বাগচী নিজেকে বললো–এসব ভাবতে চাই না। মধ্যপ্রদেশে যেমন সমাজ এখানে গ্রামে তেমন একটা সমাজ আছে। এ সমাজ অবশ্যই আমাদের অন্তরঙ্গ করে নেয়নি। নিতে কে পারে? কিন্তু একেবারে কি দূরে রেখেছে? তাছাড়া আমাদের সন্তান কোথায়? বাগচী যে আত্মায় বিশ্বাস করতো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মনকে অবিশ্বাস করতো তাও বলা যায় না। মন ততবুদ্ধিরই দুর্গ। সে ভাবলো, কেট বেশ বুদ্ধিমতী। সে অনায়াসে চিঠিটাকে পুড়িয়ে দিতে পারবে। সে অবশ্য খুব জেদীমানুষ। দ্যাখো, কিছু দেবো না, বলতে সে মিশন হাউস থেকে তার সখের জিনিসগুলোও আনেনি। আসবাবপত্র এমনকী নিত্য সন্ধ্যার সঙ্গী অর্গানটার দিকেও ফিরে চায়নি।
.
০২.
কাহাররা আস্তে চলতে জানে না। যেন যত তাড়াতাড়ি পারে গন্তব্যে পৌঁছে বোঝাটাকে নামানো চাই। চাপা হু-হুঁ করে আটজন ছুটছে। এক হাত পালকির দাঁড়ায়, অন্য হাত ভাঁজ করে বুকের কাছে নেওয়া, সেটা সে অবস্থায় হুঁ-কারের তাল রাখছে। পিছনে,কখনো সামনে, সরু সরু লম্বা পায়ের সেই কালো ঘোটকী, যার নিতম্ব ছাড়া সর্বত্র হালকা হরিণের ভাব, সামনের দুপায়ে দু থোপা সাদা চুল থাকায় রূপার মল পরেছে বলে ভুল হতে পারে, মাথা উঁচু করে ঘাড় বাড়িয়ে চলেছে,যাকে অ্যালিং বলে। রূপচাঁদ আর বরকন্দাজের দল হাসি হাসি মুখে ছুটতে ছুটতে পিছিয়ে পড়ছে।
পথে একবার পালকি আর ঘোড়ায় ছাড়াছাড়ি হলো। ঘোটকী ক্যান্টারে নাচতে নাচতে এগিয়ে গেলো। আর সেই সময়ে এই অধ্যায়ে যা প্রক্ষিপ্ত এমন একটা ব্যাপার ঘটলো। পথের পাশে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে একজন গ্রামবাসী আনত হয়ে রাজকুমারকে নমস্কার করলো। তার ভঙ্গিটা এমন যেন সে কিছু বলতে চায়। রায়ত হলেও বিশিষ্ট হবে, গায়ে মেরজাই, পাকানো চাদর, পায়ে চীনা জুতা। রাজচন্দ্রর অনুমান হলো মানুষটিকে সে কোথাও দেখেছে। রাজচন্দ্র লাগাম টানলো, পালকি এসে পার হয়ে গেলো। হাতিটাও ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে কাছে এসে পড়লো। লোকটি তাড়াতাড়ি পথের ধারে একটা পাত ঝরান্যাড়া-জিওল গাছের নিচে সরে দাঁড়ালো। সেই গাছ আর সে যেন সমান বিষণ্ণ।
রাজু বললো–কিছু বলবে?
আজ্ঞে? লোকটি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলো, যেন রাজকুমারকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে চেষ্টা করলো। তাই কি এই যে রাজকুমার নিজের বুদ্ধিতে চলার মতো বড় হয়েছেন কিনা?
রাজু জিজ্ঞাসা করলো–তোমার নাম কী?
-আমি চরণ দাস। গ্রামের পোস্টামাস্টার। আমি–আমরা খুব বিপন্ন।
–বিপন্ন? কেন? তুমি কি এ বিষয়ে নায়েবমশায়কে বলেছো?
তিনি জানেন, নতুন করে তাঁকে বলা হয়নি।
চরণ দাস দ্বিধা করতে লাগলো। ভাবলো, কেনই বা হঠাৎ শুরু করলো এই আলাপ? ডানকানের ব্যাপারে কী-বা করবেন রাজকুমার? ডানকান অঘ্রাণের ধান কাটার আগে যে ঢিলে মরসুম সেই সুযোগে টাকা বিলোচ্ছে মরেলগঞ্জের বাইরে এসে, তাতে রাজকুমারের কী করার থাকবে?
রাজচন্দ্রর মনে হলো এমন হতে পারে খাজনার গোলমাল করে লোকটি বিপন্ন। সে বলতে গেলে, তুমি তোমার অসুবিধা জানিয়ে রানীমার কাছেও দরখাস্ত করতে পারো।
চরণ দাস ভাবলো, কাজটা ভুলই হয়েছে। সেদিনের লাঞ্চে রাজকুমার ছিলেন না, আর সেদিন রাজবাড়ি থেকে ডানকানের সড়ক কেটে দেওয়া হয়েছে মনে মনে এ দুটোকে যোগ করে রাজকুমারকে কিছু বলতে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। সে তো জানেই রাজবাড়ির খাজনা দেওয়ার জন্যও কেউ টাকা ধার করে, আর মনোহর সিং সেই সুযোগও নিয়ে থাকে দাদন দিতে।
রাজকুমার লাগাম ঢিল দিয়ে ঘোড়ার পিঠে তা দিয়ে মৃদু আঘাত করলো। ঘোড়াটা চলতে শুরু করলো। কিন্তু দুপা যেতে না যেতে সে লাগাম টানলো, জিনের উপরেই ফিরে পিছনে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলোরোসো, তুমি সেই চরণ নয় যে পোস্টমাস্টার গোবরা অর্থাৎ গোবর্ধনের বন্ধু ছিলে?
চরণ এক পা এগিয়ে সমর্থন করলো।
রাজচন্দ্রর মুখটা গম্ভীর হলো, বললো–আচ্ছা চরণ, জন্মোৎসবের পরপরই তুমি রাজবাড়িতে যেয়ো। যে কোনো সন্ধ্যাতেই আমাকে সেখানে পাবে।
জুলুসটা থাকার কথা নয়, ফরাসডাঙায় ঢুকবার মুখেই কুতঘাটের পথ, তা পেতেই রূপচাঁদ তার হাতি ও বরকন্দাজদের নিয়ে চলে গেলো। পিয়েত্রোর হাওয়াঘরের ভিতেই তো মন্দির, তা তখনো এক রশি। নয়নতারা পালকি থামিয়ে নামলো, রাজচন্দ্রকে বললো– রাজকুমার, ঘোড়াটাকে বরকন্দাজকে ধরতে দিলে হয় না? রাজচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলো নয়নতারা এত দূরে নামলো কেন? নয়নতারা বললো–প্রাণ আছে না? তার কথাও আছে?
কাহার বরকন্দাজদের কবল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে মন্দিরের কাছে পৌঁছলো তারা। এ কখনো ঠিক নয়, রাজকুমার তেমন সন্দেহ প্রকাশ করলেও, যে। নয়নতারা তত্ত্বাবধানে আসেনি বলে মিস্ত্রিরা কাজে ঢিল দিয়েছে। মন্দিরটা শেষ হয়নি, ইতিমধ্যে তার মাথা যেন মেঘে। যাকে মন্দিরের শিখর বলা হবে, নিচ থেকে আন্দাজ হয়, তার কাছে কাজ হচ্ছে। চত্বরের নিচে অর্থাৎ পিয়েত্রোর সেই হাওয়াঘরের ভিতের গোড়া থেকে মিস্ত্রিদের পুতুলের মতো ছোটো দেখাচ্ছে। তাদের ডান দিকে নদী, পাড়টা বাঁধানো, মনে হচ্ছে আকাশটা বাঁধের ওদিকটায় নেমে পড়েছে।
কেট এই বিরাটত্বের বিস্ময়টা প্রকাশ করে ফেললো।
উজ্জ্বল মুখে নয়নতারা বললো–এসো এস, আজ আমরা মন্দিরটাকে ভালো করো দেখবো চলল।
