চরণকে আজ অন্যরকমই দেখাচ্ছে। সে যেন কোথা থেকে মনকে ফিরিয়ে আনলো, বললো–কিছু বলবেন, সার? বাগচী প্রশ্নটায় অবাক হলো। বললো–তুমি কিছু ভাবছিলে, চরণ, আমার বক্তৃতাটা মাঠে মার খেলো। কোন রোগীর কথা ভাবছো? আচ্ছা, চরণ, তুমি কি মিশন হাউস দেখেছো? মনে করো, এই অঞ্চলে একটা মিশন হাউস হচ্ছে। সেখানে ইংল্যান্ডের মিশনারিরা থাকবেন।
চরণ বললো–মরেলগঞ্জের কুঠিতে একাধিক ইংরেজ সপরিবার আছেন।
চরণের তুলনাটা তার কাছে এত ভ্রমাত্মক যে বাগচী হেসে বললো–মনে হচ্ছে তুমি মিশনারীদের দ্যাখোনি। আমি তোমাকে তাদের ধর্মমত মানতে বলছি না। আমিও সব মানি না। মিশন হাউসের সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষা, বদান্যতা, পরোপকার, আধুনিকতা অনেক কিছু জড়িত থাকে। মরেলগঞ্জের কুঠিয়ালদেরই কেউ কেউ এ ব্যাপারে উৎসাহী। তুমি তো কীবল সাহেবকে নিজেই দেখেছো আমার কুঠিতে।
-তবেই তো, সার। দা ডেভিল ওয়জ সিক দা ডেভিল এ সেন্ট উড বি।
কী বললে? ডেভিল?
চরণ তাড়াতাড়ি বললো–হয়তো আমারই ভুল, সার।
না, চরণ, তোমার ইংরেজি উচ্চারণটা ভালোই। আমি মনে করতে পারছি না ছড়াটা কোথায় শুনেছি। কিন্তু দ্যাখো, এ অঞ্চলে মিশন হাউস হলে আমাদের গ্রামেরও পরিবর্তন হবে। তাছাড়া নতুন আদর্শ চোখের সামনে থাকা ভালো। আমাদের পুরনো আদর্শ প্রয়োজনমতো বদলে নিতে পারি। তাতে ভালো হয়।
-ভালো হয়?
তর্কে অভ্যস্ত পাদরির সতীদাহ নিবারণ ও বিধবাবিবাহ আইনের কথা মনে এলো। যুক্তি হিসাবে এটাকেই সে খুব জোরালো মনে করলো, কারণ চরণ নিজেই বিধবাবিবাহ করেছে। সে বলতে গেলে এদেশে কিছুদিন আগেও বিধবাদের পুড়িয়ে মারা হতো, এখন প্রয়োজনে তারা বিবাহিত হচ্ছেন। কিন্তু নিতান্ত ব্যক্তিগত এই যুক্তি থেকে সে নিজেকে সামলে নিলো।
পাইপটা ঝেড়ে পকেটে রেখে সে ঘড়ি দেখে হেসে বললো–দশটা বাজলোচরণ। আমি তোমাকে মিশনারিদের সম্বন্ধে অনেক বলতে পারতাম। কিন্তু এখন চলল, একটু ঘুরি। সিল্ক খুঁজতে হলে তুমি তাঁতিদের কাছেই যাও, তাই নয়?
চরণ বললো, চলুন সার, আমি দুমিনিটে তৈরী হয়ে আসছি।
চরণ দাস অন্দরে গেলে বাগচী ভাবলো : এটাও ভেবে দেখার মতো বৈকি যে মিশনারিদের প্রধান উদ্দেশ্য ধর্মান্তরীকরণ। কিছু মানুষকে তা ক্রিশ্চান করতে চেষ্টা করবেই। চরণ কি এই ভেবেই বিরক্ত? এটা কি চিন্তায় উঠে আসেনি, কিন্তু মনের তলায় আছে এমন স্বজাতিক্ষয়ের আশঙ্কা?
চরণ প্রস্তুত হয়ে এলে তারা বেরিয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ তারা পাশাপাশি নিঃশব্দে হেঁটে চললো। পরে বাগচী বললো–সব যদি ছেড়েও দাও চরণ, মিশনারিরা ইংরেজ শাসনকে তাড়াতাড়ি টেনে আনতে পারে। পথঘাট হবে, হয়তো রেল এসে যাবে, হয়তো তারে খবর পাঠানোর বন্দোবস্ত হবে।
এটা একটা কৌতুকের ব্যাপারই হলো। বাগচী টের পেলো না এই পথঘাটের কথাটা এইমাত্র বাইরে থেকে তার মনে ঢুকলো। তারা ফরাসডাঙার দিকে চলেছেতখন। তারা তখন যেখানে তার কিছু দূরে পথের উপরে বেশ কয়েকজন মানুষ কিছু মাপজোখ করছে। ওভারসিয়ার সুরেন তাদের নেতা। বাগচী যেন তাদের লক্ষ্যে আনলোনা, কিন্তু যেন আগের তর্কের টানে বললো, রাণিমার শিবমন্দির হচ্ছে, তাতে কত লোক একবছর থেকে কাজ পাচ্ছে, দেখেছো? মিশন হাউসও খুব ছোটো হয় না। তাদের বাড়িঘর পথঘাট তৈরীতেও কত লোক কাজ পাবে দেখো।
আলাপটা ক্রিশ্চান মিশন হাউসের অনেক বড় বড় সম্ভাব্য উপকরণ থেকে অকস্মাৎ কিছু লোকের কিছুদিন ধরে মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনায় নামলে চরণ হেসে ফেলো। আশ্চর্য রকমে অন্যমনস্ক না হলে এমন হওয়ার নয়। হেডমাস্টারমশায়ের কথা। কিন্তু তার কথাও অনেকক্ষণ থেকে কি একগুঁয়ের মতো শোনাচ্ছে না? সে যেন একমত হওয়ার সুযোগে স্বস্তি পেয়ে বললো–তা ঠিকই, সার। শিবমন্দির শুধু নয়। ডাকঘরের পর থেকেই এবার পাকা সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। শুনছি নাকি রাজবাড়ির সদর থেকে শিবমন্দির তকএকই পাকা রাস্তা হবে, আমাদের স্কুলের পাশ ছুঁয়ে, পুরনো ঝিলের উপরে অ্যাকোয়াডাক্ট তৈরী করে। চাষআবাদ নেই, কাজকর্ম নেই এমন লোকজনের উপকার হচ্ছেই তো বটে।
বলো কী? এসব বলোনি তো আগে? বাগচী হো হো করে হেসে উঠলো। বললো– তুমি তো আচ্ছা অন্যমনস্ক লোক হে! সামনে কত লোক সড়কের কাজ করছে দ্যাখোনি? ওখানে সুরেনবাবুদের দেখছি। মুখ ঘুরিয়ে চলো। বন্ধুদের দলে জুটে থিয়েটারে মাতো যদি আমার রেশম খোঁজাই হবে না।
খানিকটা দূরে গিয়ে বাগচী বললো–এত সব সড়ক কি শুধু শিবমন্দিরে যেতেই মনে করো?
চরণ বললো–শুনছি সেখানে পেত্রোর বাংলোও নতুন করে করা হচ্ছে। একটা নতুন বাড়িও নাকি উঠবে কলকেতার সাহেববাড়ির কায়দায়।
-তাহলেই দ্যাখো। আচ্ছা, সেখানে সে বাড়িটা কেন হবে আন্দাজ করছো?
চরণ বললো, ওটা তেমন তেমন সাহেবসুবোদের জন্য গেস্টহাউস হতে পারে। হতে পারে রাজবাড়ির কেউ থাকবেন, রানীমাও হতে পারেন।
বাগচী ভাবনো, রানীমা, রানীমা কেন? তা, শুনেছি রাজাদের বিবাহ হলে তেমন ব্যবস্থা হয়। চরণ চিন্তা করলো, তার কথাটা কি শ্লেষের মতো শুনিয়েছে? এ বিষয়ে সে হেডমাস্টারমশায়ের সঙ্গে একমত যে রাজবাড়ির মন্দির, সড়ক ইত্যাদির ব্যাপারে মানুষ কাজ পাচ্ছে। তা দরকার ছিলো। কুমোর, কামার, তাঁতি, চাষীদের কাজের বয়স হলেই বর্ণগত জীবিকা ধরবে সে সুযোগ আর কোথায়? তাদের কেউ কেউ জীবিকা পাচ্ছে। কিন্তু আর সব জমিদারের মতো রানীমা যদি কলকাতা ঘেঁষা হতেন? সে মনে মনে হাসলো: আসলে বিধবা রানীমা ক্রিস্টান ব্রাহ্মদের ব্যাপারগুলোকে ম্লেচ্ছকাণ্ড ভেবে কলকেতার দিকে যেতে চান না। তাই উপকার।
