রাজচন্দ্র অবশ্যই এই চপিন-শপ্যাঁ সম্বন্ধে এই প্রথম জানছে। আজ সন্ধ্যাতেই পৌঁছানোর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শিশাওয়াল তার সঙ্গে দেখা করে মিউজিক শীটের রোলটা তাকে দিয়ে বলেছিলো, এটা সার, আপনার জন্য এই অধমের আনা উপহার। জঙ্গিলাটের প্রাইভেট সেক্রেটারির স্ত্রীর কাছে সংবাদ পেয়ে সেই রাতেই সংগ্রহ করি। তো স্পিংক সাহেব আমাকে বললো, এটা যখন রচনা হচ্ছে চপিন প্যারিসে, স্বদেশ পোল্যান্ড থেকে নির্বাসিত। যেন স্বদেশ স্বকাল থেকে বিচ্যুত। আর সেখানে খবর এসেছিলো পোল্যান্ডকে চিরকালের আগ্রাসপন্থী রাশিয়া গ্রাস করে ফেলছে। সেই রাগে এটার রচনা। শুনে হাসি পাওয়া স্বাভাবিক। শিশাওয়াল ভালো সেলসম্যানের মতো অনর্গল কথা বলতে পারে, কেউ তার কথা বিশ্বাস করছে কিনা তা পরোয়া করে না। তার গল্পের কোন অংশটা মিথ্যা কে বলবে?
কিন্তু পিয়ানোই রাজুকে আকর্ষণ করলো। নোটেশনগুলোতে চোখ পড়তে তার মনে হচ্ছে, বাজালে তা বুকের মধ্যে তরঙ্গ তুলবে। শীটের মাথায় ইংরেজ-প্রকাশক রিভলিউশনারী স্টাডি কথাটা জুড়ে দিয়েছে। রাজু বাজাতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সুর এমন হলো যে কিছু যেন ভেঙে পড়ছে, কোথাও বিদ্রোহ যেন, আক্রোশ আর বেদনা, হার না মানার প্রবল প্রতিজ্ঞা।
সে রাত্রিতে রাজু শপ্যাঁর সেই রিভলিউশনারী স্টাডি বারবার বাজিয়ে যেন মুখস্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো। যেন রিহার্শাল, কাল তাকে শ্রোতাদের সামনে উপস্থিত হতে হবে। অস্বীকার করা যায় না যে কোনো বিচক্ষণ শ্রোতার কানে ধরা পড়তে বাজানোর ব্যাপারটা প্রতিবারে শপার নির্দেশ মতো হচ্ছে না। ইম্প্রোভাইজ করা হচ্ছে যেন, অন্তত তীব্র কঠোর ধ্বনিগুলি দীর্ঘায়ত আর উচ্চরব হচ্ছে। যেন বাঁধনছেঁড়া, বাঁধভাঙা, তাকে তীব্রভাবে অস্বীকার করা যা তোমাকে স্বাধীন হতে দেয় না, আর ব্যর্থতা যখন ভাগ্যের মতো তখন বিষণ্ণতার ঘাটগুলো বেজে উঠছে।
০৯. সময়ের হিসাব
নবম পরিচ্ছেদ
০১.
রানীর জন্মোৎসবেই সময়ের হিসাব। তখন অঘ্রানের প্রথম, নভেম্বরের মাঝামাঝি, জন্মোৎসব দু সপ্তাহও দূরে নয় আর। শীত পড়েছে। হালকা রাগ নেমেছে শয্যায়।
সেদিন রবিবার। বাগচীর ঘুম ভেঙেছে যেন, কিন্তু এখনো সে শয্যায়। রবিবার বলে? ছুটির দিনেই কিন্তু অন্যদিনের আগে তার কাজের দিন শুরু হয়। সে কি অসুস্থ? উল্টো বরং নরম, ল্যাভেন্ডারগন্ধী রাগের নিচে তার শরীরটা সুস্থ, সানন্দ, বিশেষ রকমে হালকা। তার কি স্কুলের কথা মনে নেই? বরং এখনই সে ঘুমে জড়িয়ে ভাবছিলো, গতবারের চাইতে এবার তার স্কুলে ছুটি বেশি। রাসের ছুটি, জন্মোৎসবের ছুটি, বড়দিনের ছুটি। গতবার রাসের ছুটি ছিলো না।
অন্যান্য সকালে বাগচী উঠে যাওয়ার পরে কেট তার নিজের শয্যা ত্যাগ করে। নির্দিষ্ট অভ্যস্ত সময় পার হতে দেখে কেট উঠে, গোসলখানা ঘুরে হাত-মুখ মুছতে দুই খাটের মাঝখানে রাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলো। তখন রাত্রিবাস থেকে দিনের হাউসকোটে যাওয়ার সময়। কারো রাত্রিবাস ল্যাভেন্ডারগন্ধী মসলিনের হতে পারে। কেট ভেবেছিলো বাগচী ঘুমিয়ে আছে, উপরন্তু শয্যার দিকে পিছন ফিরেই তো সে। কিন্তু প্রতিবিম্বর মুখ তো শয্যার দিকেই।
বিস্মিত বাগচী পাশ ফিরেছিলো। সে ভাবলো : ক্রিস্টমাসে কেটকে নিয়ে কলকাতা গেলে হয়। গতবার সে সময়ে রাজকুমারের কলকাতা যাওয়ার কথা ছিলো, তাদের সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ ছিলো। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন ঘটেনি, রাজকুমার নৌকাবহরে পশ্চিমভ্রমণে গিয়েছিলেন। …এবার তাদের বিবাহের পঞ্চম বার্ষিকী এগিয়ে আসছে। সে সময়ে অবশ্যই স্কুলের পরীক্ষা চলতে থাকবে। তা কেটের এতদিনে ত্রিশ হবে। পরীক্ষা নেওয়ারই পরীক্ষা, লেখার বদলে মুখে। নতুন পদ্ধতি বটে। তত শোবার ঘরের আয়না…। তাছাড়া, সলজ্জ বাগচী ভাবলো,কাল বিকেলে চরণ দাস যে চিঠি দিয়েছে, বেশবড়ো চিঠি। বানান দেখে বলতে পারো না, কিন্তু উচ্চারণ রলে, রেভরেন্ড ফাদার সিবাস্টিয়ান বলে। দ্যাখো, কীবল কাল আবার এসেছিলো বিকেলে। তখনই চরণ দাসও চিঠিটা এনেছিলো। কেমন সব যোগাযোগ নিত্য ঘটছে। কীবল এসেছিলো রলের কথা বলতেই। ফলে রলের। চিঠিটানা খুলেই জানা গিয়েছিলো রলে এ অঞ্চলে একটা মিশন হাউস করতে চায়। কীবল চলে গেলে চিঠি খুলে অবাক। রলের চিঠি। মিশন হাউস তো বটেই, সম্ভব হলে সে একটা স্কুল, একটা হাসপাতালও করতে চায়। …গাছটা বেশ বড়ো, রুক্ষ মোটা ত্বক; হঠাৎ ফুল ফুটলে কেমন ছেলেমানুষ দেখায়। এরকম একটা অনুভূতির পাশ দিয়ে বাগচী স্থির করলো, বেশ আরামই লাগছে, ব্রেকফাস্টের ডাক পেলে উঠলেই হবে।
কিন্তু কেট এলো। কোমরের অ্যানে বোঝা যায় ব্রেকফাস্ট তৈরিতে ব্যস্ত ছিলো সে। বিছানার পাশে এসে বললো, অতিথি।
বাগচী তো জেগেই ছিলো। উঠে বসে বললো, কে, রলে নাকি?
কেট বললো, ওই যে যার প্রার্থনা, ও গড, মেক মি এ সেন্ট বাট নট ইয়েট।
-আমারে করো সন্ত, কিন্তু এখনই নয়! সে কি? বাগচীবিছানা থেকে নামলো। আন্দা করতে পেরে হেসে উঠলো, গুড, গ্রেশাস, ব্রেকফাস্টে বসতে বলেছো নিশ্চয়।
বললেন, তাঁর প্রাতরাশ শেষ হয়েছে। তাহলেও পাছে আমরা ভাবি পানাহারে তা ছোঁয়া যাওয়ার কুসংস্কার আছে, তাই টেবিলে বসতে রাজী হয়েছেন।
