কফির পরে পাত্রগুলো সরানো হলে সার্জ বার করলো ফেলিসিটার। মুখবন্ধে সে বললো, দুটোইমাত্র দেখাবে। বটল গ্রীন একটা আছে। থানের অনেকটা রাজকুমারের ওস্তাগর নিয়েছে রাজকুমারের আচকান করতে। বাকিটায় একটা ভালো জ্যাকেট অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু যেটা সে মেমসাহেবের জন্য বিশেষ করে মনে আনছে তা লাল সার্জটা। কখনই টমি-ইউনিফর্মের লাল নয়। বলতে কী এ থানটার আধখানা দিনদশেক আগে জঙ্গিলাটের সিস্টার-ইন-লকে বিক্রি করেছে। বলতে বলতে সে সার্জটাকে বার করে হাতের খেলা দেখানোর কায়দায় আঁকি দিয়ে কয়েক ভাজ খুলে মেলে ধরলো।
যদিও প্রমাণ ছিলো না, ফেলিসিটারের কথায় ছাড়া, যে কাপড়টার আধখানা জঙ্গিলাটের বাংলোয় বিক্রি করেছে, কিন্তু কেট ও বাগচী দুজনেই কাপড়টাকে হাতে নিয়ে দেখলো। বুনোটটা মিহি, স্পর্শটা কোমল। রংটা নিয়ে একটু কথা হলো। টমিদের লাল থেকে কতটা পৃথক তা স্মৃতি থেকে ঠিক করা শক্ত হচ্ছিলো কেটের পক্ষে। তখন ফেলিসিটার হেসে বললো–ম্যাডাম এই সার্জ টমিদের গায়ে দিতে হলে মহারানীর ভারতরাজ্য বিক্রি করতে হবে।
কেট বললো– তা সত্ত্বেও–এটা অত্যন্ত দামী কাপড়।
দামের কথায় বাগচীর মুখের হাসিটা কমে গেল। তা দেখে কেট বললো–আমার তো ভালো গাউন রয়েছে অনেক।
তখন বাগচী বললো– হেসে-ফেলিসিটারের পরিশ্রমটাও ভাবো ডারলিং, একঘণ্টা গল্প শুনিয়েছে।
কেট রাজী হয়েছিলো। কাপড়টা নিশ্চয়ই ভালো। তাছাড়া বাগচীর চোখে তার আগ্রহ প্রমাণ হচ্ছিলো। সুতরাং ফেলিসিটার তার সেলসম্যানশিপ সার্থক করে বিদায় নিলো।
কেট বললো–খাবারগুলোকে বাষ্পে বসিয়ে এলাম। পনেরো মিনিটে সব গরম হবে। তখনো ঘরটায় ফেলিসিটারের অদৃশ্য উপস্থিতি বিরাজ করছে। তা অনুভব করেই যেন বাগচী। বললো–আ, ডারলিং, তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছি, মিদনাপুরের হেডমাস্টার একটি ফিটন কিনেছেন।
আচমকা সংবাদটা শুনে তার গুরুত্ব কোথায় তা খুঁজতে কেট কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। সংবাদটা এমনভাবে বলা যেন অন্ধকারে এই চাঁদ উঠলো। কেট হেসে ফেলো। কিন্তু বললো–সেই হেডমাস্টারকে আমরা চিনি না তবে কেন ঠাট্টা করছো?
-ঠাট্টা! একে তাই বলে বুঝি? ফেলিসিটার অন্তত একটা ফ্লাই কিনতে বলেছে আমাদের, টাটুটাই টানতে পারবে, সিমলার রিকশার মতোই-হাল্কা, সুন্দর-সেও কি ঠাট্টা?
কেট বললো–তাহলে আর কথা কী!
-এবার তুমি ঠাট্টা করলে। দ্যাখো, রাজবাড়ির হাত থেকে ফরাসডাঙা পর্যন্ত একটা মেটাল্ড রোড হচ্ছে। আর তাহলে তা থেকেও আরো ছোটো ছোটো তেমন রাস্তা বার হবে।
কেট হাসতে হাসতে বললো, পথের জন্য ফিটন না হয়ে ফিটনের জন্যই না হয় পথ । হবে, এবার বলো কোথায় যাবে। পিয়েত্রার কুঠিতে লাঞ্চ নাকি?
বাগচী বললো–আরে তা কেন? ফাদার রলের মিশন হাউসটার কথা ভুলে গেলে? সেখানে যেতে তোমার নিদেন একটা ফ্লাই লাগবে না?
কেটের মুখে হাসির পাশে ছায়া পড়লো যেন। সে বললো, কিন্তু তুমি সে বিষয়ে কিছু ভেবেছো ফাদার বাগচী?
বাগচী বললো–আমি কেন ভাবতে গেলাম? টাকাটা তো আমার নয়, মিশন হাউস বানানোর খরচ দেবে তাদের লন্ডন সোসাইটি। মরেলগঞ্জের ওদেরও উৎসাহ আছে। কীবল চাইছে রাজবাড়ির আনুকূল্য থাকে তা যেন আমি দেখি।
কেট উঠে দাঁড়ালো। বললো–চলো দেখি, খাবার এতক্ষণে গরম হয়েছে। কিন্তু ফাদার রলে তো ক্যাথলিক।
বাগচী কেটকে অনুসরণ করতে উঠলো। বললো–ওহ তুমি তাই ভাবছো? সে তো প্রটেস্ট্যান্টরাও। তারাও আমাদের ক্রিশ্চান মনে করে না। ক্যাথলিকরাই বা তা কেন করবে?
বাগচী কেটের মুখ দেখতে পেলো না, কিন্তু তার এই ভুল ধরিয়ে দিয়ে বেশ খানিকটা হেসে নিলো।
লাঞ্চে একসময়ে কেট বললো–বারেবারে চাইছো, কেন, কিছু বলবে?
–ভাবছিলাম।
কী? গাউনটার কথা বুঝি? সত্যি, কী হবে তেমন দামী পোশাকে?
বাগচী বললো–কেন? আমরা কি কলকাতা যেতে পারি না, সামনে ক্রিস্টমাস? এবার রাজকুমারের সঙ্গে সে সময়ে কলকাতা যাওয়ার প্রস্তাব আসতে পারে। আমরা যেতেও পারি।
কেট বললো–কিন্তু সেখানকার উৎসবে
-তুমি বলবে আমরা যিশাসকে ঈশ্বরপুত্র বলি না, মানবপুত্র বলি। কিন্তু তাকে সর্বোত্তম মানুষের একজন মনে করি, সেটাই আমাদের আনন্দের কারণ হতে পারে।
কেট ভাবলো, মানুষটি এই রকমই। কিছুতেই যেন বুঝবে না উৎসব একা হয় না। সমমতের দশজনকে লাগে। সেখানেও তো আমরা একাই। উৎসব বলতে যা তা পাশ দিয়ে বয়ে যাবে। কিন্তু তার ইচ্ছা হলে বাগচীর মন অন্যদিকে নিয়ে যায়। সে বললো–আচ্ছা ডারলিং, রাজকুমার কেন এ উৎসবে কলকাতা যাবেন?
বাগচী একটু ভেবে হাসিমুখেই বললো–ধর্ম নয় বলছো? না, ধর্ম নয়। রাজনীতি বলবে? তা হতে পারে, দেওয়ানজি যখন উদ্যোগী।
কেট বললো, একটু বুঝিয়ে বলো সেটা কী রকম রাজনীতি হতে পারে?
লাঞ্চের গল্প খানিকটা হালকাভাবেই হয়। কিন্তু রাজকুমারের ব্যাপার বলেই যেন কিছু গম্ভীরও হতে হয়। বাগচী বললো–আমি ঠিক বুঝি না, কিন্তু দেওয়ানজির পদক্ষেপগুলোকে সাধারণ মনে হয় না। আচ্ছা, তোমার সেই নিয়মিত টাইমস পড়া আর সেই সুবাদে বলা দেওয়ানজির মোকাবিলা কথাটা মনে আছে? তাছাড়া, কেট, ভেবে দ্যাখো, লন্ডনের ক্রিস্টমাসে গ্রামীণ লর্ডরাও এসে থাকেন।
কেটও একটু ভেবে বললো–তারা কিন্তু লর্ড-সভার সদস্য, সে দেশের রাজ্যশাসনের সঙ্গে যুক্ত।
