একটা সুন্দর কবোষ্ণ অনুভূতির অবসর। নয়নতারার কর্তব্য, অন্তত যা তাকে এনেছে, সে তো প্রায় সমাধাই হয়েছে। ঝরঝরে আলোর দিন। আর রঙিন আলোটা তো থেকে থেকে এখন তিনজনের গায়েই যেন পড়ছে। নয়নতারা কেটের ডান হাতখানা নিজের হাতে তুলে নিয়ে অন্যমনস্কের মতো তার আঙুল নিয়ে খেলতে খেলতে সামনের দিকে চেয়ে ছিলো। সামনে তো কয়েকটা ছোটো ঝোপ ছাড়া অবারিত ঘাসে ঢাকা একটা মাঠই, যার প্রান্তে একটামাত্র গাছ। গাছটা বিলিতি।
ফুট তিনেক উপর থেকে কাণ্ডটা যেন দুভাগে দুটো গাছ হয়ে আবার কয়েক ফুট উপরে এক হওয়ার চেষ্টা করছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতেইনয়নতারা দেখলো, একটা ছোট্ট ঘূর্ণি বাতাস একটা খরগোস বা কোনো বড়ো পাখির মতো মাটির উপরে ছুটোছুটি করছে। সেটা একবার পাতাটাতা ঘুরিয়ে পাঁচ-ছ আঙুল ব্যাসের শুড়ের চেহারা নিয়ে উপরে উঠলো। তাদের দিকে এগিয়ে আসতে মুখ থুবড়ে পড়লো।
আর তখন মনে হলোনয়নতারার, আশ্চর্য, এটাই কি সেই গাছ যাতে পিয়েত্রোর ছোটো হাতিটা বাঁধা ছিলো। হাতিটাও কেন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো। তাই বলে এটা কখনো কি সত্য হতে পারে, সেই মূক প্রাণী বুঝেছিলো সেই বাদলের সন্ধ্যায় পিয়েত্রোর মরদেহ ঘিরে তখন তার চাকর বাবুর্চিরা হাহাকার করছে। সে নিজে বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলো রাজুর অপেক্ষায়। রানীমা আগেই নিঃশব্দে চলে গিয়েছিলেন।
ঘূর্ণিটা এবার যেন ফণা তুলে নাচতে নাচতে এগিয়ে এসে তাদের পায়ের কাছাকাছি ভাঙলো। কয়েকটা পাতা সরসর শব্দ করলো। নয়নতারা মাঠটার দিকে চেয়ে চেয়ে হাসিমুখে বললো–আচ্ছা, কেট, তুমি কখনো দাবা খেলেছো, ঘোড়ায় চড়েছো?
রাজচন্দ্র বললো–কেন, কেট, দাবা তো তোমাদের দেশেও আছে। বাগচী তার প্রমাণ। আমাকে মাঝে মাঝে মাৎ করেন।
কেট হেসে বললো, কিন্তু আমি তো পাদরির মেয়ে, পাদরির স্ত্রী।
রাজচন্দ্র বললো–আর আমি তোমার কাছে শুনেছি তোমার ঘোড়া ছিলো। এমনকী তোমাদের সেই সেন্ট্রাল প্রভিন্সের মিশন হাউসেসহিসের ছেলেই তোমারবাল্যপ্রেমিক ছিলো।
কিন্তু নয়নতারার মনে যে-গল্পটা আসছিলো তা যতই ঝকঝকে, রঙিন, আলোকোজ্জ্বল হোক, তা কাছে এলেই শঙ্কার চেহারা নিলো। তার অনুমান হচ্ছিলো, এই মাঠেই হয়তো বরকন্দাজদের নিয়ে রাজকুমার আর বুজরুক শতরঞ্জ খেলেছিলো, সে শতরঞ্জের চাল দিতে নাকি মাঠের চারদিকে ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে হয়েছিলো তাদের। আর, রাজবাড়ির আর পিয়েত্রোর বরকন্দাজেরা ছিলো খুঁটি। কারণ সে খেলা তো ছিলো প্রকৃতপক্ষে তরোয়াল নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা ও আত্মরক্ষার কৌশল অভ্যাস করা। সেই গল্প বলেছিলো রাজু নয়নকে, আর তা শুনে নয়নতারা তারও ঘোড়া চড়া দরকার হতে পারে এরকম বলে হাসাহাসি করেছিলো। কিন্তু শঙ্কারই তো বিষয়। সেই বরকন্দাজরা বুজরুকের সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলো, খুব কমই ফিরেছে। এই গল্প উঠলে রাজু যদি এখন সেসব কথা কেটের সামনে বলে? নয়নতারার মুখ আশঙ্কায় বিবর্ণ হলো। কীকরে গল্পটা ঢেকে অন্যদিকে আলাপ নেয় এখন?
কেট রাজুর কথার উত্তর না-দেওয়ায় নয়নতারার ঘোড়া আর দাবার গল্প থিতিয়ে গেলো।
রাজচন্দ্র ভাবলো, সময় নিয়েই কিন্তু আজ অনেকবার কথা হয়েছে। সেই আকবর বাদশাহের যুগের কথা। খুব বলেছে কথাটা নয়নতারা, ওখানে ওই মন্দিরে একাল থেকে ওকালের তফাত এক আঙুলও নয়। কিন্তু, সে মনে মনে হাসলো, এখানে এই চত্বরের সিঁড়িতে? যেন সে বর্তমানে ফিরতে যত্ন নিলো। হেসে বললো–বাবা, কী সুন্দর! তোমাদের দুজনের এমন করে বসা!
দুজনেই একসঙ্গে চোখ তুলেছিলো। এরকম প্রশংসা শুনে একসঙ্গেই চোখ নামালো তারা।
রাজচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলোহা, কেট, তোমাদের দেশে কালো চুল, কালো চোখ কি হতে নেই? তাতে কি তোমাদের পুরুষরা বশ থাকে না? তারা কি শুধু মণিমাণিক আর সোনাই খোঁজে? যেজন্য তোমার চোখ দুটিকে গোমেদ আর চুলকে সোনা করতে হয়েছে?
প্রশংসা বিরত কেট কিছু বলার আগেই বরকন্দাজ ফিরে এলো। জানালো-পুরোহিত নদীতে স্নান করতে গিয়েছে।
আচ্ছা যাও, বলে তাকে বিদায় দিয়ে রাজচন্দ্র বললো–এখন তাহলে অপেক্ষা করতে হবে?
নয়নতারা বললো–তা কেন? পূজার্থিনীরাও যদি নদীতেই স্নান করতে চায়? চলুন আমরা নদীটাকেও দেখে আসি। বাঁধ থেকে কী করে নদীতে নামা যায় বুঝতে হবে না?
কিন্তু, সে ভাবলো, এখন তোমার কেট আর হৈমীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তাই বলে। তাদের কাছেপিয়েত্রো বুজরুকের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা বলা ভালো হয় না। কথাগুলো ছড়ালে অনেকেই বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
তার সিঁথির নিচে কপালটাকে ম্লান দেখালো।
তারা একেবারে বাঁধের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো। এই বাঁধ ফরাসীরা করে থাকবে। নদীর খাত থেকে দশ-পনেরো হাত ইট দিয়ে গেঁথে তোলা নদীর খাতে দাঁড়ালে মনে হবে কেল্লার প্রাচীর। কোনো কোনো জায়গায় এমন খাড়া, উপর থেকে দেখতে গেলে গা শিরশির করে। কিন্তু নদী?
নয়নতারা ভাবলো, তখন কিন্তু নদী বাঁধ বরাবর চলতো। নয়তো হাওয়াঘরে দাঁড়িয়ে সুলুপের পালে রাজকুমার বন্দুকের নিশানা করতে পারতো না। এখন বাঁধের নিচে বালুচর। আর বালুচর কেমন যেন দুঃখের মতো ব্যাপার। বালিই কিংবা পলি গুড়ো হলে যেমন হয় সাদা মিহি-মাটি। জলে ভেসে আসা বালিতে অর্ধেক পোঁতা একটা গাছের কঙ্কাল।
