এখন কেট রাতের খাওয়া তৈরীতে ব্যস্ত। সংসারের কাজে এঘর ওঘরও যাওয়া আসা করছে। একটু প্রসাধনও করছে সে আজকাল। সে শোবার ঘরের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। যেন প্রসাধন কী করবে খুঁজতে লালের ছোঁয়া লাগা নিজের চাপা রঙের মুখটাকে, আর হাত ও বাহুকে দেখলো। জ্যাকেটের হুক খুলে গলার নিচে ক্যামিসোলের উপরে দুধসাদা ভি টাকে দেখলো। একটু সরে এসে দরজা দিয়ে যেমন সম্ভব শ্যামল রঙের বাগচীকে দেখলো দু-একবার।
একটু চঞ্চল হয়ে সে বাইরে এলো, যেন বাগচীর রংটাকে ভালো করে দেখতে। সে দেখলো বাগচী পড়ছে, লাল রঙে প্রমাণ তা সেই ক্রাইস্টের অনুসরণ;বসার ভঙ্গিটানমাজের কিন্তু। দু হাঁটু একত্র, গোড়ালির উপরে বসা। আচ্ছা! ঘন কালো চুলগুলো তো বেশ বড়ো হয়েছে। বাবরির মতো দুপাশে নেমেছে কান ঢেকে। না, পড়া নয় তো। মুখটা দ্যাখো ক্রাইস্টের ছবির দিকেই। একেবারে অবাক হয়ে গেলো কেট; বাগচীর দু-চোখের কোণ বেয়ে জল নেমেছে।
.
কিন্তু সেই শনিবারের সন্ধ্যার আগে তার দুপুর আর বিকেলের কথা বলা চাই। আর তাতে একরকমের সুবিধাও আছে।
এখানে ইতিহাসের উপাদানগুলো অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। না আছে রাজকাহিনী, না আছে পাথরে বা তামার পাতে লেখা সন-তারিখের সাক্ষ্য। অন্যদিকে নিয়োগীর মতো যারা তারা যা কিছু করে, ভাবে, বলে, লিখে রাখে, পত্রিকায় ছাপায়; যেখানে তা সম্ভব নয় সেখানে তাদের ডায়েরিগুলো সরব। ফলে ইতিহাসের কথা বলামাত্র সেই সব বিবর্ণ পত্রপত্রিকাই সত্যের সাক্ষী হয়। মনে হতে থাকে পত্রপত্রিকা অনুসারে গোটা দেশটা ওঠাবসা করতো।
সে যাই হোক, সর্বরঞ্জনকুসুমপ্রসাদ একদিন নিজেকে মার্টাররূপে দেখতে পেলো। সে অবশ্য তার ডায়েরিতে এই বিদেশাগত শব্দটাকে উল্লেখ করেনি।
সে বুঝতে পেরেছে, সুরেন ও নরেশ কলকাতার মানুষ হওয়ায় নতুন ধর্মমত সম্বন্ধে আগ্রহী বটে, কিন্তু থিয়েটারেও আগ্রহী কম নয়। চরণ দাস জনান্তিকে বলেছে থিয়েটার শেষ হওয়ার পরে সে আবার নিয়মিত বাইবেল পড়বে, কিন্তু অভিনয় না করলেও বন্ধুদের এই ব্যাপারে প্রপ্ট তাকে করতেই হবে। দ্বিতীয়ত, সে বুঝতে পেরেছে এখানকার যে শিক্ষাব্যবস্থা হেডমাস্টারমশাই প্রবর্তন করছেন তা হবে অনিবার্যভাবে কলকাতার থেকে পৃথক। এক সপ্তাহের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষার আদর্শ প্রশ্নপত্র হেডমাস্টারমশায়ের হাতে পৌঁছে দিতে হবে।
তৃতীয়ত রাজবাড়ির ব্যবস্থাপনায় শুধু যে ফরাসভাঙার শিবমন্দির ক্রমশ উলঙ্গ হয়ে আকাশকে স্পর্শ করতে চলেছে তাই নয়, রানীমার জন্মোৎসবও এসে গেলো, যার কেন্দ্রে কালীপূজা, যার আয়োজন, আবহাওয়ার মতো নিজের গৃহকোণে বসেও অনুভব করো।
এমনকী তার সাধ্বী স্ত্রী বলছিলেন, আমাদেরও তো নিমন্ত্রণ থাকে, ছেলেমেয়েরা তো এখনো নাবালক, আলো বাজি এসব দেখলে অথবা মিষ্টান্ন খেলে দোষ কী? সে তো প্রসাদ নয় শুনেছি।
অন্যদিকে কাল বিকেলে তাকে অবাক করে সুদৃশ্য এক প্রস্থ আসবাব তার বাসায় পাঠানো হয়েছে। হেডমাস্টারমশায়ের সঙ্গে আলাপে আসবাবের কথা উঠেছিলো বটে। একজন শিক্ষকের সুবিধার কথা মনে রাখা হয়েছে। চারিদিকের ঘোর কালোর মধ্যে এগুলি ঈশ্বরের কৃপালোক বলে অনুভূত হয়।
এরই ফলে সর্বরঞ্জনপ্রসাদের মনে একইকালে বেশ কিছু হতাশা এবং অল্প পরিমাণে উৎসাহ। সেই সকালেই সে অনুভব করলো তার এই পঁয়ত্রিশ বেড়ে বেড়ে পঁয়ষট্টিতে পৌঁছালেও তাকে হয়তো এই গ্রামে অল্প পরিমাণ উৎসাহ এবং সমধিক হতাশা নিয়ে চলতে হবে। না, না, এটা অনিবার্যই। কেননা যারা বি. এ. পাশ করেই হাকিম হতে পেরেছে তাদের মতো সৌভাগ্যবান সে নয়। ডেপুটি হওয়ার দিন গতপ্রায়। এমনকী বি.এ. পাশ করার পর সিম্পসন-স্যামসন অ্যাটর্নি কোম্পানিতে যে আর্টিকেল্ড ক্লার্ক হওয়ার কল্পনা ছিলো তাও অবাস্তব। কেননা ততদিনে তার সংসার কে চালায়? এই অবস্থায় ভাদুড়ীমশায় যখন এই চাকরি করে দিলেন তখন এটাকেই ঈশ্বরনির্দিষ্ট বলে মানতে হবে এরকম সম্ভাবনার কথা হেডমাস্টারমশায় বলেছেন। যাত্রার সময়ে সমাজবৃদ্ধরা সকলেই উচ্চকণ্ঠে তাকে আশীর্বাদ করেছে। সকলেই এক বাক্যে বলেছিলো : ইহাকে ঈশ্বরপ্রেরিত জ্ঞান করবে। মনে করো তোমার বদলে যদি পৌত্তলিক কারো এই চাকরি হতো? সে কি দেশের ওই অংশকে আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে সহায়তা করতো না? এখন তোমার আলোকে কত ছাত্ৰই না আলো জ্বালে!
কিন্তু প্রদীপের এই এক অনিবার্যতা-আলোর কেন্দ্রেই দাহ থাকে।
সুতরাং তার মনে দাহ ছিলো। আপাতত তা সুরেন নরেশ প্রভৃতির নাটকপ্রিয়তা, যার অন্য নাম তার চিন্তার পরাজয়, তাকে অবলম্বন করে তীব্র। এই অবস্থায় শনিবার সকালে স্কুলের জন্য পথে বেরিয়ে তার যেন অসংলগ্নভাবে মনে হলো, সেন্ট বার্থলোমিউ-এর ওরা জীবন্তে গায়ের চামড়া তুলে নিয়েছিলো, সেন্ট ফ্রান্সিসকে ওরা পাথর ছুঁড়ে মেরেছিলো। হে প্রভু, সুতরাং আমাকে দগ্ধ করো, কে না জানে খাদ পান না পুড়লে সোনা উজ্জ্বল হয় না, না পুড়লে আলো হয় না।
এসব চিন্তার ফলে তার মুখমণ্ডলে প্রশান্ত শান্তি, চোখে নিজের পরিবেশকে লক্ষ্য করার স্থির দৃষ্টি, কিন্তু অন্তরে আলোক বিকিরণ করার আগ্রহ, যাকে জ্বালার থেকে এককালে পৃথক করা যায় না। এইসময়ে পথের উপরে শ্বেতশুভ্র আলোর মতো কিছু একটা সে দেখতে পেলো। সে ভাবলো :এই আলোক, আশ্চর্য এই আলোক! এমনকী সে যখন আরো এগিয়ে গিয়ে এই আলোকের কথা ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করার কথা ভাবছে সে দেখতে পেলো সেটার উৎস একটা সাদা রঙের ছাতা। ছাতা যখন তার নিচে শিরোমণিমশায় অবশ্যই আছে। রাজবাড়ি থেকে প্রতি বৎসরের শেষে জলপূর্ণ তাম্ৰকলস ও এই ছত্র পেয়ে থাকেন। সর্বরঞ্জন মুখ লুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো, তাড়াতাড়ি স্কুলের দিকে চলতে শুরু করলো। এই শিরোমণি পদাধিকার বলে তার অধস্তন, কিন্তু যেমন ঠিক তিনদিন আগে, ঠিক তিন দিন, বলেছিলো, আলো জ্বালতে ব্রহ্মের যে এত বেকুবি, কেবল পোড়াচ্ছে আর দাহ করছে আপনাদের। ঠিক জানেন তো, সে ব্ৰহ্ম কিংবা খেস্ট? তখনই ঠিক করেছিলো সর্বরঞ্জন, সম্ভবপক্ষে শিরোমণির সঙ্গে ধর্ম সম্বন্ধে কথা বলবে না আর, যদিও শিরোমণির উপস্থিতিই যেন অবিরত তাকে তর্কে আহ্বান করে।
