.
০৩.
তখন তারা ফরাসডাঙা দিয়ে চলেছে। বাগচীর মন ততক্ষণে পথঘাট থেকে রেশমের দিকে সরে গিয়েছে। সে বললো–এবার তাহলে আমাদের এই গ্রাম ক্রমশ হুগলী চুঁচুড়া, শ্রীরামপুরের মতোই একটা শহর হয়ে উঠবে দেখো। কিন্তু পরক্ষণেই বললো–এদিকেই কোথায় ধনঞ্জয় বসাকের বাড়ি, সেদিকেই চলল।
সেকালটা, অবশ্যই, রাজনগরে আর এমন ছিলো না যে বাগচী যে কোনো সকালে বেরিয়ে তার আশামতো ব্রোকেড-সিল্ক দূরের কথা গরদ-মটকাই পেয়ে যাবে। সে প্রথমে বসাক-পাড়ার ধনঞ্জয় পরে মালিকপাড়ার মেহেরালির দেখা পেলো। চিকিৎসার সূত্রে তারা পূর্ব-পরিচিত বটে। তাঁতিদের মধ্যে দবীর বক্সের সাগরেদ আল্লারাখা বসাকের কথা বাদ দিলে তারাই এ অঞ্চলে প্রধান।
ধনঞ্জয়ের লম্বাৰ্তাতঘরে তখন তাত চলছিলো; অন্তত চারখানায় কাজ হচ্ছিলো; তারই একখানায় সে নিজে। সে জানালো রাজবাড়ির উৎসবের দরুণ সে কিছু তসরের গড়ার বরাত পেয়েছে। শীতে ওম দেবে, কিন্তু খসখসে আর মোটা। হুজুরের হুকুম পেলে সে পরে এক থান তসর বুনে দিতে পারে। গরদ চাইছেন, সে সুতো নেই। বামুনমশায়রা মাঝে মাঝে তসর কেঠো নেন, গরদ কে নিচ্ছে আর? শুনেছি মালিকবাড়ির ওরা রাজবাড়ির দরুন গরদের শাড়ির বরাত পেয়েছে। দেখুন ওখানে, তাছাড়াও গরদ বুনছে কিনা। সুতোনাকি রাজবাড়ির সরকারই এনে দিয়েছে।
বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–এখানে বুঝি গরদের সুতো হয় না?
-হতো তো। সে কিন্তু পেত্রোসাহেবের আমলে। ফরাসডাঙার আধখানায় উঁতচাষ ছিলো, আজ্ঞা।
-এখন বুঝি তসরের সুতো হয়। বামুনদের লাগে বলছিলে।
–আজ্ঞে না। সেও তো আনাতেই হয়। দামে কম,ঝুঁকি কম। বামুনে তসর বছরে দশখানা বিকোয়, দাম পেতে আজ্ঞে একবছর। কিনছে কে যে কাটুনি সুতো কাটে, তাঁতি তাঁত বয়? জোলাপাড়ায় দেখুন গামছা আর মোটা সুতোর মাঠা। আট আনায় যে মিলেন শাড়ি, তাঁতি দিনরাত খেটে ডেড় টাকায় দিতে পারবেনি। আর বামুনমশায়রা যে কিনবে আমরা আগে তো দেবো-থোবো। আমরা গিইচি তো তেনারা রইলেন? শাপমুন্যিরও আর আগুন নেই।
বাগচী হেসে ফেলো, কিন্তু বললো–না, না, বোধ হয় ঠিক বলছো না। পিয়েত্রো গত বলে খরিদদাররাও গত হবে কেন?
ধনঞ্জয় বললো–এখন বুঝি, আগেই টান ধরেছিলো। এখন ভাবলে বুঝি, ত্রিশ বছর থেকে তাঁতের বৃদ্ধি বন্ধ ছিল। সাহেব থাকা তক বাজারের কথা ভাবতাম না। বোনা মাল গুদামে পৌঁছে দিলে হলো, সুতো চাই, আনো গুদাম থেকে। দেখতে হতো মালটা কী হচ্ছে, তাতে হাঁকফাঁক না পড়ে।
-তাহলে বলছে, পিয়েত্রোর মতো মহাজন আর একজন না-আসা পর্যন্ত তসর গরদ আর উঠতি হচ্ছে না।
আজ্ঞে না। নামার দিকে। বরাত ছাড়া, আগাম দাদন ছাড়া কে বুনবে? কী এক মিলেন কাপড় হয়েছে, তাই নাকি বাবুয়াদের ফ্যাশোয়ান। সাপানে কাচো, গরমে ইস্তিরি চালাও। কে আর তিনগুণ দিয়ে রেশম কিনছে?
বাগচী বললো–হ্যাঁ, ধনঞ্জয়, কী হবে তাহলে এখন?
ধনঞ্জয় বললো–জন্ম থেকেই শুনছি, কী হবে? বোকার জাত সার, ধানপানের কাজ জানি না, রোদজল সয় না, কাদাপাকে গা ঘিনঘিন। কী হবে দেখেন গে ওস্তাগর পাড়ায়। দরজায় দরজায় রঙের ভ্যাট, ধুমসো চাড়ি-গামলা, কাঠের ছাপা, ইস্তিরির কুঁদো। সাদামাটা রেশম চলে না, কে আর কিনছে? রঙিন আর ফুলদার
বাগচী অপ্রতিভের মতো হেসে বললো–তাহলে ব্রোকেড দূরের কথা?
ধনঞ্জয় বললো–চরণভায়া, মাস্টারসাহেবকে নিয়ে মালিকবাড়ি যাও। মেহেরচাচার পাগলামি আছে। বোরকেট করলেও করে দিতে পারে।
মেহের মালিকের বয়স অনেক হবে। মুখে সাদা কিন্তু সৌখীন ফরাসী কায়দার দাড়ি। কথা বলার আগে ঠোঁটে হাসি জড়ায়।
বাগচী তার কাছে মেমসাহেবের গাউনের উপযুক্ত সিল্কের কথা বলতেই সে বললো–সে আর হয় না।
-ব্রোকেড চেনো, মালিক?
মেহের আলির আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। কী একটা বলতেও যাচ্ছিলো–কিন্তু কথাটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো, পেত্রো বুজরুকের বাপেরা আমার আব্বাজান আর চাচাজীকে চুরি করে এনেছিলো মুকসুদাবাদ থেকে। ভরার খুবসুরৎ হিন্দু মেয়ে দেখে নিকাহ দিয়েছিলো।
বলো কী? বাগচী হেসে ফেলো।
–জি, চাবুক খাও, নয় বোরকেড়। রেশমে ফুল ফোঁটাও, ঠাসসা যেন জল না গলে। বোনো জমিজিরৎ মৌরসীতে। লেকিন বিশ থান বোরকে।
–এসব গল্প।
কারিগরে আর ফকিরে ওই এক মিল, হুজুর। কারিগরের বিশ থান হয়ে ওঠে না, ফকিরও খোদাকে পায় না। কিন্তু এই জমিজিরত পেত্রোদের দেওয়া। তো, ওদিকে দবীর বক্সের দবীরখানি মসলিন, ইদিকে আব্বাজানের মালকানি বোরকেডের নাম ছিল, হুজুর। লোকে বলতো, আঙুলে হয় না শুধু, তুকতাক আছে।
বাগচী বললো–ব্রোকেড হয় না, ঠাসা জমির গরদও কি হয় না?
তখন মেহের তার তাতঘরে ঢুকলো। লম্বা উঁচু আটচালাটায় তখনো আট-দশখানাঠাত। তিন-চারটিতে কাপড়, একজন একটিতে কাজ করছে। মেহের জানালো সে তার ছোটো ছেলে। মেহের নিজেই তাঁতের উপরে ঝুঁকে বললো–এসব কাপড়ে কি আপনার হয়? কিন্তু কাপড় দেখে বললো, না, হুজুর, এ আপনাকে দেওয়া যায় না। ছেলেকে হেঁকে বললো, এ রকম কেন রে?
ছেলে বললো–ওখানা রাজবাড়ির নয়। হীরু মহাজনের দরুন। সে বলেছে, মুখপাত, ঠেসে দিও, সব ঠাসলে দামে পোষায় না।
মেহের আলি বললো–না হুজুর, এদিকে ঘুরে লাভ নেই। আপনি বরং আল্লারাখার খোঁজ নেন। সে এখনো রাজবাড়ির দরুন গরদ বোনে।
