কেট বললো–আমিও আসবো?
চত্বরের সিঁড়ির দুএক ধাপইতিমধ্যে উঠেছেনয়নতারা। বললো–ডানকানরা উঠেছিলো ভেবে দেখো।
উঠে পড়ো। তাছাড়া তোমাকেই বরং সাবধানে চলতে হয়। তোমার চাপার কলি আঙুলগুলো দেখে না ফেলেন। চার-চারটি থাকতেও উনি এমনকী কুচনী পেলে ছাড়েন না।
ক্যাথরিন কিছু সঙ্কুচিত হলো। এইসব মিথোলজি!মনে মনে এই বলে সময়ের উপযুক্ত কথা খুঁজে বললো–উনি কি তা হলে কুলীন হলেন?
নয়নতারা বললো–কাপও হতে পারেন। একজন মাথায় চড়ে, বকবকানিতে কান ঝালাপালা, একজন বুকে গলায় জড়িয়ে থেকেও ফোঁসফোঁস করছে, কাউকে ঠাণ্ডা রাখতে তার পায়ে লুটোচ্ছেন, একজন তো শরীরের আধখানাই জুড়ে আছেন। এসো এসো,স্ত্রীলোক হলেই হলো, ওঁর আবার জাতি কী!
দ্রষ্টব্য বিষয় যদি আকারে প্রকারে বিপুল হয়, তবে তার পাশে একাদড়ানো আর অনেক মানুষের ভিড়ে দাঁড়ানো এক নয়। মন্দিরের কাঁধে উঠে শিখরের গোড়ায় ইট গাঁথা চলেছে এখনো, নিচেও, বলা যায় মন্দিরের কোমরের কাছে হচ্ছে আন্তরের। ইট গাঁথবার সময় খাঁজ রেখে গিয়েছে, এখন মশালের সাহায্যে টালি বসানো হচ্ছে। নিচে তো সেজন্য একটা টালির কারখানা বসেছে। কাঁচামাটির তাল কাঠের ছাঁচে চেপে টালি করে তা রোদে শুকোচ্ছে। ওদিকে পোয়াল ধোঁয়াচ্ছে। সেখানে টালিগুলো পুড়ে লাল হয়। টালিগুলো এক মাপের নয়। বড়ো বড়ো গুলোতে একটা একটা পুরো দৃশ্য–বেলতলায় তপস্বী, অন্নপাত্র হাতে সীমন্তিনী, পাশাপাশি বসালে এক পৌরাণিক গল্প হবে। ছোটোগুলোর কোনটিতে একটি হাতি আর মাহুত, কোথাও একটা ধুমসোককুদ ষাঁড়। সে রকম একসারি টালি চার দেয়াল ঘুরে বসানো শেষ হওয়ায় মনে হচ্ছে তা এক শোভাযাত্রার দৃশ্য। হাতি ঘোড়া মানুষ, শিং-এর কারুকার্য ষাঁড়, রামশিঙা নিয়ে পাগড়িবাঁধা মানুষ, ঢোল নিয়ে তেমন মানুষ।
কেট বললো–এদের আকৃতিতে কিন্তু নতুনত্ব আছে।
নয়নতারা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো, বললো–যেমন চোখে দেখি তেমন নয়, তাই। বলছো না?
কেট বললো–মনে হচ্ছে না যে হাতিটা যেমন অসাধারণ ঘোড়াটাও ঠিক তাই? বেশিও নয়, কমও নয়।
রাজচন্দ্র বললো–অর্থাৎ সবই সমান অবস্তু।
নয়নতারা কিন্তু ওদের রাজ্যের হিসাব মানি, যদি সকলেই মানানসই। রামশিঙাটা মানুষের সমান কারণ তা বাজছে; ঘোড়াটা খুব কায়দা করে গলা বেঁকিয়েছে, সেজন্যই গলায় অত অলঙ্কার; হাতিটা পিঠের সওয়ারের জন্য খুব দাম্ভিক, সেজন্য চোখ অত বড়ো আর কানের দুপাশে বাঁধা ঝুমকি ঝুলে মাটি ছুঁয়েছে। এমন সুন্দর হয় না।
হঠাৎ কেট হেসে বললো–এদিকে দেখুন তবে।
-আ রে, এ যে দেখছি আমাদের বন্ধু, একেবারে টুপিসমেত। খিলখিল করে হাসলো নয়নতারা।
রাজু বললো–তা আমার একটা তুলনা মনে আসছে। এসবই যেন আমাদের কেটের মুখের বাংলা। ঠিক স্পষ্ট নয় উচ্চারণ, ঠিক আমাদের মতো ব্যাকরণ নয়, কিন্তু মিষ্টি শব্দ শুনে তার উৎস লাল ঠোঁটদুটিকে দেখতে হয়, যেন তা লোভনীয় ফুলের মতো ফুটে ফুটে উঠছে।
কেটের মুখ লাল হয়ে উঠলো, নয়নতারা ঝিকিমিকি হেসে বললো–ধন্যবাদ, এজন্যই তো রাজকুমার।
টালির গায়ে হাতির পিঠে শিকারীর ছবি, হাওদায় ঝুঁকে দাঁড়িয়ে সে বাঘ শিকার করছে। বাঘটি চেহারায় দুর্গার সিংহ, আকারে হাতির অর্ধেক অন্তত। রাজু নিজের সেই সম্ভাব্য ব্যঞ্জনায় হা হা করে হেসে উঠলো। কিন্তু পরে বললো, ছবি হিসাবে বেমানান হলো, ওই রামশিঙা আর ককুদ্বান বৃষের পাশে বন্দুক-টুপিধারী শিকারী মানায় না।
-কেন? বললো– নয়নতারা। এই বলে সে একটু ভেবে নিয়ে বললো, আকবর বাদশার সময়ে কি রামশিঙা বাজতোনা? কিংবা তখন কি বলদের শিঙে সোনারূপার গহনা দেওয়া হতো না, অথবা ঘোড়ার পিঠে সোনারূপার কাজ করা মাটি ছোঁয়া কিংখাবের জামা?
হয়তো,হয়তো।
–আকবর বাদশার সময়ে, শুনেছি কিংবা রানীমার ঘরে তসবীরে দেখে থাকবো, বন্দুকে গাধা কিংবা সিংহ শিকারের ব্যবস্থা ছিলো। এখানেও বন্দুকের গায়ে কত কারুকাজ। তেমন বন্দুকই।
–তাহলে, কেট বললো, বন্দুক সত্ত্বেও এই শোভাযাত্রা দু-তিনশো বছরের পুরনো?
–অর্থাৎ আমাকে, রাজু বললো, তুমি আকবর বাদশাহের সময় থেকে উঠে আসা একজন মনে করো? হা ঈশ্বর!
নয়নতারা বললো–হলোই বা, কী লোকসান তাতে? কিন্তু দেখুন এদিকে, টালিগুলোর উপর-পাড় বরাবর নক্সাটা যেন আধখানা বাঁশের। আস্ত বাঁশকে লম্বায় চিরলে যেমন হয়। রোসো হয়েছে। তাহলে উপরের টালির থাকের নিচ-পাড়ে বাঁশের বাকি আধখানা পাওয়া যাবে।
রাজচন্দ্ৰ হেসে বললো–তাতে কি হবে? বাঁশ কি এমন দুপ্রাপ্য বিষয়?
-তখন, আমার মনে হচ্ছে, নয়নতারা ভাবতে ভাবতে বললো, এই শোভাযাত্রার দৃশ্যগুলোর উপর দিয়ে গোটা মন্দিরটা ঘিরে একটা বাঁশগিরে রুলির নক্সা ফুটবে।
না কেট,না রাজু বাঙালিনীর অতি প্রিয় এই রুলি-অলঙ্কার সম্বন্ধে কল্পনা উদ্দীপ্ত হওয়ার কিছু পেলো না। কিন্তু নয়নতারার সুন্দরের দৃষ্টিতে যেন স্বপ্নের ঘোর লাগলো। ভাবলো সে, কোনো এক রমণীর বলয়ের ঘেরের মধ্যে মন্দির? নিজের দুখানা বাহুতে ঘেরা কিংবা হৃদয় দিয়ে ঢাকা, ছবিতে এমন ফুটানো যায় না বলেই যেন নিজের বলয় দিয়ে ঘেরা। কিন্তু কার বলয়?
ততক্ষণে কেট ও রাজকুমার এগিয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি চলে তাদের পাশে গিয়ে। নয়নতারা বললো, রাজকুমার কি এখনো আকবর বাদশার যুগের কথা ভাবছেন?
