র একজনেরই হতে পারে। তিনি শিরোমণি। তাঁকে ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না, কারণ তিনি নিজে যেচে অনধিকারীকে উপনিষদ সম্বন্ধে কিছু বলেন না।
না, না, সার, একথা আমাকে আবার করে বলতে হবে, সার। মন্দির হওয়ার আগে থেকেই আমরা প্রার্থনাসভা করতে পারি। আর সে প্রার্থনাসভায় আপনাকেই প্রধান ও পরম পূজনীয় আচার্যরূপে পেতে ইচ্ছা করি। আর একাই বা কেন? আমার পরিবারে সাতজন তো রয়েছি।
হরদয়ালের হাসি পেলো। সর্বরঞ্জনের পরিবারের সাতজনে দু-তিন বছরের শিশু গুটি দুয়েক। কিন্তু বাড়িতে যে দেখা করতে এসেছে তাকে পরিহাস করা যায় না। সে বরং আবার শান্ত দৃষ্টিতে সর্বরঞ্জনের দিকে চাইলো। এত বিস্তৃত সে দৃষ্টি যে নিয়োগী লক্ষ্য করতে পারলো সেই চোখের প্রান্তগুলি বেশ লাল।
