বাগচী আর একবার হেসে বললো, ঠিকই ধরেছি তবে। ভদ্রলোক কিন্তু সবসময়েই ভেবে কথা বলেন, ভেবে কাজ করেন। তোয়ালে হাতে গোসলে যেতে যেতে বাগচী। দাঁড়ালো; কেটের চিবুকের নিচে আঙুল রেখে বললো–মেক মি এ সেন্ট বাট নট ইয়েট প্রার্থনাটা প্রকৃতপক্ষে কার বললো– তো?
-কেন, সেন্ট টমাসের নয়?
কেটের চিবুক ঈষৎ উঁচু করে বাগচী বললো–আমার, আমার, রেভরেন্ড এন্ড্রুজ বাগচীর।
বাগচীর বসবার ঘরে তখন যে অপেক্ষা করছিলো সে সর্বরঞ্জন প্রসাদকুসুম নিয়োগী। ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্কুলে যে তিনজন শিক্ষক এসেছেন তাদের প্রধানতম, সহকারী প্রধানশিক্ষক বলা হয়। প্রায় এক বৎসর এই গ্রামে আছেন কিন্তু এখনো অনেক পরিস্থিতিতে তাকে নবাগত মনে হয়। ইতিপূর্বে একদিন কেট তাকে সেন্ট ফ্রান্সিস বলেছিলো। চেহারা দেখেই মন্তব্য। সর্বরঞ্জন অবশ্যই বৃদ্ধ নয়। হয়তো পঁয়ত্রিশ হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে তার কথায় অর্ধেক থাকে ধর্ম সম্বন্ধে। তার দিকে চাইলেই যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা তার শ্মশ্রুজাল। প্রচুর আবক্ষ সেই দাড়ি সাধুসন্তের কথা মনে আনে, কিন্তু তা ঘনকৃষ্ণ হওয়ায় যেন বিপরীতমুখিনতাও। তার পরনে গলাবন্ধ কোট, ঢিলে সাদা ট্রাউজার্স। কলকাতার আধুনিকতা, কিন্তু সম্ভবত ক্ষারে কাঁচা এবং ইস্ত্রিও হয়নি। পোশাকটা ঘোষণা করছে সর্বরঞ্জন সাদাসিধে, মিতব্যয়ী, কিন্তু অন্যদিকে কতটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ক্লিনলিনেস ইজ নেকস্ট টু গডলিনেস, সন্দেহ কী?
বসবার ঘরে ঢুকে নিয়োগীকে দেখে বাগচীর সন্ত টমাসের রসিকতাটা আবার মনে এলো। সে প্রফুল্ল বোধ করলো। স্কুল সম্বন্ধে কেটের রসিকতায় সস্নেহ ভাবটা স্পষ্ট থাকে।
সর্বরঞ্জন হেসে বললো–এখানে বলা দরকার তার এই থ্রি পিস নাম ইংরেজ ক্রিশ্চানদের অনুরূপ হলেও এখানে সুবিধার জন্য সংক্ষেপ করা হচ্ছে। আমি একটু ভুল করেছি, সার, আমার ধারণা ছিলো আপনি ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করে থাকেন।
ব্রাহ্মমুহূর্তে! বাগচী চশমার কাঁচ দুটোকে রুমালে মুছে নিলো।
-উপাসনার সেটাই প্রকৃষ্ট সময় নহে কি? এবং যেহেতু আপনি ধার্মিক, সুতরাং অবশ্যই উপাসনা করে থাকেন,এবংসুতরাংব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করতে অভ্যস্ত ধরে নেওয়া যায়। নিয়োগী হাসলো। বিহ্বল বাগচী বললো, আপনি অবশ্যই ব্রাহ্মমুহূর্তে উপাসনা সমাধা করেছেন?
সর্বরঞ্জন মাথাটাকে একবার ডান কাঁধে আর একবার বাঁ কাঁধের উপরে ছোঁয়ালো। তার মুখে একটা শুভ্র উজ্জ্বল হাসি দেখা দিলো, (সেই প্রচুর কালো দাড়িকে ছাপিয়ে হাসির পক্ষে যতটুকু তা সম্ভব) সে বললো–ওটাই কি ডায়েরির দৈনিক হিসাবে জমার দিকে প্রথম অঙ্কপাত হয় না?
ব্রেকফাস্টের আগে কেউ যদি বাড়ি বয়ে এসে প্রার্থনার কথা আলোচনায় আনে তবে তাতে একটা কৌতুকের দিক থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা বাগচীকে চিন্তার বিষয়ও এনে দিলো। সে অপ্রতিভভাবে হেসে বললো–ওটা নিশ্চয়ই সবসময়েই জমার দিকে পড়ে, কিন্তু স্বীকার করছি, আমার জমা অনেক কম।
সর্বরঞ্জন দাড়িঢাকা চিবুক উঁচুনিচু করলো। সে কি বিব্রত অথবা আনন্দিত? কিন্তু সুশিক্ষা এমন উল্লাসকে মনে গোপন রাখতেই বলে। সুতরাং তা গোপন করতে সে যথেষ্ট বিব্রত হয়ে পড়লো।
বাগচী বললো–মিস্টার নিয়োগী, আপনার নিশ্চয় গুরুতর কিছু প্রয়োজন আছে, কেউ কি অসুস্থ? কিংবা আপনি কি স্কুল সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করবেন? কিংবা ব্যক্তিগত কিছু?
সর্বরঞ্জন বললো–আমি আপনাকে অন্যবিষয়ে কিছু বলতে এসেছিলাম। কিন্তু স্কুলের কথাটা যখন উঠে পড়লো তখন বলি। আজই তো স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য পরীক্ষক নির্বাচন করা হবে, এই সুযোগে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাবটা আর একবার ভেবে দেখলে হয় না? এমনকী শিরোমণিমশায়ও বলছিলেন ব্যাকরণজ্ঞান না হলে, শুদ্ধ বানান লিখতে না জানলে বিদ্যাশিক্ষাই হয় না। মৌখিক পরীক্ষায় ছাত্ররা ব্যাকরণ বানান ইত্যাদিকে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাবে না কি?
শিরোমণি? বাগচীর মনে পড়লো কিছুদিন আগে শিরোমণিকে উঁচু ক্লাসে সংস্কৃত ও বাংলা পড়ানোর জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। স্কুল সম্বন্ধে তার চিন্তায় যে কয়েকটি মানুষের। কথা মনে আসে শিরোমণি এখনো তাদের মধ্যে একজন নয়। সে বললো–এটা তো পরীক্ষা নেওয়ার পরীক্ষামাত্র। যদি দেখা যায় ব্যর্থ হচ্ছে, আগামীবছরে পুরনো বিধিতে ফেরা যাবে। আগেও বলেছি হিমালয়কে ঈকার দিয়ে লিখলে বা ভাবলে তার উচ্চতা কমে না, তুষারও হ্রাস পায় না।
-কিন্তু এর একটা অন্য দিক আছে, সার। কিছুদিন পরে পুস্তকগুলি ভাষার ব্যাপারে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবে না?
-সে যখন আমাদের এই ছাত্ররা বই লিখবে। বাগচী হাসলো, তাছাড়া আপনি অবশ্যই জানেন, বানান কোনো ভাষাতে স্থির নয়, ব্যাকরণ ইতিমধ্যে বদলাচ্ছে; আমরা ইতিমধ্যে করিবেক আমাদিগের ইত্যাদি পদ এমনকী স্কুলেও ব্যবহার করছি না।
–তাও যদি মেনে নেওয়া হয় বিদ্যালয়-পরিদর্শকের মতকে অবহেলা করে কলকাতার পদ্ধতিকে গ্রাহ্য না করে, এই এক নতুন পথে চললে আমরা কি দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো না?
বাগচী হেসে উঠলো, কিন্তু তখনই সস্তৃত হলো, বললো– কলকাতার লোকসংখ্যা কি সারা দেশের লোকসংখ্যার চাইতে বেশি। তাদের সংস্কৃতিকে কি সারা দেশের সংস্কৃতি করতে হবে? সেখানে কি ইংরেজির কয়েকটা শব্দ জানাকে সংস্কৃতির লক্ষণ মনে করা হচ্ছে না?
