শিশাওয়াল হেসে বললো, সে গল্প সার। প্রথমে কলকাতার স্কুলে শিক্ষক ছিলো, শেষ চাকরি ছিলো রেলে। আমার এই চাকরি দিয়ে ভালো করিনি? খেতে পরতে পাচ্ছে, সন্ধ্যায় রম্ টানছে।
শিক্ষক ছিলো? লেখাপড়া জানে বলো?
-বিলক্ষণ! ইংরেজি বলে, লেখে। আমার কাছে চাকরি চাইতে এসে কলকাতার . কয়েকখানা পত্রিকা দেখিয়েছিলো, যাতে ওর লেখা কবিতা ছাপা হয়েছে।
–তাহলে স্কুলে চাকরি যাওয়ার হেতু? বাগচী বেশ বিস্মিত হলো। ক্রিশ্চান ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতো? ছাত্রদের হিন্দু অভিভাবকেরা আপত্তি করেছিলো?
না সার। হিন্দুদের কুসংস্কারের কথা বললে তত গোল হতো না, মদ আর গোরু না খেলে মানুষ সভ্য হয় না এ বললেও ক্ষতি ছিলো না। রটেছিলো যে, ও নাকি বলতে ভাইবোনের বিবাহে দোষ নেই। আসলে যিশুকে, মানে মাতা মেরীর কুমারীত্বেই, সন্দেহ। স্কুল কমিটির হিন্দু ক্রিশ্চান সব সভ্যই ওর বিরুদ্ধে চলে গেছলো।
তারা হেডমাস্টারকুঠির কাছে এসে পড়েছিলো। বাগচী ভাবলো, তারাও তো ক্রাইস্টকে ঈশ্বরপুত্র মনে করে না। ন্যায় অনুসারে মেরীর কুমারীত্ব মানে না। এই বেদনার চিন্তা থেকে মুখ তুলে সে কুঠির বাইরের দিকের বারান্দায় দূর প্রান্তে যেখানে ছাদ থেকে অর্কিডগুলো ঝুলছে সেখানে কেটকে দেখতে পেলো। ফুলের পরিচর্যায় নাকি অন্যমনস্ক।
ফেলিসিটার বললো, সার, আমি গেটের বাইরে দাঁড়াই, ম্যাডাম অনুমতি করলে আমি ভিতরে যেতে পারি।
গেট পার হয়ে কুঠির বারান্দায় উঠে বাগচী বললো, হ্যালো ডারলিং, আমরা এসেছি। ওখানে কী?
কেট ফিরে দাঁড়ালো। তাঁর মুখটা কি বিবর্ণ? মুহূর্তে রক্ত ফেরার চাপেই যেন স্বাভাবিকের চাইতে বেশি লাল হলো। সে হেসে বললো–একমিনিট আগে বনাতওয়ালা গেলো একজন।
বাগচীও ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে হেসে বললো–বনাত কিনবে নাকি? সহিসের জন্যে? এদিকে গেটের কাছে দ্যাখো শালওয়ালা।
কেট বললো–নাঃ, কেন কিনবো? ভাবছিলাম, রাজা রামমোহন পার্লামেন্টের কাছে সেই যে দরখাস্ত করেছিলেন যাতে ইংল্যান্ডের লোকেরা বেশি সংখ্যায় এদেশে এসে বসবাস করে।
বাগচী বললো–হ্যাঁ। কিন্তু সে কথা কেন? বনাতওয়ালাকে এড়াতে পারো, শালওয়ালাকে পারবে না। গেট দিয়ে ঢুকছে দ্যাখো।
সেদিন রবিবারের লাঞ্চের তখন ঘণ্টাদুয়েক দেরি। ফেলিসিটারও ভালো সেলসম্যান। প্রয়োজনের অতিরিক্ত, গ্রামের পক্ষে তো বটেই কলকাতাতেও তেমন সুলভ নয়, এমন পণ্য বিক্রি করতে যে মসৃণ প্রগলভতা দরকার তা ছিলোই তার। সে, উপরন্তু, হাসতে জানতো, ঠাট্টায় চটতো না, ধারে পণ্য দিতে কুণ্ঠিত ছিলো না, এবং তখনো–সে অনুগৃহীত এমন ভঙ্গি তার অভ্যস্ত ছিলো। সন্দেহ হয়, ব্যবসায় লাভের অতিরিক্ত কিছু সে পেতো, হয়তো ভালো লাগার ব্যাপার। কতকটা যেন সমাজ-সংস্কার, সমাজকে আধুনিক করাইবা, যেন ওপারের সংস্কৃতিকে এদেশে বহন করে আনা। এখনকার মতো তখনো আধুনিক হতে, সংস্কৃতিবান হতে মানুষের একটা সহজ আগ্রহ তার কারণ হতে পারে।
বসতে বসতে সে ঘোষণা করলো, সে কয়েক পিস কাশ্মীরি শাল দেখাতে এসেছে। তারপর প্রায় একঘণ্টা তার সেলসম্যানশিপে বাগচীর পার্লার সরগরম করে রাখলো। একের পর এক শাল বার করে একবার তা বাগচীর হাতে, একবার কেটের হাতে দিয়ে, তাদের গুণাগুণ, দাম, কীভাবে সেগুলোর কারুকার্য নষ্ট না করেও ম্যাডামের গাউন করা যেতে পারে তার বর্ণনা দিয়ে, একশো থেকে হাজার টাকা দামের শাল দেখিয়ে, বাগচীকে কতটা কমিশন দেওয়া যায়, সে বাগচীর জন্য কতটা লাভ ছাড়তে রাজী, তা বুঝিয়েও যখন অকৃতকার্য হলো, তখন সে রুমাল বার করে কপাল ঠোকার ভঙ্গিতে ঘাম মুছে, কিন্তু হাসিমুখে, বললো–এবার অনুমতি করুন কিছু সার্জ দেখাই। বিশেষ একটা লাল সার্জ।
কেট বললো, সার্জ? নানা, দরকার নেই। তাছাড়া টমিদের রং আদৌভালোনয়। বাগচী হেসে বললো–ডারলিং, আমাদের সাহেবকে একটু কফি খাওয়াতে পারো?
কেট কফি করতে গেলো। মিনিটদশেকে কফি নিয়ে ফিরে এলো। এই সময়ে বাগচী আর একবার ওসুলিভানের কথা ভাবলো। নিজের ভারতীয় মায়ের উপরে ঘৃণা ও অবিশ্বাস থেকেই সে কি মাতা মেরীকে কলঙ্কযুক্তা মনে করে? কিংবা তা কি একরকম বাস্তববোধ? চিন্তাটা মনকে স্বস্তি দেয় না। কিন্তু ফেলিসিটার তাকে সাহায্য করলো। পানীয়র কথা থেকেই যেন তার মনে পড়েছে এমনভাবে সে বললো, বাগচীকে সে কিছু পোর্ট ও শ্যাম্পেনও দিতে পারে। মরেলগঞ্জের জন্য ও দেওয়ানজির জন্য যা এনেছিলো তার বাড়তি কিছু আছে। তাই বা কেন? সে তো মাসখানেক বাদে ফিরে আসবেই, ক্রিস্টমাসের আগেই, তখন বাগচীর পছন্দমতো ওয়াইন এনে দিতে পারে।
বাগচী বললো–একমাস পরেই আবার? এত তাড়াতাড়ি?
ফেলিসিটার এক জায়গার গল্প অন্য জায়গায় নেয়। সে বললো–মরেলগঞ্জের ওরা ক্রিস্টমাসের আগে আগে এক গ্রোস মদ চেয়েছে। অর্ধেকটাই হুইস্কি, বাকিটা ব্রান্ডি, শ্যাম্পেন আর পোর্ট।
-ক্রিস্টমাসে? এক গ্রোস? বাগচী হাসলো।
ফেলিসিটার গলা নিচু করে এক চোখ বন্ধ করে বললো–ক্রিস্টমাসের উৎসবেই। ক্রিস্টমাসের গাছের জন্য ছোট্ট ছোট্ট রঙীন ডোমেরও অর্ডার পেয়েছি। অনেকে আসবেন। আসলে কিন্তু, যেরকম শুনি, এক কমিশন, নাকি ইন্ডিগোর।
কিন্তু তখন কেট কফি নিয়ে আসায় ফেলিসিটার ধন্যবাদ দেবার তাগাদায় মরেলগঞ্জের সেই বিশেষ উৎসবের গল্প ভুলে গেলো।
