কেট বললো– চলতে চলতে–আচ্ছা, রাজকুমার, সেই গর্তটা কি কাঁকড়ার হতে পারে? হাসছেন যে?
হাসছি? রাজচন্দ্র হাসিমুখেই বললো, এ কি হাসির কথা? দ্যাখো মন্দিরের অনেকটা দেখা যাচ্ছে আকাশ ছুঁড়ে যেন, আর এদিকে বাঁধে এত বড়ো ফাটল।
সামনে থেকে পূজারী বললো–অউর ভি হৈ।
পূজারীর এই অনুপ্রবেশ সামলে নিয়ে নয়নতারা নিচু গলায় বললো–শুনলেন?
আপনি কি বলছেন রাজকুমার, মন্দিরের বিপদ হতে পারে?
রাজনগর রাজচন্দ্র বললো–নদীর যদি ফেরার মতি হয়। এ বিষয়ে আপনার কী মত, ঠাকুরমশাই?
নয়নতারা চাপা গলায় আ বলে রাজচন্দ্রকে নিরস্ত করতে গেলোলা। কিন্তু তার আগেই পুরোহিত ভাঙা বাংলায় বললো–নাম যাই হোক, আসলে গঙ্গামাঈ। তো লোটাসে গঙ্গা চড়াই বুঢ়াকে। কখুন মাঈ-এর সওখ হোবে বুঢ়াকে আপন কোরে নিতে।
রাজচন্দ্রর মুখে চাপা হাসি, নয়নতারার গালে রক্তাভা।
কিন্তু বালিআড়ির আলগা ঢালুটায় বোধ হয় পূজারী সতর্ক ছিলো নিজের ভারি শরীরের জন্য। বালিআড়ির থেকে নামতে পেরে লম্বা লম্বা পায়ে পূজারী অনেকটা এগিয়ে গেলো।
রাজচন্দ্র বললো–নয়ন, লোকটি পূজারীবটে তো? গোঁফটা দেখেছো? কমণ্ডলুটা খালি থাকলেও তুমি তুলতে পারবে কি?
কেট বললো–লোকটি, আমি বাজি রাখতে পারি, পাহাড়ী, অন্তত পাহাড়ে ঘোরা অভ্যাস আছে।
তারা সেই ঘাটের কাছে এসেছিলো। পূজারী কয়েকটা লম্বা পা ফেলে উঠে গেলো। রাজচন্দ্র বললো–এবার?
নামার চাইতে ওঠাই আরো কঠিন। শুধু হাত ধরাতেই হলো না।
পারে উঠে রাজচন্দ্র বললো, এখন কিন্তু বেলা আর বেশি নেই। দ্যাখো, নদীর উপরে আকাশের ওদিকটা সোনালি রাংতার মতো।
নয়নতারা নিঃশব্দে হাঁটতে লাগলো। যে-চাদরটা সারাক্ষণই ছিলো এখন আবার তা অবগুণ্ঠন হয়ে মুখের দুপাশকেই খানিকটা করে ঢেকে ফেলেছে।
রাজচন্দ্র হাসি হাসি মুখে বললো–তোমার পুরোহিত হয়তো আবাল্য সন্ন্যাসী, কিন্তু প্রেমের কথা বোঝে দ্যাখো! কিংবা রানীমার উজিরাইন কি এখনো বাঁধের ফাটল নিয়েই দুশ্চিন্তায়?
নয়নতারা বললো–নদীর গতি তো বদলায়ই। কুতঘাট সরে গিয়েছে সেটাও একটা প্রমাণ।
রাজচন্দ্র জোরে জোরে হাসলো। বললো, তাতেই বা তোমার ভাবনার কী? ফরাসীরা শক্ত করে বাঁধ দিয়েছিলো। রানীমা কি প্রয়োজনে আরো শক্ত করে বাঁধ দেবেন না?
.
০৪.
তারা মন্দিরের কাছে যেতে রাজুর ইশারায় পালকি এগিয়ে এলো। তখনো অন্ধকার হয়নি, কিন্তু আলো বাদামী হয়েছে। কেট ও নয়নতারা পালকিতে উঠলো, রাজচন্দ্র তার ঘোড়ায়। ততক্ষণে বরকন্দাজ মশাল জ্বালিয়ে নিয়েছে। বেহারারা পালকি নিয়ে চলেছে, কিন্তু ঘোড়ার শব্দ কানে না আসায় পালকির দরজায় মুখ বার করলো নয়নতারা। সে অবাক হলো। দেখলো, যেখানে তারা পালকিতে উঠেছিলো সেখানে বাদামী আলোতে কালো স্তব্ধ এক ঘোড়সওয়ার হয়ে রাজচন্দ্র : নড়ছে না। কিছু ভাবছে?
পালকি ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে। ছাদের কাছে ছোটো গোল কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের মশালের আলো লাল ছোটো বৃত্তের মতো পড়ছে, লাফাচ্ছে। কখনো তা নয়নতারার সিঁথির উপর দিয়ে, কখনো কেটের মুখে, কখনও কোলের উপরে জড়ো করে রাখা তাদের হাতে। এরকমক্ষেত্রে মনও দুলে দুলে ওঠে, সরে সরে যায়। চিন্তার উৎস অনির্দেশ্য হয়ে পড়ে। কেট বললো– শীত এসে গেলো, এখন কিন্তু সোয়েটারকে বুনে তুলতে হয়। সে কি কল্পনায় সুন্দর সুঠাম এক পুরুষকে তার বৈঠকখানার দেখলো! অথবা মেলাই বৈঠকখানার আলাপের অভ্যাস!নয়নতারা যেন শুনতে পায়নি এমনভাবে চাইলো। শুনতে সে অবশ্যই পেয়েছিলো, মন সজাগ হতে একটু দেরি হলো। কেটকে দেখেই তার পরামর্শে গত শীতের গোড়ায় রাজকুমারের জন্য একটা সোয়েটার বুনতে শুরু করেছিলো। সেই বিলেতি উলের রং রাজকুমারকে নিশ্চয়ই মানাতো। তাছাড়া কি বিলেতি উল, কি উলবোনা তখন কলকাতাতেও চূড়ান্ত আধুনিকতা। একবছর থেকে তা আরম্ভ হয়েই পড়ে আছে।
নয়নতারা কল্পনায় কি এক খয়েরি অন্ধকারে গাঢ় খয়েরি এক ঘোড়সওয়ারকে দেখতে পেলো? কী চায়? কী খোঁজে? এখন কি আর মানায়? নয়নতারা বললো–বলতে গিয়ে যেন বিব্রত হয়ে হাসলো–দ্যাখো কাণ্ড! একেবারে মনে ছিলো না। তুমি কি বুনে দিতে পারো না, কেট?
পালকিটা হুমহাম করে চলতে লাগলো। নয়নতারা কেটের হাতে-মুখে যেন সেই আলোর বৃত্তগুলোর নাচন দেখছে। তখন অনুভব করলো, পার্থক্যটাই অভিপ্রেত। তাই নয় কি? কষ্ট বটে।
উলের কথায় নীরবতা কাটলো না দেখে অন্য গল্প ভেবে নিয়ে কেট বললো–পুরোহিত যে গঙ্গার ফিরে আসার কথা বলছিলেন, তা কি কোনো উপাখ্যান?
নয়নতারা হাসিমুখে বললো–ধারণাটা আছে, গল্প বানালেই হলো। এই বলে গঙ্গাকে শিবের স্ত্রীরূপে কল্পনা করা হয়, শিবের জটায় গঙ্গা নেমেছিলো, সেখানে ফাঁদে পড়েছিলো কিংবা প্রেমে–এমন সব গল্প করলো।
কেট বললো–এটা কি কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার বিন্যাস? তাহলে শিক্ষিত মানুষেরা কেন পূজা করবে?
নয়নতারা হেসে বললো–এই দ্যাখো আমি নাকি শিরোমণিঠাকুর! আমরা বড়োজোর অনুভব করতে পারি। গঙ্গা চঞ্চলা, স্নিগ্ধা, প্রমত্তা,কী যেন এক অদ্ভুত প্রবাহ! প্রাণের বলবে? কিংবা প্রবহমান কালের ছায়া? অন্যদিকে জানো কেট, শিবের নাম মহাকাল–যার শেষ নেই, প্রথম নেই, খণ্ড হয় না। এরকম ব্যক্তিত্বে স্নেহ থাকতে পারে? কিন্তু মনে হয় না যে সে গঙ্গাকে যদি বা ভালোবাসে যেন কোনো এক বিষে তার মন জর্জর, যেন উদাসীন, যেন কীসের সাধনা করে, যেন বুঝতে পারে না কী চায়?
