ঠিক এইসময়েই সর্বরঞ্জন কুসুমপ্রসাদ রাজনগরের জ্ঞানদা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক-শুনতে পেলো, মানুষের গলায় কেউ তাকে কিছু বলছে। তার সামনে, পিছনে, পায়ের নিচে কয়েক গজ রৌদ্রে উজ্জ্বল পথ, তার বাইরে কিন্তু বৃত্তাকারে কুয়াশা। সে শুনলো:করুণাময় আর বিধানচন্দ্র দুজন আলাদা বাবু, হুজুর কাকে খবর দিতে বলেছেন?
নিয়োগী পিছন ফিরে দেখলো বাগচীর সহিস কয়েক হাত দূরে করজোড়ে দাঁড়িয়ে। দ্যাখে, তার মুখে কিনা এই সকালেই একটা ঘাসের উঁট। নিয়োগী একবারমাত্র তাকে দেখে নিয়ে দম দম করে হাঁটতে শুরু করলো। সে অবশ্যই অন্য অনেক আদর্শবান ব্যক্তির মতো নিরর্থক, অসত্য অকিঞ্চিৎকরকে পিছনে ফেলে চলতে শিখেছিলো।
.
০২.
টাট্টুর উপরেই ট্যাকঘড়ি বার করে বাগচী দেখলো, নটা বাজতে চলেছে। চরণ দাসের বাড়ি কম করেও এক ক্রোশ। টাটুটাকে দ্রুততর করতে তার পশমদার ঘাড়ে চাড় দিয়ে যা, যা বলতে সেটা গলা লম্বা করে তা দুলিয়ে কঁকিয়ে গতির পরাকাষ্ঠা অভিনয় করলো। বাগচী তাকে আরো গতিশীল করতে পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে তার নিতম্বদেশে যু, যুঃ বলে চাপড় দিলে টাট্টু একেবারে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ালো। বাগচী অবাক। টাটুর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে গোড়ালি দিয়ে তার পেটে আঘাত করে হেট, হেটবলাতে টাট্টু আবার তার নিজের চালে চলতে আরম্ভ করলো।
বাগচী চশমা খুললো, রুমালে মুছলো, হাসলো। ব্যাপারটা ধরতে পেরে মনে মনে বললো, তাহলে এই গাধাটা চু চু আর যুঃ যুঃর তফাত বোঝে না।
তখন তার চারিদিকে ঈষৎ রঙিন কুয়াশার মধ্যে আরামদায়ক টাটকা রোদ, ভিতরেও জীর্ণমান ব্রেকফাস্টের কবোষ্ণতা। সে এক চম্পক করাঙ্গুল দেখতে পেয়ে মনে মনে হাসলো, তৃপ্তি বোধ করলো, স্থির করলো কেটকে বলতে হবে, অতটা করে চিনি যেন টাট্টুকে আর না খাওয়ায়। কিন্তু আগে যে চিন্তাটা মনে ছিলো সেটাকে খুঁজে পেলো না। অস্পষ্টভাবে মনে পড়লো, বিষয়টা বোধ হয় আত্মা আর মন। আত্মাও কাজ করে, মনও করে। যত বুদ্ধিসুদ্ধি তা তো মনেরই, তাহলে আত্মা কীভাবে কাজ করে? মনের কাজগুলোকে কি এরকম বলবে যে তার সঙ্গে খানিকটা বুদ্ধি করে চলার, লাভক্ষতির, মানিয়ে নেওয়ার চিন্তা থাকে, যতই আন্তরিকতা থাকুক?
এখন ভাবার সময় নয় এই ভাবতে গিয়ে সে ভাবলো কাল সন্ধ্যার কফির সময়ে, রাতের ডিনারের সময়ে কেটকে বিশেষ উত্তেজিত দেখাচ্ছিলো। বিশেষ তার গাল লাল হয়ে উঠেছিলো, চোখ উজ্জ্বল হচ্ছিলো। গাইসের চিঠির কথা উঠেছিলো আবার।
এটাও তার ভাববার বিষয় কিনা সন্দেহ। সকালে আয়নার সামনে তখন কেট কিন্তু ভেবেছিলো সে ঘুমিয়ে আছে। আজ দেরিই হয়ে গেলো ডিসপেনসারিতে যেতে। তা, কেট অবশ্যই সুন্দরী, গড়নটাও, তাতে প্রাচুর্যও আছে। এবার তার ত্রিশ হবে। আর তাদের বিবাহের তো এবার পঞ্চবার্ষিকী।
সে এদিক ওদিক চাইলো। সব চাইতে কাছের মানুষ একটা খেজুর গাছের মাথায় রস সংগ্রহ করছে। অবশ্যই বলতে পারো তার মতো চল্লিশের এক রেভরেন্ড পাদরির এসব ব্যাপারে বাক্যব্যয় করা উচিত হচ্ছে না। কেট নিশ্চয়ই বুদ্ধিমতী, সংসারের ব্যাপারে পদক্ষেপগুলো হিসাব করা। আর তুমি কি কল্পনাও করতে পেরেছিলে, কত সহজে পরিবর্তন আনা যায়, কথাটা বলা যায় কাল রাতে কেট যা বললো–! আমাদের সংসার এবার পূর্ণ হোক। অবশ্য এখন বলতে পারো, কালকের রাতের পোশাকে আর চুলের খোঁপায় কিছু বিশেষ ছিলো। খুব সোজা কথা–একটু মুখ লাল করে বলা, সংসার পূর্ণ হোক।
এরকমও সে শুনেছে যে কোনো এক বসন্তের প্রভাবে উভয়ে যখন কী এক লাবণ্যে পূর্ণপ্রাণ…কেট খুব বুদ্ধিমতী, হিসাব করে চলে। তা বুদ্ধির তো সেটাই ধর্ম। কিন্তু তুমি কি বলবে সন্ধ্যার সেই উত্তেজনা গাইলসের চিঠি নয়? একটা পরিবর্তন কিন্তু।
বাগচী ভাবলো, ও সেই নারীসংযোগের কথা। আচ্ছা আচ্ছা, নিয়োগীমশায়কে ওভাবে পথের উপরে ত্যাগ করা ভালো হয়নি। দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে নিলে হবে। সে মনে মনে হাসলো, কিন্তু লক্ষ্য করো কি ক্যাথলিক রলে, কি বৌদ্ধ শ্ৰমণ, কি হিন্দু সন্ন্যাসী পরিহার করতে বলে। তাকে কিছু লজ্জিত দেখালো। না, নিয়োগীকে দোষ দেওয়া যায় না।
বাগচী কিছু অন্যমনস্ক থাকায় চরণের সেই ডিসপেনসারির বারান্দার ভিড়টাকে লক্ষ্য করেনি। ফলে সে কাছাকাছি যাওয়ামাত্র চারিদিকে একদল ছাত্রকে দেখতে পেলো। তাদের মধ্যে দুএক পা এগিয়ে তার মনে হলো, এ সময়ে এখানে তাদের থাকার কথা নয়। সে বললো–তোমরা এখানে? কয়েকজন একসঙ্গে বললো–আমাদের ইসমাইলের চোখটা তো সারবে সার? বাগচী নিজেই তাদের সমস্যা ও উত্তেজনার কারণটাকে দেখতে পেলো। বারান্দায় বেঞ্চিতে বসা এক বালকের চোখ কপাল জড়িয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। বাগচীর এক হাতে লাগাম, অন্য হাতে ছাতা, সে দুটিকে দুজনের হাতে দিয়ে বারান্দায় উঠে কোটটাকে তৃতীয় জনকে ধরতে বলে ব্যান্ডেজ খুলতে শুরু করলো। অসুখটা কঠিন। চোখটা বিশ্রীরকমে ফুলে বন্ধ হয়ে আছে। যে তুলো দেওয়া হয়েছে তাতে রক্তের চিহ্ন। অন্যটিও আক্রান্ত, কিছু কম। বাগচী সস্নেহে ব্যান্ডেজটা আবার বেঁধে দিলো।
একজন ছাত্র বললো–ওকে ওষুধ দেন সার।
স্বভাবত ধীরভাষী চরণ ধমকে উঠলো–ওষুধ দেওয়া হয়েছে। যাও এখন, বিরক্ত কোরো না।
