নয়নতারার গলাটা ধরে এলো।
বাগচীর কুঠির সামনে পালকি থামলে কেট দরজা খুলে নামতে গিয়ে দেখলো, ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। বাগচী তোফিরেছেই, রাজকুমারও অন্যপথে তাদের একটু আগেই এসেছে। সে তখনো ঘোড়ার পিঠে, ঘোড়াটা স্থির, কিন্তু বালামচি দোলাচ্ছে।
রাজচন্দ্র বললো–আমরা আর দাঁড়াবো না। দ্যাখো, আলো তোমাকে অভ্যর্থনা করতে পথে এসে পড়েছে।
কেট কিছু বলতে দাঁড়িয়েছিলো। পথের ধারের একটা গাছের ডালপালায় আটকানো একখণ্ড চাঁদ তার চোখে পড়লো যা এই সন্ধ্যাকে কখনোই ঘন কালো হতে দেয়নি। তার আলো যেন নয়নতারার মুখেও। কেট বললো–আমি আর মাঝখানে থাকতে চাইছিনা। গুড নাইট ডিয়ার্স।
এক ভারি কৌতুকের প্রশ্ন : আমাদের চিন্তা কি সিঁড়ি বেয়ে চলে? অথবা কি নিত্য প্রবহমান?
কেট দেখলো রাজকুমার ঘোড়া থেকে নেমে খানিকটা হেঁটে গেলো। নয়নতারা তো পালকি থেকে নেমেছিলোই। সেও কয়েক পা হেঁটে রাজকুমারের কাছাকাছি গেলো, দাঁড়ালো। কেট অনুভব করলো, এই সুন্দর যুবক…ও সেই সিড অব ডেথ…আশ্চর্য! কিন্তু যদি তা হয়, এমন স্বাস্থ্য, এত রূপ!মৃত্যুবীজ থেকে কেউ কি বাঁচাতে পারেনা? কেন পারছে না তবে?
রাজচন্দ্র বললো–তোমাকে কি তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেবো।
নয়নতারা বলতে গেলো, কী সুন্দর চাঁদ, রাজু। রাজকুমারের লাগাম-ধরা হাতটার দিকে বাড়ানো আঙুলগুলোকে মুঠি করে গুটিয়ে আনলো। বললো–রাজবাড়িতে যেতে হবে না? রানীমাকে খবর দিতে হবে। একটু হাসলো সে। বললো– আবার-যাই রাজকুমার, আমি কিন্তু গুড নাইট বলতে জানি না।
নয়নতারা উঠলে পালকিটা ছুটে চলতে শুরু করলো। এখানে রাস্তা বিশেষ ভালো।
০৮. সে রাতের রাজবাড়ি
অষ্টম পরিচ্ছেদ
সে রাতের রাজবাড়ি অন্যান্য রাতের চাইতে কিছু পৃথক হয়ে উঠলো। অনেক বেশি আলো এবং নোক-চলাচল। পালকি যখন সদর-দরজায়, তখনই আলোগুলো চোখে পড়েছিলো। নয়নতারার। কাছারির বড়ো চত্বরটা পার হয়ে যেতে যেতেই নয়নতারা দেখলো, প্রাসাদের কাছাকাছি হাতিটা বসেছে। তার চোখে পড়লো হাতিটাকে কিছু দূরে রেখে রাজকুমার তার। ঘোড়ায় আর-একটা দরজার দিকে গেলো। হাতির হাওদা থেকে সিঁড়ি বেয়ে বিলেতি পোশাকের একজন নামছে। তাকে সাহায্য করতে, এগিয়ে নিতে বরকন্দাজ ও পরিচারকেরা এগিয়েছে। কিন্তু রূপচাঁদই এদিকে এদিকে বলে তার পালকির আগে আগে ছুটে পালকিটাকে খিলানের তলা দিয়ে অন্দরে নিয়ে গেলো।
নয়নতারা ভাবলো, সত্যি কি তাই হয়, সময় কি নদীর স্রোতের মতো সরে যায়? তা কি ওড়াগের মতো কোনো ব্যক্তিত্বের আধারে স্থির থাকে না?
আমাদের চিন্তার প্রবাহ অবিরত অখণ্ড কিনা তা নিয়ে তর্ক আছে, কিন্তু আলাপ যে তার খানিকটাকে কিছু সময়ের জন্য আয়ত্তে আনতে পারে সন্দেহ নেই।
রানীমাকে তার দোতলার বসবার ঘরেই পাওয়া গেলো। নয়নতারাকে বাড়ি যাওয়ার আগে তো দিনের খবরগুলো দিয়ে যেতে হবে। রানীকে মন্দির সম্বন্ধে বলা শেষ হলে নয়নতারা নদীর বাঁধানো পাড়ে ফাটলের কথাও বললো। রানী বললেন–তাই? অবশ্য বাঁধানো পাড় ধীরে ধীরে ঢালু স্বাভাবিক পাড় হয়ে গেলেই বা ক্ষতি কি? নয়নতারার মনে পুরোহিতের রসিকতাটা এলো। তা কিন্তু রানীর সামনে বলা যায় না। রানী নিজেই বললেন, নদী ফিরলে ভয়ের কথা। কিন্তু তা ফিরবেই তা বলা যায় না। তখন আবার বাঁধ দেওয়া শক্ত কি? হাসলেন রানী, বললেন আবার-ওদিকে কিন্তু সময়ের বন্যা আছে।
রানী সেই রাতে নতুন কিছু করলেন, অভাবিতভাবে, যেমন শুধু রাজকুমারের বেলাতে তার আবদারেই হয়ে থাকে, নয়নতারাকে পাশে নিয়ে রাত্রির আহার করলেন। ব্যাপারটা কাল সকাল থেকেই গল্প হয়ে ছড়াবে। আর তাই যেন রানী, যাঁর এসব ব্যাপারের কড়াকড়ি সার্বভৌম পাড়াকে হার মানায়, তিনিই চাইলেন।
সে কিন্তু কিছুটা রাত হলে। তার আগে, রানী তখন বসবার ঘরেই, নয়নতারা তো ছিলোই, হৈমীকে ডাকিয়ে আনলেন। বললেনবসো হৈমী, সারাদিনে তা করোনি। হেসে বললেন–এ দিকের ঘরগুলোকে দেখেছো, নয়ন? চিনতে পারবে না। ইকিরিন, শোপা, টেবিল গাচেতে ছয়লাপ। হৈমী এসব বোঝে ভালো।
সেখানেই রূপচাঁদ এদিকে এদিকে বলে ছ-আনির কুমারকে নিয়ে এলো।
রানী বললেন–বসো। জলযোগ হয়েছে তো? পথে নিশ্চয় খুব ক্লান্ত হয়েছে। তোমার থাকবার জায়গা পছন্দ হলো তো? এঁর নাম হৈমী। ইনি তোমার দেখাশুনা করবেন। কাল তোমার চীনের গল্প শুনবো। কালই হরদয়াল আর নায়েবমশায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবো। রাজুর সঙ্গেও তখন আলাপ হতে পারবে।
ছ-আনির কুমার প্রণাম করে বসেছিলো, প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালো। তখন রানী-হৈমীকে বললেন–ইনি মুকুন্দকুমার। কাছে কাছে থেকে ওঁর যত্ন কোরো।
নয়নতারার একটু অবাক লাগলো। প্রথম, অবশ্য, কৌতূহলের নিবৃত্তি। এই তাহলে কায়েতবাড়ির কুমার। এসবক্ষেত্রে অবগুণ্ঠন থাকে, নয়নতারা ও হৈমীর তা ছিলো। কিন্তু সে অবগুণ্ঠন রেশমের, যা স্বচ্ছ। আলাপে না আনলেও বোঝা যায় তা রানীর অভিপ্রেত ছিলো,নতুবা সঙ্গে নিয়ে বসতেন না। কিংবা নাকি মনের চঞ্চলতাকে আড়ালে রাখতে পার্ষদ নিয়ে বসা। নয়নতারা অনুভব করলো কায়েতবাড়ির কুমার সম্বন্ধে রানী কি কিছু বলতে চাইছেন? যেন, যা একদিন গোপন ছিলো এখন প্রকাশ হতে চলেছে, কিন্তু প্রকাশটাকে আয়ত্তে রাখতে হবে।
