রবিবার থাকায় যোগাযোগ হলো একটা। একটা হাঁক শুনে সে চমকে উঠলো। সে দেখতে পেলো, যেখানে সে প্রধান পথটায় উঠবে সেই মোড় দিয়ে একজন যাচ্ছে বটে। তার পরনে ট্রাউজার্স, কিছুটা বিবর্ণ চেক্ ফ্ল্যানেলের শার্ট, মাথার চুল বেশ লালচে, মুখের রং গাজর জাতীয়। হলুদ হলে, মাথার চুল কালো হলে চীনা বলা যেতো। অন্তত তার পিঠে কলকাতার চীনা ফিরিওয়ালাদের মতো কাপড়ের গাঁটরি। দৃশ্যটা বাগচী মনের মধ্যে নিতে না নিতে আবার হাঁকটা শুনতে পেলোবনাত, বনা-ত, বনা-ত।
সেদিকে চোখ থাকায় বাগচীকে আবার মৃদুভাবে চমকাতে হলো, তার টাট্টু এখন যেভাবে চলেছে তাতে যে কোনো লম্বা লোক অনায়াসে তার পাশে পাশে চলতে পারে, লম্বা পায়ে চললে তাকে ছাড়িয়েও যেতে পারে। বাগচী শুনতে পেলো তার কনুইয়ের কাছে কে বললো, গুড মর্নিং, সার; যদি অনুমতি করেন, আপনার কুঠিতে যেতে চাই। আজ রবিবার বলেই এই পথে এসেছি। কয়েকপিস্ ভালো শাল আছে, সার। গত রবিবারে আপনাকে পাইনি।
বাগচী হাসিমুখে ওসবে আমার দরকার নেই বলে নিরস্ত করতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তার আগেই শিসাওয়াল উঁচু গলায় গজ দশেক আগে চলা সেই ফিরিওয়ালাকে ডাকলো। বাগচী লাগাম টেনেছিলো। সেই ফিরিওয়ালাও পিছিয়ে এলো। সে কাছে এলে শিশাওয়াল বললো– আলফ্রেড মিনহাজ ডিসিলভা আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, রেভরেন্ড ফাদার বাগচী, হেডমাস্টার।
ভদ্র বাগচী বললো, হাউ ডু ইউ ডু মিস্টার ডিসিলভা।
মিনহাজ তার হলুদ দাঁতে হেসে ইংরেজিতে বললো, থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার। কিন্তু আমার প্রিন্সিপ্যাল আমার নামটা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন, আমি ডিসিলভা নই, রিয়ালি আইম ও সুলিভান।
তখন সেখানে আলাপ করার সময় নয়। বাগচী কিছু বলার আগেই শিশাওয়াল, যার প্রকৃত নাম য্যাকব ফেলিসিটার, বললো–ডিসুলিভান, তুমি ছোটো গাঁটরি আর পিতলের গজকাঠিটা আমাকে দাও। আর বিকেলের আগে পুবদিকটা শেষ করে এসো।
ও ‘সুলিভান তার বড় গাঁটরির নিচে থেকে একটা ছোটো গাঁটরি বার করে দিলো। তার হাতে এতক্ষণ বোঝা যায়নি, দুটো গজকাঠি ছিলো। তার একটা ফেলিসিটারকে দিয়ে আবেগহীন মুখে হাঁটতে শুরু করেই হাঁক দিলোবনাত। য্যাকব বললো–শুধু বনাত কেন? চাদর, চেকচাদর বলল, সুতি দোরুখী আলোয়ান বলেও হাঁক দাও। দিনে খানদশেক চাদর কাটা চাই।
ও ‘সুলিভান জোরে চাদ্দর বলে হাঁক দিলো।
বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–চেকচাদর কী?
এবারের ফ্যাশান, সার। উল আর সূতোয় মিশানো, নানা রঙের চেক। অল-উল বলে চলে যাচ্ছে। তিন থেকে চারে দিচ্ছি রং অনুসারে। তাঁতের একটা মোটা সুতোর চাদর যেখানে দুটাকা, রঙিন সুতোর চাদর বারো আনা থেকে দেড় টাকায় দিচ্ছি। দোরুখীগুলো দুটাকায়। চলুন, সার।
বাগচীর টাট্টু চলতে শুরু করলো, শিশাওয়াল তার পাশে হেঁটে চললো।
বাগচী বললো–তুমি আমার কুঠিতে যেতে চাইছে বটে, আমি কিন্তু শাল কিনবার কথা দিচ্ছি না।
য্যাকব বললো–না সার, মাল না দেখে কেন তা বলবেন?
বাগচী মনে মনে হেসে ফেলো, গতবারও এরকম ধরনের কথা হয়েছিলো বোধ হয়। ফেলিসিটার একখানা এমারেল্ড রঙের শাল না গছিয়ে ছাড়েনি, যা থেকে কেট একটা সুন্দর গাউন করেছিলো।
তার কুঠি তখনো খানিকটা দূরে। বাগচীর মন কেনাকাটা থেকে খানিকটা অন্যদিকে সরলো। সামনে খানিকটা দূরে ওসুলিভানকে দেখা গেলো। বাগচী ভাবলো, সুন্দর অসুন্দরের প্রশ্ন নয়, শুধু চুলের রংও নয়, আলফ্রেড মিনহাজ, তা সে ডিসিলভা বা ওসুলিভান যা হোক, তাকে দেখামাত্র ইউরোপীয়দের কথা মনে আসে। কিন্তু এটাও ঠিক, ভালো করে দেখতে গেলে, ড্রেগ আর স্কাম শব্দ দুটোও মনে আসে। বয়স কিছুতেই পঁচিশের বেশি নয়, কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক গুটিযুক্ত মুখের নাকটির অগ্রভাগ লাল, অনাবৃত বাহুর উপরে অনেক ছিট, ক্ষয়গ্রস্ত হলুদ দাঁত। ইউরোপীয় নয়, এদেশে এখনো এমন কোনো ইউরোপীয়ান আসে না যাকে অন্য ইউরোপীয়ানরা ফেলিসিটারের ভারবাহী হতে দেবে। স্বজাতির মানরক্ষায় হয়তো তাকে চাকরি দিতে। বাগচীর মন আবিল করে এই চিন্তা দেখা দিলো :হয়তো টাকায় বশীভূত কোনো ন্যানীর প্রতি কোনো ও সুলিভানের লালসার ফল।
কিন্তু তখন ফেলিসিটার বলছে–সার, ম্যাডাম অনুমতি করলে তাকে তো শাল দেখাবোই, আপনাকে এখন একটা প্রস্তাব দিতে চাই। দয়া করে ভেবে দেখুন। এখন তো এটা শহর হয়ে উঠছে ক্রমশ। বেশ কয়েকটি সুরকির পথ হচ্ছে, আপনাকে একটা ফেটনের বিষয়ে চিন্তা করতে বলবো কি? মেহগ্নি কাঠ, নিকেলের কাজ, ক্যানভাসের হুড। মরেলগঞ্জের ক্রিস্টমাসের আগেই একটা দিচ্ছি।
বাগচী হেসে বললো, না না, আমি একজন স্কুল-টিচার মাত্র।
শিশাওয়াল হেসে বললো, এটা কি সমস্যা? মিদনাপুরের হেডমাস্টারসাহেবকে গত মাসে একটা ফেটন এবং একটা খাঁটি ওয়েলার দিয়েছি। এই গ্রামে প্রকৃতপক্ষে এখন মিদনাপুরের চাইতে ভালো পথ তৈরী হচ্ছে। এমনকী সার, একটা ফ্লাই আপাতত নিন। আপনার টাটুর মাপে, খুব হালকা, সিমলার রিকশার মতো, দুজনে বসা যায়, দু চাকার, হালকা সেগুন আর নিকেলের একটা ফ্লাই…
বাগচী ফেলিসিটারের কথা সবটুকু শুনতে পায়নি। সে ভাবলো, কিংবা সত্য পরিচয় খুঁজে না পাওয়াতেই ডিসিলভা হবে কিংবা ওসুলিভান–এই সমস্যা। এটা তাহলে বড়ো বড়ো শহরের উপান্তে যে মিশ্রজাতের মানুষগুলো কখনো নিজেদের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, কখনো ইউরেশিয়ান বলে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছে, যারা ইংল্যান্ডেরও নয়, ভারতেরও নয়, তাদের শিকড় খুঁজে বেড়ানোর সমস্যা। ও হো, এ তো গাইলসের চিঠি থেকে নামলো যেন। সে বললো, তোমার এই ওসুলিভান লোকটি…।
