ছাত্ররা হকচকিয়ে বারান্দা থেকে নেমে গেলো।
বাগচী বললো, তোমাদের ইসমাইল আমাদের বুঝি কেউ নয়? তুমি কিন্তু টক খেও ইসমাইল। ভয় পেয়ো না, চরণবাবু তো ওষুধ দিয়েছেনই। ইসমাইল কি ওষুধ নিতে আবার বিকেলে আসবে, চরণ?
চরণ অন্য দিনের চাইতে অনেক গম্ভীর। সে বললো–আমি ওকে সেরকমই বলেছি সার।
ছাত্ররা চলে গেলে চরণের বারান্দা ফাঁকা হয়ে গেলো। বাগচী রসিকতা করে বললো– দ্যাখো তোমার ওষুধের গুণ, ডিসপেনসারিতে একজন রোগী নেই।
চরণ বললো–এখন মসুর কলাই-এর ক্ষেত করার সময়, যার যেটুকু অঘ্রাণের ধান আছে কাটার সময়। দুএকজন এসেছিলো, ওষুধ নিয়ে গিয়েছে।
আলাপটা এগোলো না। ব্যাগ কাঁধে ডাকহরকরা দেখা দিলো। সেখানে বসেই ডাকের ব্যাগ নিলো চরণ, তেমন একটা মুখ বন্ধ ব্যাগ এনে দিলো ডাকহরকরাকে। চরণ যখন ডাকের এই কাজ করছে, বাগচী ভাবলো কী অদ্ভুত কাজ করে এই লোকটি। সকালে ডাকের কাজ করে, সেখান থেকে স্কুলে, আবার কিছু ডাকের কাজ, বিকেলে এই ডিসপেনসারিতে ওষুধ বিলোয়, নিজের ক্ষেতখামারের কাজ তো আছেই। নিয়োগী আসার পর থেকে সন্ধ্যায় ইংরেজি শিখছে। রবিবারেও এই ডাক এলো।
হরকরা চলে গেলে বাগচী বললো–রোগী আসে আমি দেখবো, তুমি ডাকের কাজ করতে পারো। চরণ ডাকের কাজ করতে শুরু করলো। বাগচী বসে রইলো খানিকটা সময়। এক এক করে দু-তিনজন রোগী এলো। তাদের বিদায় করে পাইপ ধরালো বাগচী। সে অনুভব করলো তামাকটা বেশ ভালো, আর এখনকার আবহাওয়াটাও। তাছাড়া কেট দেখা যাচ্ছে চিরদিনই বেশ সাহসী। ভাবো, সেবার রাজকুমারের সঙ্গে গড়ের জঙ্গলে চলে যাওয়া। অবশেষে ঘড়ি দেখে বললো–আর মিনিট দশেক। তোমার কাজ হলো? আজ দিনটা বেশ ভালো। ভাবছি তোমাকে সঙ্গে করে কিছুটা ঘুরি। আমার কিছু সিল্ক কেনার ইচ্ছা হচ্ছে যদি পাই। দেখা যাক না, কী বলে?
চরণ বললো–দু-তিন দিন আগে সেই আর্মেনি শিশাওয়ালকে দেখেছিলাম। তার কাছে সিল্ক নেই?
শিশাওয়াল কলকাতা থেকে নৌকা সাজিয়ে অন্যান্য বছরের মতো এবারও এসেছে। তার ব্যবসাই এটা। পণ্যের দিক দিয়ে সে একচেটিয়া। এসব অঞ্চলের ধনীদের, মধ্যবিত্তদের, এমনকী নিম্নমধ্যবিত্তদের উপযুক্ত পণ্য থাকে তার। মুখ্যত অবশ্য মরেলগঞ্জের কুঠিয়ালদের এবং রাজবাড়ির অর্ডার-সাপ্লায়ার। শিশাওয়াল নামও পণ্য থেকেই। কাঁচের শীট, গ্লাস টাম্বলার, চিমনি, ডোম, ঝাড় এসব তো বটেই, নানা আকারের মদের বোতলও অবশ্যই থাকে। কলকাতার আধুনিকতার কথা মনে রেখেই কুঠি ও রাজবাড়ি থেকে অর্ডার দেওয়া হয়। কিন্তু আধুনিকতার সৃষ্টি তো মুখ্যত বণিকের পণ্যে, সুতরাং আমদানি অর্ডারকে ছাপিয়েই যায়। অবশ্যই তার সেলসম্যানশিপও যথেষ্ট। সে ধনীদের শাল, দোশালা, বনাত আনে। নানা দামের রাগ-কম্বল আনে, সূতার বস্ত্র ইত্যাদিও আনছে নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য।
সম্ভাব্য রোগীদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বাগচী শিশাওয়াল থেকে রানীমার জন্মোৎসব, তা থেকে নাটকের চিন্তায় পৌঁছে মনে মনে হাসলো। জিজ্ঞাসা করলো–আচ্ছা, চরণ, খবরটা আজই শুনলাম, তোমরা নাকি এবার থিয়েটার করছে রাজবাড়িতে?
চরণ লজ্জায় মুখ নামালো।
বাগচী বললো–কী নাটক? সে কি আমি পড়েছি?
চরণ বললো–প্রথমে ঠিক হয়েছিলো নীলদর্পণ।
বাগচী মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো–কিসের দর্পণ? রসো রসো, মনে পড়ছে। গত মাসে দেওয়ানজি যে কয়েকখানা বই স্কুলে দিয়েছেন তার মধ্যে এটা ছিলো। কিন্তু ভাষা সহজ হলেও তা কিন্তু ছাত্রদের পড়ানো যায় না। ভাষা সহজ ভালো, কিন্তু অত গেঁয়ো ভালো নয়। বলবে ঘরের চারপাশের ভাষা। কিন্তু ঘরের চারপাশে তোজঞ্জালও থাকে। কিছুউপরে উঠতেই না স্কুল।
চরণ বললো–দেওয়ানজির সেরেস্তদার বেজো কলকাতা থেকে বইটা এনেছে। তা কিন্তু আমরা করছি না। গৌরীরা বুড়ো শালিখ পছন্দ করেছে, আর একেই কি বলে।
এসবও কি বেজোবাবু এনেছে? কার লেখা,কী বৃত্তান্ত সেসবনাটকের? চরণ বললো– হ্যাঁ সার, বেজোই এনেছে। মাইকেলসাহেবের লেখা।
কিন্তু বাগচী তখন নীলদর্পণের কথাই ভাবছিলো। সেই নীলকরদের অত্যাচারের কথা যা সেই নাটকে দগদগে করে আঁকা। সেই দাদন আর দাদনের নীল আদায়ের জন্য গাদন। সে বললো–আচ্ছা, চরণ, তোমার সেই ডানকানার খৃস্টানি আত্মার কাগজপত্তর জাল করার, লাখ বছর ঘুমিয়ে থাকার গল্প মনে আছে?
-ওটা, সার, গ্রাম্যরসিকতা হয়েছিলো। চরণ অপ্রতিভ হলো।
না চরণ, না। তোমাদের সেই রসিকতা বেশ তীক্ষ্ণ ছিলো। বলতে কি তোমাদের সেই আলাপ নীলদর্পণে ঢুকিয়ে দিলে মানাতো। সে তুলনায় নীলদর্পণের রসিকতাই মোটা।
চরণ অবাক হয়ে বাগচীরমুখটাকে দেখে নিলো। সে জানে হেডমাস্টারমশাই-এর চিন্তার খেই ধরা তার পক্ষে সম্ভব নয়। দেওয়ানজির বন্ধু, আচারে ব্যবহারে সংস্কৃতিতে যিনি পুরোপুরি ইংরেজ, তিনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন কে জানে! নীলদর্পণই এখনো মনে রেখেছেন,হয়তো শোনেননি যে তারা নীলদর্পণ নাটক করছেনা। মুখটা যেন থমথম করছে।
বাগচী বললো–দ্যাখোচরণ, লোকে বলে আত্মা কৃতকর্মের বিচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, কেউ বলে পাপের শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে হয়, এরকম মতও আছে–পাপপুণ্য, তার শাস্তি পুরস্কার সমাজ শাসনে রাখার জন্য তৈরী গল্প। কিন্তু, চরণ, অন্যকে পীড়ন করা যে পাপ এ কিন্তু খৃস্টানরাও স্বীকার করে।
