আশ্চর্য! নয়? –এই ভাবতে ভাবতে নয়নতারা তার শোবার জন্য নির্দিষ্ট রানীমার ঘরের পাশের ঘরে ফিরে এলো। অসাধারণ শয্যা। রানীমার নির্দেশে যে রকম হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কেন যে এমন করেন?
শয্যায় বসে সারাদিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও নয়নতারার ঘুম আসতে দেরি হলো। বরং রানীর কথাগুলো মনে এলো তার। আলাপে আলাপে বাঁধের ফাটলের সমস্যা, তার সমাধান, কায়েতবাড়ির মুকুন্দকুমার, চীনের যুদ্ধ, বান্দা বাবুর্চির তরোয়াল খেলার কথা হয়েছিলো। দ্যাখো কাণ্ড, বলে ভাবলো নয়নতারা, জাঁ পিয়েত্রোর বাবুর্চির নাম বন্দা, যে নাকি তরোয়ালবাজ, যেমন বুজরুক ছিলো তার মসলিনরেশম কারবারের ম্যানেজার। এসব কি পিয়েত্রোর পরিকল্পনা না খেয়াল? হয়তো খোঁজ করলে জানা যাবে, বন্দা ছিলো প্রকৃতপক্ষে তাঁর অবিচল দেহরক্ষী।
তরোয়াল খেলার গল্পটা যেন হঠাৎ তার বুকের ভিতরে কিছুকে ধাক্কা দিলো। বন্দুকও প্রাণঘাতী। কিন্তু তরোয়াল খেলা, কি নকল তরোয়াল দিয়ে হয়? সে মনে মনে বললো, কী আশ্চর্য, এ তো আমাকে বলোনি! এ বিষয়ে আলাপ করা দরকার নয়? তরোয়ালকে কৃপাণ, করবাল ইত্যাদিও তো বলে। পিয়েত্রোর সেই মখমলে ঢাকা কিন্তু অদ্ভুত ধারালো। মস্ত তরোয়ালটা ব্যবহার করে নাকি? লোহার জামা গায়ে দিয়ে নেয় তো? দেখা দরকার। না, না। তা ভালো নয়। সে কাছে থাকলে যদি রাজকুমার অন্যমনস্ক হয়?
কিন্তু কী করে একা একা অনুভব করে সমস্যার সমাধান হয়। কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারলে হতো। শিকল বুনে বুনে জামা তৈরীর কথা যদি বলো (নয়নতারার অজ্ঞাতে এটা কি ইস্পাতের জামার ছায়া?) সোয়েটারটা কিন্তু বোনা হয়নি। কী আগ্রহে উল আনালো কলকাতা থেকে, কি আগ্রহে বুনতে শেখা। কিন্তু আশ্চর্য, আগ্রহটা কেন নেই? কারো সঙ্গে আলাপ করা দরকার নয় কি?
রাজকুমারকে একবার নিজের হাতে সুতো কেটে ধুতি চাদর উপহার দিয়েছিলো বটে। তেমন সেই এক উৎসবের রাতে অনভ্যস্ত মদে বিহ্বল কিশোর রাজকুমার তার বাড়িতে গিয়ে তার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো।
আলাপের কথাতে মনে পড়লো নয়নতারার, এ বিষয়ে একজনই মাত্র বেশ স্পষ্ট করে আলাপ করেছে। ঘটকী, সেই ব্ৰহ্মঠাকরুন। সেই যে অঙ্কের ধাঁধার মতো স্ত্রী-পুরুষের বয়সের পাশাপাশি হিসাব।
ছি ছি! এসব কি আলাপে আনা যায়? রাজকুমারের এখন একুশ হবে। যেন উপরের পাতার চাপে জল এসে নয়নতারার নিচের পাতার পক্ষগুলো জলবিন্দুতে ভারি হলো। সে। স্থির করলো সে ঘুমোবে। দরজা বন্ধ করে টিপয়ায় বসানো বড়ো ডোমদার সেজটাকে নিবিয়ে বিছানায় এলো সে। দেয়ালে লাল কাকড়ার মৃদু দেওয়ালগিরিটা জেগে থাকবে। এখন সে গায়ের কাপড় আলগা করে দিচ্ছে।
শুয়ে নয়নতারা ভাবলো, রানী কিন্তু বিচলিত নন। বাঁধটাকে নতুন করে শক্ত করে তুলবেন। ফাটলগুলো থাকবে না। পুরোহিত যেমন বলেছিলো, গঙ্গার সেই বুঢ়াকে…কিন্তু ক্ষতি কি যদি অগাধ শান্ত হয়ে নদীটা মন্দিরের কিছু দূরে প্রবাহিত হতে থাকে।
চোখে যখন ঘুম জড়িয়ে আসছে সার্বভৌমপাড়ার মেয়ের মনে হলো : তোমার কাছে। আকবর বাদশার কাল আর রাজুর কালে ব্যবধান নেই। রানীমার মন্দির কখন আকাশ স্পর্শ করে, কখন আবার মাটিতে মিশে যায়, দু-তিনশো বছরের সেব্যবধানও তোমার কাছে মূল্যহীন। কিন্তু তুমি তো মহাকাল, সৃষ্টির উৎস। স্নেহ নেই কেন? সময়ের ব্যবধানে আমাদের যা অতীত হয়ে যায় তা কি তুমি করুণায় পূর্ণ করো না?
এক দারুণ উৎকণ্ঠায় আর লজ্জায় ঘুম ভেঙে গেলোনয়নতারার। বিছানায় উঠে বসলো সে। কিন্তু বিছানা, ঘর, আলো যেন বিশ্বাসে আসছে না। স্বপ্নটা এরকম যেন : এক অগাধ জলরাশির পার বাঁধানো চলেছে কিংবা গতিশীল জলরাশিকে বাঁধেহ্রদে পরিণত করা হচ্ছে। রানীমা, হরদয়াল, নায়েবমশাই, লোকজন। কিন্তু যেন চিড় ধরলো। মেঘের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ফুলেফেঁপে সেই জল মন্দিরকে বিগ্রহকে গিলে ফেলছে। বিষণ্ণ উৎকণ্ঠায় যেন দম বন্ধ হবে। যেন হাহাকার করা হচ্ছে। কিন্তু যেন গোপনে নয়নতারা সুখী হয়ে উঠলো।
আশ্চর্য! সে বিছানার দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবলো, এ কি অন্যায় যে রানীমার পরাজয়ে সে এত সুখী হয়েছিলো! রানীমাকে সে কি বিদ্বেষ করে?
নয়নতারা উঠলো। দাঁড়াতে গিয়ে পা দুটো একটু শিরশির করলো। একটা জানলা খুলে দিলো সে। তখন পেটাঘড়িতে একটা একটা করে এগারোটা বাজলো। রাত হয়েছে বটে, তবে তেমন বেশি নয়। জানলা ধরে দাঁড়ালো সে। বাতাসটা বেশ ঠাণ্ডাই। সে কি একটা বাজনা শুনতে পেলো? মৃদু, যেন ক্রমশ ফুরিত হচ্ছে। আগে কি ছিলো? কিন্তু পিয়ানো বাজাতে বসার পক্ষে এখন কি বেশি রাত নয়?
.
নয়নতারা ভুল শোনেনি। বিছানা দেখে মনে হচ্ছে, সে এতক্ষণ বসেই ছিলো। স্থির হয়ে বড়ো চেয়ারটায় চিবুকের নিচে ডান হাতে চেপে ধরার ভঙ্গিতে ছুঁয়ে বসে থাকাকে আর কিছু বলে না। এখন সে উঠে পিয়ানোর সামনে বসলো। মিউজিক শীটটার গায়ে ইংরেজি অক্ষরে লেখা চপিন। শিশাওয়ালও তাই বলেছিলো। কিন্তু এতক্ষণ ভেবে সি ঠিক করেছে ফরাসী হলে সিএইচ শ হয়ে যাবে, শেষের এনটা চন্দ্রবিন্দু। এই উচ্চারণ বিভ্রাটই যেন তাকে ভাবাবে। সে স্কোর শীটটার উপরে চোখ বোলালো। অভ্যাসের ফলে টানা লাইনে নানাভাবে নিবদ্ধ স্বরগুলির শব্দ তার মনে মনে ঝংকার তুলতে লাগলো।
