নিয়োগী বললো–সার, আপনার প্রশ্রয় আমাকে তর্ক করতে সাহসী করছে। কলকাতার ইংরেজি শিক্ষার উপরে জোর দেওয়া হয়। কিন্তু তা কি অন্যায়? সেকালের রাজা রামমোহন, একালের বিদ্যাসাগর কি ইংরেজি শিক্ষার গুণগ্রাহী নয়?
বাগচী বললো–উভয়েই বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র কিন্তু তারা কি ইংরেজি পড়ে পণ্ডিত? কিন্তু আসল কথাটা তা নয়। আপনি কি এ দেশের চাষীদের সঙ্গে, স্ত্রীলোকদের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে, রামায়ণ মহাভারত পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে, পাপ পুণ্য সমাজ নীতি ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করেছেন? তাদের অক্ষরজ্ঞান নেই, কিন্তু
-সেটা হয়তো কথকতা ইত্যাদির ফলে। কিন্তু তাদের সেই জ্ঞানই তো কুসংস্কারের উৎস।
কুসংস্কার? হয়তো, হয়তো। আমি চাইছি আমাদের ছাত্ররা আপাতত ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান চিকিৎসা সম্বন্ধে অনেক কিছু, আর তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জানুক। সময়ের ব্যবধান কমাতে চাইছি। শুধু ইংরেজি ভাষার উপরে জোর দিলে একটা ইংরেজিনবিশ সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্রেণী তৈরী হবে যারা আর সকলকে মূর্খ আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে করবে।
এই বলে বাগচী হেসে উঠলে। কিন্তু আলোচনাটাকে গুটিয়ে নিতে সাহায্য করলো কেট। সে ঘোষণা করলো ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছে। বাগচী দাঁড়িয়ে উঠে বললো–আসুন, আসুন টেবলে যাওয়া যাক।
আলাপটা এখানে মুলতবী হতো। কিন্তু নিয়োগীর ব্রেকফাস্টেনা বসেও টেবলে বসার বিষয়টা তো আগেই স্থির করা হয়েছে। সে তো ক্রিশ্চানদের সঙ্গে এক খাওয়ার টেবলে বসতে না পারার মতো কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, সুতরাং সে সেই ব্রেকফাস্টা টেবলের পাশেই বসলো।
বাগচীর এইসময়ে একবার রলের চিঠির কথা মনে হলো, একবার চরণ দাসের ডিসপেনসারির কথা মনে হলো, কিন্তু সেসব দিকে মন দিলে নিয়োগীর দিকে অনাদর দেখানো হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় সে তার দিকে ফিরে বললো, বলুন মিস্টার নিয়োগী, আমি কোন বিষয়ে আপনার কাজে লাগতে পারি? আপনার দরকারী কথা না বলে এতক্ষণ আমি অন্য কথা বলেছি; দুঃখিত।
সর্বরঞ্জন প্রসাদ বললো–সমস্যা দু রকমের সার। আমি গতকাল স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার সময়ে এ বছরের ছুটির তালিকা এবং আগামী বছরের তালিকার খসড়াটাকে দেখছিলাম। দেখলাম, রানীমার জন্মতিথির উৎসবের কাছেই লাল কালিতে নতুন একটা ছুটি বসানো হয়েছে রাস উপলক্ষ্যে। আগামী বছরের খসড়ায় দেখলাম কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী ইত্যাদি তো বটেই শিবচতুর্দশী উপলক্ষ্যেও ছুটি হবে।
বাগচী বললো–এ বছরের রাসপূজার কথা আমার জানা ছিলো না। শিরোমণিমশায়। কয়েকদিন আগে এ ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলেন। আগামী বছরের শিবচতুর্দশীর ছুটির কারণ রানীমা ফরাসডাঙায় যে শিব স্থাপন করেছেন, শুনতে পাচ্ছি সে সময়ে সে উপলক্ষ্যে ভারি বড়ো মেলা হবে। কাছারিও বন্ধ থাকবে হয়তো।
এ ব্যাপারে, সার, দেওয়ানজিরও কি এই মত?
তিনি স্কুলের এসব ব্যাপারে আমাকেই মত স্থির করতে বলেন।
-তাহলেই দেখুন, সার, এসব অন্যায়ের সব দায়দায়িত্ব আমাদেরই থেকে যাচ্ছে। এই বলে সর্বরঞ্জন প্রসাদ বেশ খানিকটা মাথা ঝাঁকালো। বললো, আপনি আমার উপরওয়ালা। ডিসিপ্লিনের জন্য আপনার কথা আমাকে মানতেই হবে। কিন্তু এও আমি বলে দিচ্ছি, এতে আমার অন্তরলোকের সায় নেই। প্রত্যেকের একটা মিশন আছে। আমাদের ছাত্ররা যদি তাদের পিতামাতার অন্ধকারাচ্ছন্ন পুতুলপূজার মানসিকতায় ফিরে যায় তবে বৃথাই আমাদের শিক্ষাদীক্ষা, বৃথাই শিক্ষকতা করা।
বাগচী হাসিমুখেই বললো–ছাত্রদের পিতামাতারও নিজস্ব মত থাকতে পারে।
–অন্যায় মতও মানতে হবে?
অন্যায় বলছেন?
অন্যায় নয়? রাসের কথাই ধরুন। ওটার মতো কুৎসিত জঘন্য নীতিহীন কিছু হতে পারে? লাম্পট্যের জঘন্য প্রকাশ ছাড়া কিছু বলবেন?
-ওটা তো ধর্মের ব্যাপার। শিরোমণি বলছিলেন। আমি ঠিক জানি না।
সর্বরঞ্জনের মুখ গম্ভীর হলো, জমকালো দেখালো তাকে। ধর্ম এবং নীতিহীনতা, এটাই তো সে বলতে চাইছিলো। বিষয়টার নীতিহীনতাকে আক্রমণ করতে পারলে পুতুলপূজাটাকে সার্থক আক্রমণ করা যায়। এটাই তো প্রমাণ পুতুলপূজা কত আবিলতা সংগ্রহ করতে পারে। সে বললো–তাহলেই দেখুন, ওটা কি ধর্ম! মহিলা উপস্থিত না থাকলে বলতে পারতুম ধারণাটাই কী জঘন্যভাবে কুৎসিত।
এমনকী সর্বরঞ্জনের মুখে দাড়িহীন অংশটুকু যেন লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। নিয়োগীর কথা বলার ভঙ্গি, মুখচোখের চেহারা দেখে রাস উৎসব সম্বন্ধে বাগচী প্রকৃতই ভীত হলো। তাকে দুশ্চিন্তা করতে দেখা গেলো। সে বললো–আপনি শিরোমণির সঙ্গেও আলাপ করুন। আপনার মত তাকে জানান। স্কুলে নীতিহীন ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া যায় না।
কেট বাংলা বোঝে, বলে। সুতরাং ইতিমধ্যে সেও কুণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলো। সেদিকে লক্ষ্য রেখে বাগচী তাড়াতাড়ি আলাপটাকে ঘুরিয়ে নিতে বললো–আপনার বাড়ির খবর বলুন, ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্য ভালো থাকছে তো? এই সমাজে আপনার স্ত্রীর অসুবিধা হচ্ছে না তো? আপনার বাসগৃহ সম্বন্ধে কিছু করা দরকার আছে কি? আপনার বেতন জানুআরি থেকে পুরো একশো করা যায় কিনা এ সম্বন্ধে দেওয়ানজি ভেবে দেখবেন বলেছেন।
আলোচনাটা এদিকে ফিরলে কেট বিস্কুট ও কফি এগিয়ে দিলো। সর্বরঞ্জন তা গ্রহণ করে উৎফুল্ল হলো। সুনীতির সার্থক সুপ্ৰয়োগে কার না সুখ হয়?
