বাগচী বললো–কাপড় নাই পেলাম। এই আলাপও ভালো লাগছে। কিন্তু, ওস্তাদ, এরকম হলো কেন?
মেহের বললো–হয়েছে কি আজ? তিন কৃড়ির উপরে দশ হলো, তিন কুড়ির খবর রাখি। পেত্রোদের স্থায়ী গুদাম হওয়ার আগে পূজা ঈদের ছমাস আগে দাদন বরাত নিয়ে সাধাসাধি, এক, দেড় মাস আগে কুতঘাটে নৌকার ভিড় লাগতো মহাজনের। রেশম তো বটে, সুতোর শাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি। সেসব নৌকা বন্ধ হলো; এক কুড়ি বছর আগে পেত্রোদের জাহাজ চলাও বন্ধ হলো।
মেহের থামলো একটু, পরে হেসে বললো–তো পেত্রো বলতেন, মেহের, হাজার বছর ধরে কাপড় দিয়ে সোনা লুঠেছে ওদের, এবার ওরা আইন করে কাপড় দিয়ে সোনা লুঠবে। শুধু কি কাপড়? ইস্তক খোস্তা, কুড়ুল, দা, হেঁসো সেই জাহাজে আসছে। বাগচী বললো–মেহেরমিঞা, তোমার বোরকেড জাহাজে নাই উঠলো,এদেশেও তো বহু লোক
হুজুর ফেশোয়ান বদলায়। পাঁচ সাল আগেও বুজরুক খাঁর কিস্তি যেতো লখনউ। এখন, হুজুর, সেখানে সে ফেশোয়ান নেই। কে আছে কলকেতায় মুকসুদাবাদে দবীরখানি মসলিনের শাড়ি পিন্ধে, কামিজ বানায়, দোপাট্টা পিন্ধে? কে আছে হুজুর, মালকানি বোরকেটের শেরোয়ানি, আছকান, চোগা পিন্ধে?
বাগচী তা সত্ত্বেও বললো–শুনে মনে হয় বরাত ছাড়া, আগাম টাকার দাদন ছাড়া তাতে বসতে চাও না।
মেহের আলি একটু ভেবে বললো–হুঁজুর, সুতোর টাকা বরবাদ, এক মাসের পরিশ্রম বরবাদ যদি এক থান বুনে একবছর বসতে হয় তা বেচতে। আসলে, হুজুর, রোগটা অনেক দিনের। সেই ছিয়াত্তরের রক্তবমি। রাজবাড়ি আর পেত্রার চেষ্টায় ওস্তাদেরা বেঁচেছিলো, কিন্তু পাঁচআনি লোক, কাটুনি জোলা, রজক ওস্তাগর, কামার কুমোর, গুড়ে, চাষী শেষ হয়েছিলো। পেত্রো বলতেন, তারপরে শরীর সারেনি, জাতটাই আধহাত কমে গিয়েছে।
বাগচীর কৌতূহল বাড়ছিলো। রাজনগর-ফরাসডাঙার এ অঞ্চলের খ্যাতিটা তাহলে ছিলো তাঁতের। সেজন্যই বর্ধিষ্ণু। নতুবা শুধু ধানে, তিলে আর গুড়ে বোধ হয় অত বাড়ি রাজবাড়ি এতদিন ধরে গড়ে ওঠে না। সে বললো–আসলে তোমাদের বাজার চাই, বাজারে নিয়ে যাবে দাদনদার বরাতদার মহাজন চাই।
মেহের আলি বললো–আমার ছোটো দামাদের ভাই মহাজন হতেছিলো, এ গেৰ্দের মাল নিয়ে দুসাল কলকেতায় গেলো।
-তারপর?
–মিয়াদ খাটছে।
–সে কী?
মেহের বললো–দাদনদার হতে রাজার জাত হতে হয়। দামের কাজ আদায় হয় না সহজে, আগাম টাকা গরীবের পেটে ঢুকে যায়। আদায় করতে-তো ইংরেজ তা করেঝকে অন্যের মিয়াদ হয়।
.
০৪.
মাসদেড়েক পরে এইসব কথা বিচিত্রভাবে বাগচীর মনে ফিরেছিলো চরণের বাড়িতে বসেই। সে তো পিয়েত্রোর কাছেই শুনেছিলো সেই পাঠান-মুঘল আমলে, ইউরোপেও যেমন, ধর্ম নিয়ে বর্বরতা ছিলো, কিন্তু প্রতিবাদও ছিলো; ক্ষুধা ছিলো, সোনা-জহরৎ ছিলো,নবাব রাজা ওমরাদের বিলাস ছিলো, সোনাও ফিরতে কারিগরদের হাতে। এখন প্রতিবাদ নেই, সোনাজহরৎ নেই, কারিগর নিশ্চিহ্ন। সে চিকিৎসক এবং সেটা তো ডিসপেনসারি। হঠাৎ এরকম ঘোর লেগেছিলো তার মনে! তার স্কুল, ছাত্র, হাটবাজার, লোকজনের চলাফেরা এসব কি সেই ছিয়াত্তরের উচ্ছিষ্ট।
কিন্তু সেদিন তখন বেলা হয়েছে। প্রথম শীতের হলেও, বেলা বারোটায় প্রকৃতি তপ্ত, প্রখর। তারা চরণের বাড়ির দিকে ফিরছিলো। বাগচী লক্ষ্য করলো, চরণ এতক্ষণ সঙ্গে থেকেও একটা কথাও বলেনি। সে হেডমাস্টারের এই রেশম খোঁজায় কৌতুক বোধ করছে না তো? তার এই রেশম খোঁজা কি অস্বাভাবিক ব্যাপার হলো? সে বললো–হা চরণ, তুমি কি সেই অসুস্থ ডেভিলের কথা ভাবছো এখনো?
চরণ বললো–ওরা দাদন-বরাতের কথা বললো।
বাগচী বললো–তাই তাই। সিল্ক নেই বলে এমন করে নেই তা কি তুমি জানতে?
চরণের বাড়ির কাছাকাছি এসে বাগচী বললো–তোমাদের সেই নাটকের কথা যা বলছিলাম।
নাটক হবে। তবে আমি ঠিক ওতে নেই।
বাগচী ভাবলো, দ্যাখো, কেমন সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।
চরণের বাড়িতে টাট্টুর লাগাম হাতে নিয়ে সে বললো––ও হা, ইসমাইলের চোখটা! মার্ক সল দিয়েছো তো? তাই দিও আবার।
টাট্টুরও ক্ষুধার সময়। সেটা একটু তাড়াতাড়ি চলছে চেষ্টা করে, এমনকী তার ক্ষুরে ঘোড়ার মতো না হোক পটপট করে একটা শব্দ হচ্ছে। বাগচী তখন ভাবলো, কী লজ্জা থেকেই বাঁচা গেলো! ভাগ্যে সিল্ক পাওয়া যায়নি। তার চল্লিশ হয়েছে। কেটের ত্রিশ হবে। আজ সন্ধ্যায় পিয়ানো বাজাতে বলা যায়। আমি চরিতার্থ, হে ঈশ্বর! কিন্তু সিল্ক কিনে দিলেই তা বেমানান হতো। এই সিল্ক খোঁজার গল্পও কি বলা যাবে? কেটের তো এমন মনে হতে পারে, সে কাল রাত্রিতে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসব তারই পুরস্কার দেওয়ার ইচ্ছা। না, না। এ রকম ধারণা অন্যায় হবে যে একজন শুধু কেটকে নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলো না।
সে যখন সার্বভৌমপাড়ার পাশ কাটিয়ে গঞ্জের রাস্তা ধরছে, ভাবলো, তাহলে এতদিন এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্তে নেওয়ার ভার আলোচনা না করেও কেটের উপরেই রাখা ছিলো? কেটই দেখতে গেলে তাদের সংসারে ভিন্নজাতীয়া হিসাবে অতিথি। ব্যাপারটা কি এই ভিন্নজাতীয়তার দরুন সমস্যা হয়ে ছিলো? স্বীকার করতেই হবে, কেট যেমন বুদ্ধিমতী, তেমন জেদী। এ দুটোর প্রকাশের সময়েই তাকে কিন্তু ভালো দেখায়।
বাগচী তখন স্কুলডাঙার দিকে যাওয়ার প্রধান পথগুলোর একটির কাছে। সেটার ধার দিয়ে একসারি গাছ থাকায় তার সবটুকু চোখে পড়ছে না। সে ভাবলো, যা স্বাভাবিক তা নিয়ে সে ভাবছেই বা কেন? …সকলেই ভাবে? তাও কিন্তু তার এই চল্লিশে কাউকে জিজ্ঞাসা করতে পারে না। কেটকে জিজ্ঞাসা করা যায় না। না, না। এটা তার নিজস্ব সিক্রেট থাক।
