বাগচী ভেবে ভেবে বললো–অন্নদাতা সম্বন্ধে এ রকম আলোচনা করা উচিত হয় না। আমার কিন্তু মনে হয়, এসব ব্যাপারে রানীমার, রাজকুমারের এবং দেওয়ানজির ধারণা শেষ পর্যন্ত এক নয়। যেজন্য গতবার রাজকুমার কলকাতায় না গিয়ে পশ্চিমে চলে গেলেন। দেওয়ানজি একাই ছিলেন কলকাতায়। ওদিকে বুজরুকের একটা ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত দেওয়ানজির মতই প্রাধান্য পেয়েছিলো। কিন্তু তারপরই কোনো বিষয়ে রানীমা আর দেওয়ানজির মতের পার্থক্য এমন প্রবল যে, রানীমা দেওয়ানজির ক্ষমতা কিছু খর্ব করেছেন। অবশ্যই এসব আমরা দ্বিতীয়বার আলোচনা করবো না। আপাতত রাজপুরুষদের সঙ্গে সখ্যস্থাপন, আর একটু এগিয়ে, রাজকুমারের রাজোপাধি পাওয়াতে যাতে প্রতিবন্ধক না আসে–এরকম কোনো উদ্দেশ্য হতে পারে।
কেট বললো–আচ্ছা, বাগচী, রাজকুমারের এখন বোধ হয় সাবালকত্ব হয়েছে। তাকে কখনোকখনো বিশেষ বিষণ্ণ দেখায়। এমন কি মনে হয় তোমার, তারাজোপাধি পেতে দেরি হওয়ার জন্য হতে পারে?
তখন তো লাঞ্চ। ভালো রান্না অনেকসময়েই মনকে সেদিকে নিয়ে যায়।
বাগচী তখন লাঞ্চের পরে বসবার ঘরে। পোশাক খোলা হয়নি, পায়ে জুতোর বদলে স্লিপার। হাতে আরামদায়ক পাইপ। একবার যেন অসংলগ্নভাবে তার মনে ওসুলিভান দেখা দিলো। তেমনি অসংলগ্নভাবে সে অনুভব করলো, কেট কিন্তু খুবই সাহসী। কিন্তু রান্নাঘরের। কাজ শেষ করে কেট এলো। হেসে হেসে বললো–পোশাক খুললে না, এখনই রোগী দেখতে যাচ্ছো নাকি?
বাগচী বললো–কে বলেছে? আজ আমার ছুটি নয়?
কেট গোপনে হেসে বললো–তাহলে কী ভাবছো এমন?
–আমাদের গ্রামে শুধু রাস্তা তৈরী হচ্ছে না। রাজবাড়ির সদর-দরজাটা নতুন করে করা হয়েছে। রাজবাড়িতেও নতুন কিছু করা হবে মনে হয়। মাপজোখ হতে দেখেছি। ওদিকে ফরাসডাঙায় নাকি একটা আধুনিক প্রাসাদ হবে।
কেট ভাবলো, এটাই বৈশিষ্ট্য, পরের সুখে সুখী হয়ে ওঠা। তার বাবা এটাকেই বাগচীর সবচাইতে আকর্ষণীয় গুণ বলতেন। প্রশ্রয়ের সুরে সে বললো–ও মা! কেন?
বাগচী বললো–সম্ভবত রানীমা থাকবেন।
-কেন?
-তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে কেট, রাজরাজড়ার ঘরে নতুন রানী এলে পুরাতন রানী ভিন্ন প্রাসাদে চলে যান।
তার মানে? কেট দুএক মুহূর্ত সংবাদটা মনে মনে ওজন করলো। বললো, ও, আচ্ছা, তাহলে ঠিকই ধরেছি।
কী ধরেছো? কেট বললো–ঠকে গেলাম। একটু বুদ্ধি করলে সংবাদটা তো আমিই দিতে পারতাম তোমাকে।
এবার বাগচীই বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো–রাজকুমারের বিবাহের কথা আগেই শুনেছো নাকি কেট?
-শুনতে হবে কেন? চোখেই তো পড়ছে।
-চোখে? সেকী! তাহলে বিবাহের অন্যপক্ষকে তুমি-ও আচ্ছা, আচ্ছা। বাগচী আনন্দে হেসে উঠলো।
–কিন্তু…, কেটের ভ্রূ একটু কুঞ্চিত হলো, বয়স একটু বেশি হলো না?
বয়স? তুমি কার কথা বলছো? নয়নঠাকরুন কি?
–তাছাড়া আবার কে? কেট উজ্জ্বল মুখে বললো, তা অবশ্যই পুরুষের চোখে ধরা পড়ে । বরং সেই বাড়তিটা অনেকসময়ে বেশি টানে। পরে, দিন গেলে
বাগচী বললো–দ্যাখো, দ্যাখো, এ ব্যাপারে আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। বেশি তো একটু বয়েস? বলবো? বলো তো আমাদের পরিচিত জানা পুরুষদের মধ্যে ভালোবাসাকে সবচাইতে বেশি কে জেনেছে? পারলে না তো! বলবো? শেক্সপীয়র। ঠিক বলিনি?
-এখানে শেক্সপীয়র কে হচ্ছে?
দ্যাখো ডারলিংশেক্সপীয়রের অ্যান্ কিন্তু তার চাইতে বছরদশেকের বড়ো ছিলেন। জানতে না তো! দ্যাখো।
আনন্দোজ্জল কেট বললো–কী সুন্দর হবে! কী সুন্দর মানায়! আর দুজনেই যে অমৃতসরসীতে ডুবে আছেন।
.
০৫.
কিন্তু আলোর কথা বলতে হলে বলতে হবে, সে তত শুধু লাল আর কমলা নয়। নীলাভ হয়, বিষণ্ণ বাদমী হয়।
সেদিন আবার শনিবার। প্রায় সপ্তাহ ফিরে এলো। অকালে বাদল হয়েছে। স্কুল ফেরত বাগচী ঘরে বসেছে। বোঝা যাচ্ছে, আজ রাজবাড়িতে যাবেনা। ইতিমধ্যে ঢিলে নাইট-গাউন পরে সে তার পড়বার ঘরে। আলো জ্বলছে সেজে। বিশেষ কোমল আলো। কফি নিয়ে কেট সেই ঘরেই বসেছিলো। দুজনের সংসারে বারবার দেখা হয়, বারবার গল্পও হয়। টিপয়টার উপরে সেজ, তার উপরে কফির ছোট্ট ট্রে-টা রাখা। সেজের গোড়ায় বাগচীর পাইপ পাউচ। পাইপের খানিকটা অ্যাম্বার, পাউচটা বাদামী। পাশের বইটার মলাট লাল। তাতে রূপালি রংও। রূপালী অক্ষরে লেখা ইন ইমিটেশন অব ক্রাইস্ট। কেট বইটাকে ভালোভাবেই চেনে। কেম্পিসের লেখা। বাগচী কতবার পড়েছে ঠিক নেই। সে নিজেও অন্তত বারদুয়েক। রঙের কথাই যদি, বাগচীর সেই ছোটো স্টাডি নামক ঘরে তার মুখোমুখি দেয়ালে এদেশের হাতে তৈরী কাগজে এদেশের এক চিত্রকরের আঁকা, এদেশের গেরুয়া মাটির রঙে আঁকা ছবিটার কথা বলতে হয়। কীবল দেখে বলেছিলো, খুব সরল করে আঁকা, এদেশের নমাজের ছবিনাকি? কেট বলতে বাধ্য হয়েছিলো প্রার্থনারত ক্রাইস্ট। কীবল কিন্তু এসব ব্যাপারে কৌতূহলী। বলেছিলো, তাকে কি প্রার্থনা করতে হতো? কিন্তু খুব লম্বা করে আঁকা নয়? কেট আবার বলতে বাধ্য হয়েছিলো, এটায় না জেনেও চিত্রকর এল গ্রেকো নামে একজনের স্টাইলে গেছেন।
তা, কফি খেতে খেতে বাগচী তার এবং কেটের মাঝের দু-হাত শূন্যটাকে বারবার দেখছিলো। আর কফির সেই অবসরেই ডিসিলভা ওসুলিভান সম্বন্ধে বলেছিলো। কেট একেবারেই অবাক হয়েছিলো শুনে।
