কথা বলার আগে রানীউঠলেন। নয়নতারাকে নিয়ে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরলেন। তার নিজের শোবার ঘরের পাশের ঘরটিতে এসে বললেন–দ্যাখো। এ ঘরে ঘুমোতে কি অসুবিধা হবে তোমার? রাত করে আর বাড়িতে ফিরো না।
বসবার ঘরে ফিরে কথা বলার আগে কী এক আমোদ পেয়ে হাসলেন নিঃশব্দে, বলতে বলতে একটু জোরে হেসে উঠলেন। শুনেছো নাকি? পিয়েত্রোর এক বাবুর্চি নাকি তার বাংলোতেই থেকে গিয়েছিলো। বন্দা না কী নাম। রাজু তাকে পিলখানায় রেখেছে কিছুদিন হয়। নাকি ভালো রসুই। তো পিয়েত্রো তো ফরাসী। বড়ো বড়ো সোনা ব্যাং দেখেছো?
ম্যাগো! সেসব রাঁধতো কিনা বন্দা কে জানে! রূপচাঁদ বলতেই হৈমী বললো–সে থাকলে সুবিধা হয়। বন্দা ব্যাং না রাঁধুক শোর যে রাঁধতে সন্দেহ কি? শোর মেরে মেরে একটাও কি আর রেখেছিলো এ তল্লাটে!
নয়নতারা বললো– বুনো শোর বিপজ্জনক হয়ে থাকে। কমিয়ে দেওয়াই ভালো হয়েছে।
–ও হরি, তাই, পরোপকার ভেবেছো? প্রতি রবিবারে ঘোড়ায় চড়ে বল্লমে বিধে মারা! কী হৈ রৈ! এখানকার রাজাও সঙ্গী। খেতে অমর্ত! ঘেন্নায় মরি। তা বন্দার এখানে এই প্রথম রাঁধা। রাজু আবার একদিন তার হাতে ভগবতী খেতে চাইবে কিনা কে জানে! একবার…হরদয়াল বলেছিলো, কলকাতার ভদ্রলোকের ছেলেরা নাকি আজকাল…।
একটু থেমে রানী বললেন আবার রাজু অবশ্য…আজকাল সে রোজ পিলখানায় যায় হাতির তদ্বির করতে। ওখানে নাকি বন্দার সঙ্গে তরোয়াল খেলে। রূপচাঁদের কথা, বলে বিপজ্জনক। রাজু অবশ্য হাসে। ওতে নাকি বুক কাঁধ চওড়া হয়, হাতের গুলকবজি ফোলে, চোখের ধার বাড়ে।
রানী একটু ভাবলেন-বললেন, যাক গে, একটা গল্প বলো শুনি।
নয়নতারা বললো–যদি আপনি বলেন দয়া করে
রানী একটু ভেবে নিয়ে বললেন–তোমরা ফার্সি পড়বে না, আরব্য উপন্যাসের গল্পও জানলে না। তুমি কি সিন্ধুবাদের গল্প শুনেছো?
নয়নতারা বললো–সেই সিন্ধুবাদ নাকি, যার কথা সেদিন মানদাদিদি বলতে শুরু করেছিলো?
-হ্যাঁ, সেই বটে। মস্ত বণিক, দুধর্ষ সাহস। ধনরত্নের জন্য প্রাণকে পণ রাখতে আপত্তি নেই। জাহাজ ডুবছে, শেষ রক্ পাখির পায়ে নিজেকে বেঁধে পাহাড়ের উপরে সাপের রাজ্য, নাকি অগ্নিয়গিরির গর্তে হীরার জন্য। হীরা যে প্রাণের চাইতে বড়। কিন্তু সেই হীরা পেয়েও কি ঘরে থাকতে পারছে?
নয়নতারা বললো–আপনি কি বলবেন এ সেই ন জাতু কামঃ।
রানী বললেন কী শক্তি দ্যাখো সেই কামের, যে বুদ্ধিমান সিন্ধুবাদকে চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়। যেন তাতেই ভালো হবে। সেই সিন্ধুবাদ একদিন দ্বীপের বুড়োর খপ্পরে পড়েছিল। বুড়ো তার কাঁধে বসে দুই হাঁটুতে এমন গলা চেপে ধরেছিলো যে প্রাণ যায়। বুড়ো ধুর্ত বটে, কিন্তু খোঁড়া।
নয়নতারা বললে–আপনি জ্ঞান বুদ্ধি এসবকে খোঁড়া বলছেন?
রানী হেসে বললেন–তুমি তো আবার ন্যায়রত্নের বোন;নব্যন্যায়ের ঘর। একটু হাসলেন তিনি।
তাঁর দৃষ্টি কোমল হলো। বললেন–তা হয় না, না? একটা জিনিস লক্ষ্য করো। সেই মহাভারতের সময়ে লোভ, হিংসা, ক্রোধ ছিলো, এখনো তারা সব তেমনি আছে, তখন বুদ্ধি করে করে যেসব নীতি করা হয়েছিলো এখন সেগুলোকে বোকামি বলা হয়। ভাবো দ্রৌপদীর সংসার, কিংবা অর্জুনের পত্নীমালা। মনে হয় না কি যে বুদ্ধিটার এক যুগ পার হয়ে অন্য যুগে যাওয়ার ক্ষমতা নেই?
নয়নতারা হেসে বললো–সমাজের নীতিটিতি মানুষ বুদ্ধি দিয়ে করে বটে।
কিন্তু রানীকে উঠতে হলো। হৈমী কায়েতকুমার মুকুন্দর ব্যবস্থা ভালোভাবেই করবে সন্দেহ নেই, রাজুর খোঁজও নেওয়া দরকার।
তখন রাতের আহার পর্ব মিটেছে। হৈমী নিজেই এলো। জানালো খাওয়া শোয়ার ব্যবস্থা মুকুন্দকুমারের পছন্দ হয়েছে। বন্দাকে আশ্বাস দিলেন।
রানী বললেন–নিশ্চিন্ত করলে।
এইসময়ে হৈমী বললো–উনি নাকি চীনে যাবেন। সেখানে নাকি ইংরেজ-চীনে যুদ্ধ, গর্ডন না কী গার্ডন নামে এক সেনাপতির জাহাজ কলকাতায় ভিড়েছে। অনেকে যাচ্ছে। কেউ কেউ কমিসরিয়াটের কাজে। তবে উনি যেতে চাইছেন যুদ্ধ করতে। আপনি অনুমতি দিলে আর কেউ আপত্তি করবে না।
এ সম্বন্ধে রানী তাকে আগেই বলেছেন, ভাবলো নয়নতারা। তাহলেও তার বিস্ময়বোধ হচ্ছে, কায়েতবাড়ির ছেলে এ বাড়ির অনুমতি চাইছে! কিন্তু তার চাইতে বিস্ময়ের, মানুষ কি স্বভাবতই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকে না? তা তো অন্যের যুদ্ধ, অন্য দেশে।
কথার কথা বলার মতো ভঙ্গিতে নয়নতারা বললো–এরকম যেতে কি আপনি অনুমতি দেবেন?
রানী বললেন–এবার ওর একুশ পার হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে কিছু করতে চাইবে তো! এদিকে ইংরেজরা তো এদেশে আর কাউকে মনসবদার করছেনা। রানী যেন আমোদ পেয়ে হাসলেন।
হৈমী বললো–নিজেরই কিন্তু ঘোড়া, বন্দুক, তরোয়াল এসব কিনে দিতে হবে।
রানী বললেন–তোমার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে তো!
নয়নতারা অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলো, সে ভাবলো, নিজের চিন্তার ভুল ধরলো যেন, সেজন্য অবাক লাগছে না। এটাও অবাক হওয়ার মতো। একই বয়সের। একজন চলেছে ইংরেজের পক্ষে অন্যদেশে যুদ্ধ করতে, আর অন্য একজন…?
কিন্তু রানীর হাই উঠলো।
রানীর পাশের ঘরেই তো নয়নতারার শোবার ব্যবস্থা। রানীমা শুয়ে পড়লে নয়নতারা নিজের জন্য নির্দিষ্ট শোবার ঘরে সামনে অলিন্দে দাঁড়ালো। রাত্রির রাজবাড়ির অন্দরমহল তার চোখে পড়লো। এখন চতুষ্কোণ উঠোনটার চারিদিকের সবগুলো ঘরেই আলো। লোকজনের সাড়াও যেন। দোতলার অলিন্দের দেয়ালগিরিগুলো জ্বলছে, কিন্তু অনেক ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অলিন্দে বরং কোমল অন্ধকার এখানে ওখানে। বাঁ দিকটায় বেশ কয়েকটা ঘরের পরে একটা ঘরের পর্দার আলো আসছে অলিন্দে। এবার সেটা বন্ধ হলো। ও ঘরটা কি হৈমীর, অথবা ও ঘরেই কি মুকুন্দকুমার? নয়নতারা এবার ডানদিকে চাইলো। বড়ো একটা থামের পাশ দিয়ে অলিন্দটা ঘুরে গিয়েছে কোণ তৈরী করে। থামটাই প্রমাণ যে ওখানেই দোতলায় উঠবার সিঁড়ি। সেজন্যই ওখানে একটা ঝাড় যা থামের পাশ দিয়ে খানিকটা চোখে পড়ছে। সিঁড়ির থাকটাই রাজকুমারের মহলকে রানীর মহল থেকে পৃথক করে। রানী শুয়ে পড়েছেন, দোতলা নিঃশব্দ হয়ে আসছে। কার্নিশের নিচে বসান ঝরোকায় আলো আসছে, আন্দাজ করা যায় ওটাই রাজকুমারের ঘর।
