–এ তো আশ্চর্যের কথা, সার, ভারি আশ্চর্যের কথা!
–হয়তো পরে একটা স্কুল কিংবা চিকিৎসালয়ও হবে সেই মিশনে।
নিয়োগী বললো–না, না, সার, এর চাইতে পরমাশ্চর্যের বিষয় আর কিছু হতে পারে ।
তারা পাশাপাশি হেঁটে চললো। বাগচীর একবার মনে হলো তার পক্ষে এখনই কি ঘোড়ায় ওঠা ভালো হবে? তার আর মিস্টার নিয়োগীর উদ্দেশ্যে এখন কিছু পার্থক্য আছে বটে। কিন্তু একজন ভদ্রলোক তার বাড়িতে এসেছিলেন, তাকে কী করে বিদায় নিতে বলা যায়? আলাপ চালিয়ে নিতে সে বললো, ক্যাথলিকরা কিন্তু এ রকম সাকার পূজাই করে থাকে। পুতুল না হোক, মূর্তি থাকে।
নিয়োগী বললো–অবশ্যই সার, তা কিন্তু পবিত্র ক্রিশ্চান ধর্ম।
কিন্তু সে অন্যদিকে ভাবছিলো, অন্তত তার ঠোঁট এবং চোয়াল কিছু চিবানোর ভঙ্গিতে নড়ছিলো। সে বললো–সার, আমাদের চরণ দাসের পদস্খলনের ব্যাপারটা-না, না, সার, এ কথা আমাকে বলতেই হবে-ওঠা তুচ্ছ ব্যাপার নয়। যদিও হয়তো স্ত্রীলোক অভিনয় করবে না, কিন্তু কী মারাত্মক, বিশেষ এই গ্রামে, রুগ্নদেহে কুপথ্য সম্বন্ধে যেমন, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেই হবে।
বাগচী ভাবছিলো, তার নিজের ধর্ম যা ক্যাথলিক বা প্রটেস্ট্যান্ট কিছুনয়, তাতে ঈশ্বরের কোনো আকার করার কথা ওঠে না, ওদিকে কিন্তু ভাবতে গেলেই আকার একটা আসে। ফলে অন্যমনস্ক থাকায় সে নিয়োগীর কথা সবটুকু শুনতে পায়নি। রোগের কথায় উৎকর্ণ হয়ে বললো–কী বলছিলেন? এই গ্রামে কি বিশেষ রোগের কথা বলছিলেন? বিশেষ কোন প্রাদুর্ভাব নাকি? শুনিনি তো!
নিয়োগী বললো–সত্যভাষণের সুযোগ সত্যই কম। সুযোগ হলে তার সদ্ব্যবহার করা উচিত। আপনি যখন এই গ্রামে ক্যাথলিক রলের মিশন হাউস কল্পনা করে প্রফুল্ল, তখনই দেখুন, কত না জাঁকজমক সহকারে শিবমন্দির হচ্ছে এই গ্রামে।
–রানীর মন্দিরের কথা বলছিলেন কি? ওঁরা ধনবান, জাঁক হবেই। গ্রামটাও ওঁদের।
কিন্তু, নিয়োগীর মুখ আরো গম্ভীর হলো, সে বললো–এও কি ভালো সেই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠায় রক্তচন্দন ব্যবহৃত হবে? বাগচী হো হো করে হেসে উঠলো, কিন্তু তৎক্ষণাৎ বললো–আমার লঘুভাব ক্ষমা করবেন, বিশ্বাস করুন শিব প্রতিষ্ঠায় রক্তচন্দন প্রয়োজনের কিংবা অধর্ম তা আমার জানা নেই। আপনার কি মনে হয় শ্বেতচন্দনই প্রশস্ত?
নিয়োগী বললো–না,না, এসব ব্যাপার লঘুভাবে দেখা উচিত হয়না। রক্তচন্দন কি রক্তের প্রতীক নয়? তাতে কি লিঙ্গ উপাসনা আরো বাস্তব হয় না। তিনি আমাদের অন্নদাত্রী, কিন্তু একবারও না বললে সত্য কুণ্ঠিত হয়। যে প্রকার শুনি তা হয়তো চন্দন নয়, রানীমার রক্তই।
নিয়োগী দুই কানে আবার তো আঙুল ঢোকালো বটেই, শিউরে উঠে চোখ দুটিও বন্ধ করে ফেলো। বাগচীর মুখ নিরতিশয় গম্ভীর। সে বললো, নমস্কার মশাই, আপনার বাসা অদূরে। তাছাড়া ডিসপেনসরিতে রোগী আসার সময় হয়ে যাচ্ছে।
বাগচী পিছনে তাকিয়ে তার সহিসকে দেখতে পেলো। সে টাট্টু নিয়ে এতক্ষণ নিঃশব্দে অনুসরণ করেছে। টাটুটা নিচু, চড়তে সহজ। বাগচী লাগাম হাতে নিয়ে টাটুতে বসলো।
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার সুযোগ চলে গিয়েছে; নবকৃষ্ণ, মতি শীল, এমনকী দ্বারকানাথ হওয়ারও সুযোগ কম। তখনকার কলকাতায় নিম্নমধ্যবিত্তদের একরকম প্রাবল্য চোখে পড়ে। কেরানি, মুৎসুদ্দি, দালালের। দালাল, শিক্ষক, কিছু উকিল, কিছু ডাক্তার, বড়ো জোর ডেপুটি, এবং দোকানদার, অর্ধ বেকার, বেকার। এদের এক অংশ খুব লিখতো, বক্তৃতা দিতে, পত্রিকা ছাপাতে। গবেষণা করতে হলে এইসব কাগজপত্রই হাতের কাছে। ফলে এ রকম ধারণা হয়, কলকাতায় তখন সমাজ ও ধর্মের সংস্কার ও সংস্কৃতি বিষয়ের আলোচনা ছাড়া কিছু নেই, সেই যুগটাই ছিলো সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের। তা অবশ্যই হয় না। তখনো যুগটা খাওয়া পরার দরুন অর্থ সংগ্রহের যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলো।
এখনো যেমন তখনো তেমন কলকাতার হালফিলের চালচলনকে সংস্কৃতি মনে করা হতো, যদিও হয়তো সংস্কৃতি কথাটা তখনো জন্ম নেয়নি। তখনকার দিনে মধ্য, নিম্নমধ্যবিত্ত স্কুলে কলেজে পড়া মানুষদের মধ্যে ধর্মমত, সুনীতি, দুর্নীতি নিয়ে, স্ত্রীলোকের শিক্ষা ও নানা রকমের সমাজ-সংস্কার নিয়ে আলাপ আলোচনা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছিলো। গো-মাংস খেয়ে, মদ্যপান করে সমাজ-সংস্কার করার চাইতে বিধবাবিবাহ প্রবর্তন, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রোধ, স্ত্রীলোকের শিক্ষা ও তাদের পর্দার বাইরে আনা এগুলোই সমাজ-সংস্কারের উপাদান হিসাবে মূল্য পাচ্ছে ক্রমশ যদিও কি উকীল, কি ডাক্তার, কি ইংরেজ ব্যসায়ীর মুৎসুদ্দি, কিছু সঙ্গতি হলেই উপপত্নী বা রক্ষিতা রাখাকে জীবনের সাফল্যের নিদর্শন মনে করছে। তখন মিশনারীরা ১৮৫৭র আশঙ্কাকে কাটিয়ে উঠতে না পেরে ক্রাইস্টের মত প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ধর্মের কুৎসা প্রচারের ব্যাপারটায় ঢিলে দিয়েছে। ভারতীয়রা বুঝতে পারছে, নামে মাইকেল, এমনকী রেভরেন্ড যুক্ত হলেও জীবনের প্রেয় সহজলভ্য হয় না। কিন্তু পৌত্তলিকতা যে মন্দ তা নিয়ে তর্কের অবকাশই ছিলোনা। শিক্ষিত হলে কথা নেই, এমনকী স্কুলের ছাত্র কী এক গ্লানিতে উপনিষদে মুখ লুকাবে যেন। ইংরেজ রাজা হওয়ায় এই এক সুবিধাও ছিলো, পথেঘাটে প্রকাশ্যে ধর্ম নিয়ে কথা বললে কাজীর লোকেরা ধরতে আসে । তখন তো নতুন যে ব্রাহ্মধর্ম তাতেও কোন শাখা আভঁ-গার্দ এমন তর্ক যেন দেখা দেবে। বেদ অপৌরুষের কিনা, উপাসনা-বেদীতে অব্রাহ্মণ বসবে কিনা এসব সমস্যা পার হয়ে তখন উপবীত ত্যাগের আন্দোলন হচ্ছে। আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে নববিধান বিচ্ছিন্ন হয়নি বটে, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ক্রাইস্ট সম্বন্ধে কোনো কোনো মন্তব্যের ফলে কোনো কোনো ব্রাহ্ম পত্রিকার গ্রাহক থাকতে অনিচ্ছুক হচ্ছেন। তখনো কেশবচন্দ্র রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে ব্ৰহ্মকে মা বলে ডাকতে শুরু করেননি, বিজয়কৃষ্ণ নিরাকার ত্যাগ করে সাকারে ঝোঁকেননি। তাহলেও ধর্ম তখন এক নিরতিশয় উত্তেজক বিষয়। অন্যদিকে তখন এদেশের ভাষায় নাটক লেখা হচ্ছে। এটা কৌতুকের যে নাটকের পৃষ্ঠপোষকেরা ব্যক্তিগত জীবনে মদ ও ভ্রষ্টাদের সঙ্গে যেভাবেই সংশ্লিষ্ট হোক, নাটকে সেসবের সমালোচনা দেখা দিচ্ছে, রায়তদের কষ্টের ইঙ্গিত থাকছে। কিন্তু সেই সব প্রাগ্রসর মানুষের প্রাগ্রসর অংশে নাটক সম্বন্ধেই বিরূপতা দেখা দিচ্ছে, কারণ নাটক অলীক, নারী-সংযুক্ত বিষয়। তখন এক দল মদ খেতে না শেখায় পুত্রস্থানীয়দের কী করে ভদ্রসমাজে পরিচিত করবেন ভেবে চিন্তিত, অন্য এক অংশে তখন মদ্যপান নিবারণ সম্বন্ধে ভাবা হচ্ছে।
