সে নিজের মন থেকে সরতে গেলে তার চোখ দুটি চঞ্চল হলো। সে বললো, রাজকুমার, আপনাদের দেশের পুরুষরা বুঝি শুধু অসীমকে খোঁজে, তাই কালো চোখের মণি, কালো চুল।
রাজচন্দ্র বললো–ও, সেই কথা। এ বিষয়ে আমি একটা গল্প বলতে পারি। কেটের দেশেও কালো চুলের কালো মণির মানুষ আছে। প্রমাণ বাগচীমশাই। তবে এরকম কুংসস্কারও আছে, আবার বাগচীই প্রমাণ, পুরুষরা তাদের সংস্পর্শে এলে ফল ভালো হয় না। আর সভ্য দেশে থেকেও তারা নাকি অসভ্য। চাকা লাগানো বাড়িতে কিংবা ছোটো ছোটো গাড়িকে বাড়ি করে বাস করে। তাতে ঘোড়া লাগিয়েই এক জায়গা থেকে অন্যত্র চলে যায়। কী যেন নাম কেট?
কেট জিজ্ঞাসা করলো–আপনি জিপসি মেয়েদের কথা মনে করছেন? ভালোনয় কিন্তু।
খুব গরম বুঝি? রাজু হাসলো। বললো–কিন্তু জাতিটার কথাই মনে করো। বললো– সে, জানো নয়ন, তাদের নিজস্ব নানা বিদ্যা আছে নাকি, পূর্বপুরুষ থেকে মুখে মুখে শোনা অলিখিত নীতিগুচ্ছ আছে। সারা ইউরোপে তারা হাজার বছর থেকে বাস করছে, কিন্তু কিছুতেই ইউরোপীয়দের সঙ্গে মিশে যায়নি। এমনকী ভাষা–যে ভাষায় তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে, তা না ইংরেজি, না ফরাসি, ইউরোপীয়ই নাকি নয়।
নয়নতারা বললো–তারা কি আমাদের দেশের বেদের মতো?
রাজু বললো, কিন্তু তাদের সম্বন্ধে এই এক গল্প আছে, হাজার বছর ধরে তারা পথ হাঁটছে। তাদের ভাষাই প্রমাণ তারা একসময়ে ভারতবর্ষে ছিলো। কিন্তু হাজার বছর হেঁটেও ভারতবর্ষে ফিরতে পারছে না আর। বরং আরো দূরেই চলে যাচ্ছে। বোধ হয় ফেরার। সময়টাকে হারিয়ে ফেলে আর তা খুঁজে পাচ্ছে না।
নয়নতারা গোপনে রাজুর মুখের দিকে তাকালো। যে কথা বলছে তার স্বর কোনো কোনো সময়ে যা সে বলছে তার থেকে পৃথক কিছু বলতে থাকে।
.
০৩.
কিন্তু নয়নতারা বললো, কতদূরে সরে গিয়েছে নদী! কোথায় বা নৌকা ভিড়বে, কী করেই বা স্নানে যাবে মানুষ, পুরোহিতই বা কোথায় গেলো? এই খাড়া বাঁধ, ফরাসীরাই বা জলের কী করতো?
রাজচন্দ্র বলল–এখন কুতঘাট অনেকটা উজানে। সেখানেনদীর পাড় চালু হয়ে নিশ্চয় জল ছোঁয়। গোরুর গাড়িগুলোকে যেতে হয় জলের ধারে। কিন্তু তাই বা কেন? ফরাসডাঙারই ঘাট আছে, যে পথে তোমার পুরোহিত স্নানে গিয়েছে নিশ্চয়।
ডানদিকে খানিকটা চলে তারা বাঁধের গায়ে গড়ে তোলা ঘাট পেলো। এত চওড়া এত সিঁড়ির সেই ঘাট অনেক খরচে তৈরী হয়ে থাকবে। এখন তো ভাঙাই, মাঝে দু-এক ধাপ সিঁড়িও উধাও। ফাটলে ঘাস জন্মেছে।
-তোমরা নামবে কি? কী করে তা পারবে? রসসা, হাত ধরো। শুধু রোদ আর আলো নয় ধুলোও কিন্তু। প্রথম কেটকে, পরে নয়নতারাকে হাত ধরে নামতে সাহায্য করলো রাজচন্দ্র। সে বললো, আমরা কি নদীর জল পর্যন্তই যাবো? তাহলে কিন্তু চরের সীমা বলে যা মনে হচ্ছে ওই ঘাসবন পর্যন্ত যেতে হবে। অনেকটা দূরই। নয়নতারা বললো–আধঘণ্টায় ফেরা যাবে না? তাহলে চলুন, ভালো লাগছে না কেট?
কেট বললো, এখন আর অসুবিধা কি বালিটা সমতলই তো।
খানিকটা দূরে গিয়ে সম্ভবত বাঁধটাকে দেখতে ইচ্ছা হলো, নয়নতারা ফিরে দাঁড়ালো। প্রকাণ্ড নিরেট ইটগাঁথা বাঁধ। নয়নতারা বললো–দেখুন, রাজকুমার, দেখুন। ওদিকে কেমন ফাটল লেগেছে বাঁধে।
তা বটে। শুধু ফাটলই নয়, সেখানে বাঁধটার গোড়ায় একটা সুড়ঙ্গ, যেন কোনো বন্যজন্তু গুহা তৈরী করেছে।
রাজচন্দ্র বললো–তুমি কি বলবে শেয়াল গর্ত করেছে? নাও হতে পারে।
যেখানে তারা দাঁড়িয়েছিলো তার বাঁদিকে খানিকটা দূর পর্যন্ত চরটা বালিআড়ির মতো উঁচু হয়ে উঠেছে। তার ওদিকের ঢালুটার গায়ে যেন সবুজের ভাব। বালিআড়ির গায়েও এখানে চরঝাউ। সবুজের ভাবটা প্রমাণ করে, জল কাছেই হবে সেদিকে। অন্যদিকে তাদের পিছনেই বাঁধানো পাড়ের বড়ো ফাটলটা যেন তখন দূর থেকে গুহার মতো দেখাচ্ছে।
কিন্তু পতপত করে শব্দ হলো। বালিআড়ির ওপাশ থেকেই যেন আকাশে উঠে পড়েছে শব্দটা। কেট উত্তেজিত হয়ে বললো–হাঁস, হাঁস।
হাঁস হলে তা বেশ বড় আর রঙিন। দুটো ডানাই চঞ্চল, কিন্তু ঠোঁট গলা যেন তখন মাটির দিকে ঝুঁকে।
বুনো হাঁস? নয়নতারাও জিজ্ঞাসা করলো।
রাজচন্দ্ৰ হেসে বললো, কী বলল তো, সার্বভৌমপাড়ার মেয়ে? এই কিন্তু সেই চক্রবাক বধূ আমন্ত্রয়স্ব ইত্যাদি। কেট, ফর ইনফরমেশন, একে চকা বলে। দ্যাখো, ঠিক একজোড়া।
কিন্তু তাদের বালিআড়ির সবটা উঠতে হলো না। তারা ওপার থেকে একজন মানুষকে আসতে দেখলো। খালি গায়ে, কাঁধে ভিজেকাপড়, হাতে ঘড়ার মতো বড়ো পিতলের কমণ্ডলু। পূজারী ছাড়া এখানে আর তেমন কে হবে?
নয়নতারা বললো– রাজকুমার, এ যদি পূজারী হয় তবে পূজার খবর, স্নানের খবর এর চাইতে আর কে ভালো বলবে? আমাদের আর এগিয়ে কী হবে? কী বলল, কেট?
পূজারীই লম্বা লম্বা পায়ে তাদের কাছে এসে পড়লো। নয়নতারা তাকে জানালো, রাজবাড়ি থেকে তারা শিবমন্দিরের খোঁজ খবর নিতে এসেছিলো। পূজারী বোধহয় স্বল্পভাষী এবং নমস্কার করে না। একবারমাত্র তিনজনকে দেখে নিয়ে মৃদু হেসে পথ চলতে লাগলো। রাজু বললো–চলো, আমরাও ফিরি। বাঁধের সেই ফাটলটা কিন্তু আমাদের পথের দিশারী। নাকি পূজারীর পিছন পিছন চলবে। অন্তত কোথায় স্নান হবে তা তোমার জানা হয়েছে।
তারা ফিরতে শুরু করলো।
