কিন্তু সর্বরঞ্জনপ্রসাদকে পথের পাশে ঝটিতে সরে দাঁড়াতে হলো। তিনটি ঘোড়া তীরের ফলার মতো বেগে আসছে; পুরোবর্তীটির একটু পিছনে রাস্তার দুপাশে দুটি। পুরোবর্তী সওয়ার নিতান্ত তরুণ, তার পোশাক ইউরোপীয়রাইডিং কোট ও ব্রিচেস, মাথায় বারান্দা টুপি, হাতে সুদৃশ্য ডাঁটযুক্ত চাবুক। রাজকুমার কি? শ্যামল দেখালো না অনেকটা? পিছনে সওয়ার দুটিকে চেনা মনে হলো। লাটসাহেবের সওয়ারদের পোশাকই যেন, পাগড়ির রঙে তফাত। তাদের দুজনের হাতে রূপার বল্লম। পাগড়ি দ্যাখো, গাঢ় নীলে রূপালি জরি। এমন একটা ব্যাপার যা ধ্যান ভাঙিয়ে দেয়। এত তাড়াতাড়ি গেলো, বোঝা গেলো না রাজকুমার কিনা।
সে অবশ্যই মুকুন্দ যে রানীমার কাছে দরবার শেষ করে কায়েতবাড়িতে তার মায়ের কাছে চলেছে। এই ছোট্ট রিশালাটা চলেছে অবশ্যই তার সম্মান রাখতে। রাজবাড়ির ছাদ আর ঝুলবারান্দা থেকে সদরের গেট পর্যন্ত যারা সেটিকে যেতে দেখলো তারা ভাবলো এই কুমার অবশ্যই অসাধারণ সম্মানের পাত্র, যদিও সে কায়েত।
তার এইদিন পড়ানোর কাজের চাইতে অফিসের কাজ বেশি। প্রয়োজন হলে সে সুতরাং কাজকে খানিকটা পিছিয়ে রেখে চিন্তার অবসর করে নিতে পারে। সে কিছুক্ষণ মুখ নিচু করে কাজ করলো; আর তা করতে করতে একবার চরণ, আর একবার শিরোমণিকে দেখতে পেলো। এই সময়ে তার মন এরকম বললো– :ঈশ্বরের সৈনিক, অগ্রসর হও। সে অনুপ্রেরণার জন্য মনকে আঘাত করতে লাগলো।
উৎসবই উৎসবের সমকক্ষ। না, না। সে স্থির করলে তাকে একটা উৎসব করতেই হবে। যা হবে প্রকৃত উৎসব; যেখানে বেদী থেকে পরম করুণাময় একমাত্র সেই নিরাকার ঈশ্বরের প্রার্থনা হবে। তার মনে পড়ে গেলো তার শেষ সন্তানের নামকরণ-উৎসব হয়নি। আর একটি শিশুকে সত্যধর্মে অভিষিক্ত করার চাইতে উৎসবের কী এমন ভালো সুযোগ হতে পারে? এবং এটাও দেখতে হবে যে সেই উৎসব শক্তির উৎসে যুক্ত হয়। ভাবো সেই রিশালার কথা! দেওয়ানজির সহায়তায় কি রাজকুমারও একদা সত্যধর্মে উৎসাহিত হন না?
সুতরাং সর্বরঞ্জন স্থির করলো : আজই, এখনই, স্কুল থেকেই সে দেওয়ানজির সঙ্গে দেখা করতে যাবে। না না, তাকে যেতেই হবে। প্রথমত আসবাবগুলির জন্য তাকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে; দ্বিতীয়ত সে ভাদুড়ীমশায়ের চিঠি পেয়েছে গত সপ্তাহে তা জানানো যেতে পারে। ভাদুড়ীমশায় তার মুরুব্বি, তেমনি দেওয়ানজিরও বন্ধু; তাছাড়া থিয়েটার বলো, রাজবাড়ির উৎসব বলো, তিনি তো সর্বেসর্বা। আর ধর্ম ছাড়া তার উপায়ই বা কী? সে তো হাকিমও নয়, এমনকী আটিকেল্ড ক্লার্কও নয়।
দেওয়ান কুঠিতে যখন সে পৌঁছালো, হরদয়াল তার লাইব্রেরিতে। নিয়োগীর বেশ একটু অস্বস্তি বোধ হলো। একটি গৃহ যে এমন নিঃশব্দ হতে পারে তা তার অভিজ্ঞতায় ছিলো না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুঠির ভিতরের কোনো দেয়ালঘড়ির মৃদু টিক টিক সে শুনতে পেলো। কী করে সে খবর দেবে যে সে দেখা করতে এসেছে। অবশেষে একজন ভৃত্য। বেরিয়ে এসে তাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে লাইব্রেরিতে বসালো। তার জুতোজাড়া যে এক রকমের কিম্ভুত ফাপা, শব্দ করে শান্তির বিঘ্ন ঘটায় তা সে জানতো না।
ভৃত্য তাকে যে চেয়ারটায় বসিয়েছিলো সেখানে বসে লাইব্রেরি ঘরের এই ঠাসা সেলফগুলি, এখানে ওখানে ছড়ানো গাঢ় কালো রঙের সুদৃশ্য চেয়ারগুলো, ঘরের প্রায় কেন্দ্রে সুদৃশ্যতর সোফাসেট প্রভৃতি লক্ষ্য করতে করতে তার আর একবার মনে হলো, এভাবে আসা তার পক্ষে ভালো হয়নি। দুএক মুহূর্তে আলোটা চোখে ঠিক হলে সে যেন একটা সেলফের আড়ালে হরদয়ালকে খানিকটা দেখতে পেলো। আরো ভালো করে দেখতে গিয়ে সে লক্ষ্য করলো, সোফার সামনে টিপয়ের উপরে একটা চাপা রঙের তরলপূর্ণ বোতল, তার পাশে বড় করবী ফুলের মতো কিন্তু লম্বা বৃন্তের উপরে একটা গ্লাস। সেই বোতল ও গ্লাসের পাশে একখানা বই যার ভিতরে একটা সুদৃশ্য রূপার পেজকাটার। সে একটা মৃদু গোলাপী গন্ধ পাচ্ছে। তা কি ধূপের, অথবা মদের?
— দুএক মুহূর্তে হরদয়াল সেফের পাশ থেকে বেরিয়ে সোফার কাছে এগিয়ে বললো–এখানে আসুন। বসতে বসতে হরদয়াল হাসলো। আর সে হাসি যেন কোনো রমণীর হতে পারে এমন নরম এবং কুণ্ঠিত। বললো– সে–একার সংসার, বইগুলো সারা ঘরে ছড়ানো ছিলো, তাই তুলছিলাম।
সর্বরঞ্জন এক কঠিন সমস্যায় পড়লো। সোফায় বসতে বসতে সে অনুভব করলো, তার জিভটা শুকিয়ে উঠছে। এই তো মদ, যা ইতিপূর্বে ছবিতে মাত্র দেখেছে এবং যাকে সে দুশ্চরিত্রা রমণীর মতো কুহকী ও ঘৃণ্য মনে করে। সে কী করে এগুলোর উপর দিয়ে দেওয়ানজির মুখের দিকে চাইবে? সে মনে মনে ভাবলো : উনি হয়তো ক্রিশ্চান সন্তদের মতো, মদের পাশে বইটা অবশ্যই ধর্মগ্রন্থ হবে। সে আড়চোখে বইটার নামটা পড়লোওরিজিন অব স্পেসিস্। চার্লস ডারউইন নামে একজন লেখক। প্রকাশস্থল লন্ডন, ১৮৫৯।
কিন্তু হরদয়াল বললো–আপনার সব কুশল তো? আপনার কথা আমি প্রায়ই ভাবি। সাহিত্যের লোক আপনি। এখানে ছাত্রদের প্রাইমার পড়াতে আপনার অবশ্যই অসুবিধা হচ্ছে।
সর্বরঞ্জন নিয়োগী বললো–পরম করুণাময় ঈশ্বরের যদি তার এই কর্মশালাতেই আমাকে আহ্বান করার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে সার, এখানে আনন্দিত হওয়াই আমার কর্তব্য।
