-কই না।
কথাটা বোধ হয় নয়নতারার নিজের চিন্তাকে টাঙিয়ে দেবার খিল। সে হেসে বললো, অন্যভাবেও এটাকে দেখা যায়, রাজকুমার। মন্দিরটা মহাকালের তত। তার চোখে শিঙে সোনার-টোপর-পরা বলদ, কিংখাবের জামা-পরা ঘোড়ার সেকাল আর কারো বন্দুক দাগা সোলার টুপি-পরা আধুনিকতায় সময়ের এমন তফাত নেই যে এক শোভাযাত্রায় মানায় না।
–অর্থাৎ এই সব আধুনিকতা প্রাচীন থেকে এমন কিছু পৃথক নয়? এ তো দারুণ কথা!
রাজু এক সমস্যার অভিনয় করলো।
ন্যাতারা গলা নিচু করে বললো–লোকগুলি কাছে থেকে আমাদের আলাপ শুনতে চাইছে, ভয়ে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। কাহাতক আর কষ্ট দেবেন? ডেকে কথা বলুন। দরকারের কথাও আছে।
রাজু শোনো মিস্ত্রি বলে ডাকতেই যে এগিয়ে এলো সে প্রবীণ, বোধ হয় নিজের হাতে এখন কাজ করে না আর। নয়নতারার ইঙ্গিতে রাজু তাকে জিজ্ঞাসা করলোতোর্মাদের সব কাজ শেষ হতে আর কতদিন লাগতে পারে?
সে-ই প্রধান মিস্ত্রি, বললো–এখন তো কাজ ভালোই চলেছে–হুঁজুর, শীতের বাদলে যদি দকে না যাই, বর্ষার মুখে কাজ শেষ করে, বড়োপূজার আগে রঙের কাজ ধরবো। ততদিনে নাটমন্দিরে খিলান গাঁথা শেষ হবে।
রাজচন্দ্ৰ হেসে বললো, আরো ন-দশ মাস তো বটেই। বর্ষায় কাজ অনেকদিন বন্ধ থাকলে এক বছরও হতে পারে। দ্যাখো, মুশকিল!
শেষ কথাটা লঘু স্বরে নয়নতারাকে বলা।
নয়নতারা বললো–তাহলে এবার শিবচতুর্দশীতে কি পূজা হবে না?
–হুজুরাইন, চেষ্টাই হচ্ছে যাতে হয়। সেজন্য উপরের ছাতিতে দেখুন, সব লোক লেগেছে। এখন একমাস ওই কাজ। পদ্মটা বসিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিন্দি, তখন ভিতরে পূজা, বাইরে কাঁধত টালি বসানো চলবে। শিবের মাথায় দাঁড়াতে সাহস নেই যে আজ্ঞা।
নয়নতারা উপরে চাইলো। দড়ির জালে আটকানো অনেকগুলো শাখামৃগ যেন। প্রকৃতপক্ষে বাঁশের ভারা বেঁধে মিস্ত্রিরা কাজ করছে।
এই কথাই বলে মিস্ত্রিকে বিদায় দিলো নয়নতারা। তারা তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো। কিছুদূরে যেখানে কুমোরেরা টালি গড়ছে সেখানে যেতে চাইলো কেট।
হো হো করে রাজু হাসলোদেখলে, হুজুরাইনকে ঠিক চিনেছে।
ঠিক এরকম সময়ে মনে হলোনয়নতারার, রানীমা জানতে চেয়েছিলেন মন্দিরটা কেমন দেখায় তার চোখে। এখন তো আকারটা স্পষ্টই হয়ে উঠছে। বাইরের দেয়ালটা যতদূর মানায় টালির কারুকার্যে অপূর্ব রকমে সুন্দর দেখাবে; চত্বরসমেত রথটার বিরাট আকারও দ্যাখো; যেন সৌন্দর্যে গাম্ভীর্যে সংযুক্ত। নয়নতারার মনে হলো, রানীমার এরকম নির্দেশের অর্থ কি এই হতে পারে যে তিনি নিতান্ত উৎসুক মন্দির সম্বন্ধে? আর তা স্বাভাবিকও। সেই রক্তচন্দনের পাত্রে যা ছিলো তা বুকের রক্ত, বুকটা অনেকখানি চিরে না দিলে ফেঁটায় ফোঁটায় অতটা রক্ত জমে না। অন্যদিকে চলো দেখে আসি, বলে সে ভাবলো, তবে কি মন্দির শেষ হওয়ার আগে দেখতে আসাটা লঘুতা হবে বোধ করছেন? কৌতুকের এই দোটানা? একটুপরেই নয়নতারা অনুভব করলো, এমনটাই রানীদের মানায়।
টালিকারখানার কৌতূহল মিটলে তারা চকচকে মুখে ঘুরে দাঁড়ালো আর তখন আবার তারা অন্যকিছুতে আকৃষ্ট হলো। বাঁধের নিচে নদীর খাত। আকাশরেখা বাঁধের কাঁধে। সেই আকাশে ইতিমধ্যে রং জমতে শুরু করেছে। যথেষ্ট আলো, কিন্তু তা যেন রঙিন। তারা পায়ে পায়ে বাঁধের দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু ততদূরে যাওয়ার আগে চত্বরে উঠবার সিঁড়ির একটা অংশ কমলা-আলোয় রঙানো মনে হলো।
আমরা কি এখানে বসবো? –এই বলে রাজচন্দ্র সেই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। নিজেই বসলো। বললো–তোমরা? কিংবা সে আমার ভাবনা নয়। অনুমতি করো, পাইপ ধরাই।
কেট বললো–ধুলো নয়?
রাজু বললো–যথেষ্ট, এবং শুকনো পাতাও কয়েকটি। সে নিচের সিঁড়িতে বসে উপরেরটিতে, যেন আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বসে, পাউচ পাইপ বার করলো।
রাজু-আবার কী দৃশ্য পেলে?
কেট বলতে গিয়ে কম বললেন।
রাজু-কী? সে প্রথমে একটু অবাক, পরক্ষণেই সে নিজেই তাদের আলোচনার বিষয় বুঝে হো হো করে হেসে উঠলো। কী যেন কেট, বাগচী তোমার কথায় হেসে বলেছিলো? কাপিটাল! কিংবা—রোসো, আলো থেকে সরে বসি, রোদটা লাগছে বটে।
কিন্তু নয়নতারাই নিজের কথায় লজ্জা পেয়ে সরে গেলো, বললো–রাজকুমার, এখনো রাজকার্য বাকি। শিবপূজায় যথেষ্ট জল লাগে। তার তো ব্যবস্থা দেখছি না।
নদীর ধারেই আকণ্ঠ তৃষ্ণা! বসো, উজিরাইন, খোঁজখবর নিই।
রাজু পাইপে তামাক ভরে উঠে দাঁড়ালো। দূরে দাঁড়ানো বেহারাদের দিকে হাত তুলে ইশারা করলো। বরকন্দাজ দৌড়ে এলে, সে তাকে পুরোহিত-ঠাকুরকে ডেকে দিতে বললো।
লোকটি চলে যেতেই নয়নতারার দিকে ফিরে বললো–কেমন ব্যবস্থা হলো,উজিরাইন! তুমি অন্তত, কেট, পাশে বসে রাজকুমারের বুদ্ধির মূল্য দাও।
হেসে নয়নতারা রাজচন্দ্রের পাশে বসলো, কেটকে বসালো মাঝখানে। সিঁড়িটা যথেষ্ট চওড়া, ঘেঁষাঘেঁষি হলো না।
নদীর এত কাছে কিছুক্ষণ পরেই আকাশে যে রং বদলের খেলা শুরু হবে এখন যেন তার মহড়া হচ্ছে। আলো কমছে, বাড়ছে। এখানে সব শান্তনয়, নতুবা সিঁড়িতে এত শুকনো পাতা কী করে আসবে? তেমন একটা হাওয়া হালকা-ধুলোর ঝাপটা দিয়ে গেলো। রাজচন্দ্র হেসে, মুখের পাইপ সরিয়ে, রুমালে নাক-মুখ মুছলো।
নয়নতারা হাসলো ধুলোর দুষ্টুমিতে। কিন্তু ভাবলো, এই পাইপেতামাকটা নতুন, যেমন নতুন এই দাড়ি। এটা ভারি মজার যেন যে রাজু পাইপ টানছে! কী আছে ওতে? অর্থাৎ রাজকুমার এখন পুরুষ। তার যেন এক বিস্ময় লাগলো, পাইপ-পাউচ আর তার পাশে রাখা বিলেতি দেশলাই-পাতা দেখে।
