গাইলস এখন, ভাবলো বাগচী, চাকরিটা ভালো পেয়েছে। সেন্ট্রাল স্টেটস এজেন্সির অধ্যক্ষ। এজেন্সিটা কি আগেই ছিলো, নাকি সিপাহী বিদ্রোহের পরে হয়েছে? তখন, তারা যখন মধ্যপ্রদেশে, সে নাগপুরে রেসিডেন্ট ছিলো বটে।
ভাবলো বাগচী, লাঞ্চে আজ আলাপের প্রথম বিষয় ছিলো ডাকে আসা গাইলসের চিঠিটাকে নিয়ে। প্রথমে অবাক লেগেছিলো, গাই তাদের ঠিকানা পেলো কী করে! কেট বলেছিলো, গত ক্রিস্টমাসে তাদের সেই অরফানেজে একসময়ে মানুষ হয়েছিলো এমন কয়েকজনকে কার্ড পাঠিয়েছিলো তাতে এখানকার ঠিকানা ছিলো।
এবার বাগচী চলতে চলতে গাইলসের চিঠিটার কথা ভাবতে লাগলো। আকস্মিক ব্যাপারই বটে। ভাবা যায়নি গাইলস চিঠি লিখে বসবে। ও, গাইলস তার চিঠিতে তাদের ছেড়ে আসা মধ্যপ্রদেশের সেই মিশন হাউস সম্বন্ধে লিখেছে। আঃ কতদূর! নস্ট্যালজিয়া আছে বৈকি! জীবনের ত্রিশ বছর কেটেছিলো যেখানে। কিন্তু শোক করেও লাভ নেই। সে জানতোই বস্তারী আদিবাসীদের গ্রামের সেই ছোটো সুন্দর মিশন হাউস, তার সংলগ্ন অরফানেজ সবই তার শ্বশুরের টাকায় তৈরী, কিন্তু নীতির প্রশ্ন উঠলে জবাব দেওয়া কঠিন।
লন্ডন মিশনের সেই পাদরিকেই যেন সে দেখতে পেলো আবার। গাইলসকে সঙ্গে করেই সে এসেছিলো। গাইলস নাকি মধ্যস্থতা করবে। তো, সেবারই ইউটিলিটেরিয়ান কথাবার্তা বলেছিলো গাইলস। তখন কিন্তু গাইলস তাদের সমর্থন করে একটা কথাও বলেনি, যদিও এ চিঠিটার সুর অন্য রকম। এ চিঠিটা একটা বড়ো ঘটনা বৈকি? সেটাও বেশ বড়ো ঘটনা ছিলো। লন্ডন মিশনের সেই পাদরি যুক্তি দিয়েছিলো কেটের পিতা ফাদার অ্যান্ড্রুজ যে টাকাই জমিয়ে থাকুন তা তো লন্ডন মিশন তাকে যে স্টাইপেন্ড দিতো তা থেকেই, অন্য কোনো উপার্জনই ছিলো না। তিনি যখন অ্যাংলিকান ধর্ম ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন নীতিগতভাবে সেই স্টাইপেন্ডের কোনো অংশেই, তা তিনি যত কষ্ট করেই জমিয়ে থাকুন, তার উপরে তার অধিকার জন্মায় কি? সেই পাদরির আসল উদ্দেশ্য ছিলো মিশন হাউসটা যত কমে সম্ভব কেটের কাছ থেকে কিনে নিয়ে ফাদার অ্যান্ড্রুজ, ইউনিটেরিয়ান মত প্রচার করে যে ক্ষতি করেছিলেন তা শোধরাতে। ক্ষতিটা খৃস্টধর্মের। দুদিন ধরে এসব শোনার পরে কেট বিবর্ণ কিন্তু কঠিন মুখে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর কাছে এসে হাত চেপে ধরে বলেছিলো, ফাদার বাগচী, তুমি একটা সংসার চালাতে পারো? পারো? তবে নিজেদের পোশাক ছাড়া আর কিছু নয়। তারা পরের দিনই প্রায় সে রকমই চিরদিনের জন্য মিশন হাউস ত্যাগ করেছিলো। মৃত পিতার পক্ষ হয়ে তার ধর্মমত ভারতে কিংবা ইংল্যান্ডে মামলা চালানোর ইচ্ছা ছিলো না কেটের। এখন বোঝা যায়, গাই তখনই ইউনিটেরিয়ান মত ছেড়ে দিয়েছিলো।
গাইলস একরকম মামলার কথাই যেন কিছু লিখেছে চিঠিতে। সে অবশ্য বিরক্ত হয়ে চিঠির সেই লম্বা প্যারাগ্রাফটাকে বাদ দিয়েছিলো। বটে? এই বলে বাগচী অন্য দিকে ভাবলো। আত্মা সম্বন্ধে সেই আলাপগুলো করতে গিয়ে আত্মাকে দশশালার জমিদার বলার। কারণ কী গাইলসের সেই বিতর্ক মনে হওয়া কেটের, কিংবা সে যে আত্মার জাতি না থাকার কথা তুলেছিলো তার কারণও কি গাইলসের চিঠির কোনো কথা? তার মন আবার কৌতুকের দিকে ফিরলো।
অনেকসময়ে যেমন হয়, বিরক্তিতে যা দেখিনি বা শুনিনি মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে তা এমন যে ভাবতে গেলে দেখা যায়, তার অনেকটাই মনে ঢুকে গিয়েছে; গাইলসের চিঠির সেই লম্বা প্যারাগ্রাফটার অনেক কথাই বাগচীর মনে আসতে লাগলো। গাইলস লিখেছে : অরফানেজে যারা মানুষ হয়েছিলো তারা তো বটেই মধ্যপ্রদেশে এখানে ওখানে যারাই কোনো না কোনো দিক দিয়ে ইংরেজ রক্তে সংশ্লিষ্ট তাদের এখন ভাবার সময় এসেছে। পিতা ইংরেজ, আইরিশ কিংবা স্কচ, মাতা মুসলমানী গোয়ানীজ, অথবা ভারতীয় আদিবাসী খৃস্টান হোক, পিতার ধর্ম প্রটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, প্রেসবাইটেরিয়ান যাই হোক, তাদের এখন এক হতে হবে। বোঝাই যাচ্ছে, কি ভারতের সরকার, কি ইংল্যান্ডের সরকার কেউই তাদের ইংরেজ বলে স্বীকৃতি দিতে চায় না আর। এক কথায়, ভারতীয় ও ইউরোপীয় মিশ্র রক্তের লোকদের কোনো ভবিষ্যই দেখা যাচ্ছে নানা এদেশে,না ইংল্যান্ডে। কিছুদিন হয় এরকম দশ হাজার অফিসার ও আদার র্যাঙ্কস আর্মি থেকে ছাঁটাই হতে চলেছিলো। সিপাহী যুদ্ধে তাদের শৌর্য, ত্যাগ ইত্যাদি মনে রাখা হয়নি। তাদের অপরাধ তারা ইংল্যান্ড থেকে আগত অফিসার ও আদার র্যাঙ্কসের সমান সুযোগ সুবিধা চেয়েছিলো। এমনকী তিন পুরুষ বৃটিশ রক্তের যোগও হয়েছে যাদের তাদেরও সমস্যার মুখেই পড়তে হবে। এদেশের প্রবাদ অনুসারে না ঘরকা, না ঘাটকা। তোমাদেরও সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবতে হয়। এদেশের সমাজ যা থেকে আমরা শিক্ষা, দীক্ষা, রুচি,নীতি,কালচার, ধর্মে এত পৃথক সেখানে আমরা মিশতে পারি না, অন্যদিকে ইংল্যান্ডই আমাদের দেশ তাই বা বলার সুযোগ কোথায়?
বাগচীর ভ্রু কুঁচকে গেলো। একবার সে ভাবলো, চিঠিটা কেটকে লেখা, সে-ই বুঝবে তা নিয়ে কী করা উচিত। যদি বলল, আমি নিজেকে ইংরেজ বলতে গেলাম কেন? তাতে কিন্তু সমস্যাটা যায় না। জাতিতে ভারতীয় কিন্তু ধর্মে ক্রিশ্চিয়ান বললেও কিন্তু কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়, যদি ইংরেজ বিশেষ স্বীকৃতি তুলে নেয়।
