বলা বাহুল্য বাগচীদের প্রাতরাশ সেদিন অন্য অন্য দিনের মতো হলো না। বাগচী আলোচনাটাকে গ্রাম সম্বন্ধে, গ্রামজীবনের সুবিধা অসুবিধা সম্বন্ধে, নিয়োগীর সুবিধা অসুবিধা সম্বন্ধে ধরে রাখলো। অন্যান্য দিনের মতো তাদের পরস্পরের অন্তরঙ্গ বিষয় নিয়ে আলাপহলোনা। কেট নিয়োগীকে একবার আরো কিছু খেতে অনুরোধ করে ভাবলো, এসব হয়তো আমার ভাবা উচিত নয়, কিন্তু ভদ্রলোকের দাড়িটাকে অন্যের বলে মনে হয় যেন। আর এই মাথা নেড়ে কথা বলার ভঙ্গি? বাগচী একবার ভাবলো, ভদ্রলোক ছুটির ব্যাপারটাকে কত কঠিনভাবে নিয়েছেন দ্যাখো! ব্রাহ্মমুহূর্তে উঠে চলে এসেছেন, কারো গৃহস্থালিতে ব্যাঘাত হয় কিনা তা ভাবার অবকাশ পাননি।
প্রাতরাশ শেষ হতেই বাগচী পাইপ হাতে টপ হ্যাট মাথায় বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। অন্যান্য দিনের মতো পাইপ মুখে কেটের সঙ্গে আধঘণ্টা নিছক গল্পগাছা করার সুযোগও আজ ছিলো না।
তা দেখে বাগচীর সহিসও তার টাট্টু নিয়ে এলো।
বাড়ির বাইরে পথে এখন সকালের রোদ। উজ্জ্বলতায় ও কবোষ্ণতায় তা তৃপ্তিদায়ক। রবিবারের অভ্যাসমতো বাগচী চরণের ডিসপেনসারির কথা ভাবলো। ইতিমধ্যে সে বোধ হয় দেরি করে ফেলেছে।
সর্বরঞ্জন বললো–আপনি কি এখনই বেরোচ্ছেন, সার? আমার আলাপের দ্বিতীয় বিষয়টার দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলাম।
-ও, হ্যাঁ, বলুন বলুন। চলুন তাহলে আমরা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।
তারা হাঁটতে শুরু করলো। সহিস অগত্যা টাট্টু নিয়ে পিছনে হেঁটে চললো।
সর্বরঞ্জন বললো–এবার এ গ্রামে নাটকও হচ্ছে।
নাটক? মানে থিয়েটার? কলকাতায় হুজুগ উঠেছে বটে। হঠাৎ হচ্ছে যে?
–রানীমার জন্মোৎসবে।
বাহ! অন্যান্যবার শুনেছি যাত্রা হয়। তো আপনি এবং আমাদের সব শিক্ষকই অবশ্যই আমন্ত্রিত হবেন। শুনেছি খুব আনন্দ হয়।
–তা হয়তো হবে। কিন্তু থিয়েটার বলে কথা? বেশি বাস্তব নয়?
–যাত্রার চাইতে সাসপেনসন অব ডিসবিলিফ বেশি হয় বলছেন?
–আমাদের ছাত্ররাও তো তা দেখবে।
–খুব সম্ভব। শুনেছি রাজবাড়ির দরজা সে রাতে বন্ধই হয় না।
-তাহলেই দেখুন, সার! উপরন্তু যদি তারা দেখে তাদের একজন শিক্ষকই সেই অভিনয়ে অংশ নিচ্ছে–
–সে কী? কে? বাগচী অবাক হলো।
আমাদের চরণ দাস।
বাগচী হো-হোকরে হেসে উঠলো চরণ দাসকে অভিনয় করতে দেখার কল্পনায়। পথের ধারে সে দাঁড়িয়ে পড়লো। হাসি থামলে বললো–বলেন কী, আমাদের চরণ দাস? তার চোখের সামনে ধুতি, বেনিয়ান,দড়ির মতো পাকানো চাদর গলায় গম্ভীরমুখ এক যুবক ভেসে উঠলো যে কাজের ব্যস্ততায় প্রায়ই দাড়ি কামায় না।
গম্ভীর স্বরে সর্বরঞ্জন প্রসাদ বললো–টকমাত্রেই নারীচরিত্র থাকে নাকি? সেই নারীচরিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কোনো পুরুষচরিত্রে অভিনয় করা কি ভালো?
বাগচীর গায়ে সকালের রোদ পড়ছে। আবার গাছপালা থাকায় কুয়াশাও আছে। পথের ধারের গাছের ডালপালার ছায়া যেমন পথে তেমনি তার গায়ে জালি কাটছে। সে হেসে বললো–এই এক মহা অনিষ্ট, আজন্ম আমরা নারীচরিত্রের সঙ্গে জড়িত। ওতপ্রোতভাবেই। এমনকী আমরা শুরু হচ্ছি নারীর উদর থেকে।
একী অদ্ভুত কথা!একটা কঠিন আঘাত পেলো সর্বরঞ্জন। একী সাংঘাতিক কথা বলছেন এত হালকা সুরে হেডমাস্টারমশাই! হায়, সুনীতি বলে কিছু আর রইলো কি? কিন্তু সেও অনেক যুদ্ধের পোড় খাওয়া সৈনিক; হয়তো হেরেছে বেশি, কিন্তু জয়লাভও করেছে। সে তার বক্তব্য বাছাই করে নিলো। তার দাড়িটা কেঁপে উঠলো একবার। সে বললো–না না, না, একে আমরা বোধ হয় এত সহজে চিন্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারি না। তাদের এই নাটকে পরনারী ধর্ষণের কথা আছে, আয়োজন আছে। জগদীশ্বর আমাদের পাপ কথন ক্ষমা করুন। নিয়োগী দু হাত তুলে দুটি তর্জনী অনেকটা করে নিজের দুকানে ঢুকিয়ে দিলো যাতে তার নিজের কথাটাও সবটুকু কানে না যায়।
কারো কারো কৌতুকবোধ বেয়াড়া রকমের থাকে। মনে হলো, বাগচী আবার হেসে উঠবে। কিন্তু সে বরং থমকে গিয়ে চিন্তা করলো। নিয়োগীর প্রকাশটা কৌতুকের হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে চিন্তার বিষয় থেকে যাচ্ছে। নারীধর্ষণ অসম্ভব ঘটনা নয়, কোনো নাটকে তার চিত্রণও থাকতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে একজন শিক্ষকের অভিনয়ে সংযোগ থাকা উচিত হয় কি? বাগচীর হাতের ছাতাটা একবার দুললল, সে বললো, আচ্ছা, এ বিষয়ে আমি চিন্তা করবো, চরণের সঙ্গে কথা বলে নিই।
প্রকৃতির স্নিগ্ধ কবোষ্ণতা এই ছুটির দিনে বাগচীর আরামদায়ক বোধ হচ্ছিলো। এমনও হতে পারে, ব্রেকফাস্ট অন্যান্য দিনের মতো স্বচ্ছন্দ হয়নি, এখন কিন্তু জীর্ণ হতে হতে স্নিগ্ধ পুষ্টিতে তার কোষগুলিকে হৃষ্ট করছে। বাগচী বললো–আচ্ছা নিয়োগীমশায়, আপনার কি মনে হয়, এ গ্রামটার কিছু কিছু বিশেষত্ব আছে? কথাটা বোধ হয় এই, আনন্দদায়ক শান্তি এখানে খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে।
–ঈশ্বরের কৃপায় তা হতে পারে, সার।
নিশ্চয় নিশ্চয়, তিনি কৃপা না করলে কৃপা চাইবার বুদ্ধিও হয় না, এরকম শুনেছি। আপনাকে একটা ভালো সংবাদ দিতে পারি, আপনার মতও জেনে নিতে পারি। এ অঞ্চলে রেভরেন্ড রলে নামে একজন ক্যাথলিক মিশনারী একটি মিশন হাউস করতে চাইছেন। ইংল্যান্ডের নতুন ক্যাথলিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এঁরা।
