সুতরাং তাদের গন্তব্য যাই হোক, হাতি, হাতির পরে তার খয়েরি কালো ঘোটকীতে রাজকুমার, পরে সেই জরির ঝালরদার পালকি, তারপর ছুটন্তবরকন্দাজদের নিয়ে রূপচাঁদ, এইভাবে সেই জৌলুসটাকে এগিয়ে যেতে দেখলে বাগচী। সে ভাবলো, কী এমন ব্যাপার আবার রাণীমার শিবমন্দিরে যে আজ এমন উজ্জ্বল শোভাযাত্রা!
কিন্তু কেট এভাবে চলে যাওয়ায় তার কর্তব্য দেখা দিলো। কেট কখন ফিরবে কে জানে, সেও সন্ধ্যার আগে ফিরবে না। তার কুঠিতে ঝি-চাকর বলতে সবেধন এক সহিস। সুতরাং তাকে ডেকে ফাঁকা বাসার দিকে চোখ রাখতে এবং মেমসাহেবের ফিরতে দেরি হলে সন্ধ্যার আগে আগে সহিস যেন কয়েকটা বাতি জ্বালায় এমন নির্দেশ দিলো সে। এইসময়ে তার মনে হলো তাদের কুঠিতে ঝি, চাকর, আয়া, খিদমদগার বলতে কেউ নেই।
এখন আর দ্বিধা হয় না। কিন্তু কেট তার স্ত্রী হওয়ার পরে মনে হতো বৈকি বাগচীর, কেটের মতো ইওরোপীয় কোনো মহিলার কুঠিতে এদেশে অন্তত, কাজ থাক আর নাথাক, সহিস ছাড়াও একজন ফুটম্যান, একজন বাবুর্চি, অন্তত চার-পাঁচজন ঝি-চাকর থাকে। কেটের বাবা ফাদার অ্যানড্রজের সেন্ট্রাল প্রভিন্সের মিশন-বাংলোতেও তা থাকতো। প্রথম যখন এখানে তারা এসেছিলো দেওয়ানজি নিজে থেকেই ঝি-চাকর ঠিক করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। বাগচীর মনে আছে, সে নিজে বলেছিলো দুজনের ছোট্ট একটা সংসার, সেলফ হেল্পই ভালো হবে। কেট হেসে বলেছিলো, আমাদের দেশে মধ্যবিত্তদের পরিবারে ঝি চাকর তেমন থাকে না। এদেশে থেকে যারা টাকাপয়সা করে তাদের কথা আলাদা। পরে কেট তাকে বলেছিলো, এদেশে সমাজ কোথায় যে মান রাখতে ঝি-চাকর রাখতে হবে?
এটা কিন্তু বাগচী হালকা মনে তার স্কুলের দিকে যেতে যেতে ভাবলো, সেলফ-হেল্প ভালো, আর সমাজে মান রাখার প্রয়োজনের অভাব কি দুরকম কথা নয়? এইসময়ে বাগচী তার চোখের উপরেই যেন কেট ও নয়নতারার সেই উজ্জ্বল শোভাযাত্রাটাকে দেখতে পেলো। কী যেন? নিজের মনে এই প্রশ্ন করলো বাগচী হাসি হাসি মুখে। মনে পড়ায় সে হাসলো। এখানে আসার পরে মনে মনে সে বললো, তোমার মনে পড়বে কেট, পালকি চড়া নিয়ে সে বেশ একটা ব্যাপার হয়েছিলো। দেওয়ানজি কুতঘাটে পালকি রেখেছিলো। এখানে সমাজের উচ্চতর অংশের তাই তো স্বাভাবিক যানবাহন। সেদিন কিন্তু সে কিংবা কেট প্রথম দিনেই পালকিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো, এমনকী সে নিজে মানুষের ঘাড়ে চেপে স্বর্গে যাওয়ার চেষ্টা করে নহুশের দুর্গতির গল্পটা বলেছিলো। এসব ব্যাপারে কি মন আগে থেকেই তৈরী হতে থাকে? কেটের পৈত্রিক মিশন হাউস, যা অবশ্য তারও একমাত্র আশ্রয় ছিলো আবাল্য, তা ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে আরো অনাড়ম্বর জীবনের দিকে ঝোঁক দেখা দিয়েছিলো তাদের? তা অবশ্য বাস্তবিক, কারণ তখন তো স্কুলমাস্টারের বেতনই তাদের উপজীবিকা।
বাগচী লঘু মনে হাসলো।
বাস্তব পরিস্থিতি আর নীতিতে বেশ মিল তোর কিন্তু না, এটা নিয়ে হাসাহাসি নয়। আজ লাঞ্চে হাসাহাসিটা হয়েছিলো অন্য ব্যাপারে। রোসো, কেটের পালকি চড়া নিয়ে আজ সন্ধ্যায় ক্ষেপিয়ে তোলা যাবে। কী গো, এ কি ডু অ্যাজ দ্যা রোম্যান ডাজ! বেশ তো পালকিতে চড়লে!
কয়েক পা গিয়ে তার মনে হলো এটা ঠিক তার হাসির ব্যাপার নয়। আজ লাঞ্চে বসে বেশ হাসাহাসিই হয়েছিলো, এমনকী রাজকুমার এসে পড়ার আগেও সেব্যাপারটা নিয়ে তারা রঙ্গ করছিলো। বলতে পারো অন্যত্র যাই হোক একজন পাদরির বাড়িতে তা বেশ গম্ভীর বিষয় হওয়া উচিত। কথাটা বোধ হয় স্কুলে বিজ্ঞানের দিকে ঝোঁক দেওয়ার কথা থেকে কেট তুলেছিলো। আত্মা আর মন নিয়ে কথা উঠেছিলো। এক সময়ে হাসতে হাসতে কেট বলেছিলো, মনের চোখ, কান, নাক এসব, বুদ্ধি, চেতনা এসব আছে, বেচারা আত্মার? নাকি সে দশশালার জমিদার যে মনের উপরে ম্যানেজারি ছেড়ে দিয়ে নিজে মজা নিয়ে আছে। বাগচী বলেছিলো তাহলে কান্টকে আনতে হয়। কেট কপট আশঙ্কায় বলেছিলো, না না, এখন লাঞ্চ। কিন্তু কম দুষ্টু ভেবেছো? –ভাবলো বাগচী, কিছুক্ষণ পরেই আবার বলেছিলো, আচ্ছা, চেহারা, স্বভাব, গলার স্বর, পশুপাখি থেকে মানুষ, সকলেই অনেক পরিমাণে পিতামাতার কাছে পায়, কিন্তু আত্মা? তা কি দুই আত্মার থেকে কিছু কিছু নিয়ে তৃতীয় একটি বাগচী মনে মনে হাসলো। তো, সেও বেশ একটা লাগসই কথা বলেছিলো; হিন্দুদের বেশ একটা ধারণা আছে, আত্মার জাতি নেই, পুরুষ আত্মা, স্ত্রী আত্মা, ইহুদি আত্মা, মুসলমান আত্মা এরকম নাকি হয়না। যদি থাকে তাহলে তার সমাজই বা কি? ভালোমর বিচারও বারো আনা চলে যায়।
এখন বাগচী ভাবলো, একটা কথা কিন্তু ভাববার মতো। আত্মার চোখ কান না থাক তার একটা প্রজ্ঞা আছে যাকে স্বজ্ঞাও বলা যায়। মনই বরং অনেক বুদ্ধি বিবেচনা করে চলে। কিন্তু তাতে চালাকিও থাকেনাকি? যেমন মন ভদ্রতার খাতিরে সমাজের সঙ্গে মানিয়ে চলতে যা সে চাইছে না তা করে, বলে। ফাঁক থেকে যায় না?
কিন্তু এটা তার চিন্তার বিষয় নয়। তার মনে তলায় তলায় যে চিন্তা চলেছিলো তা প্রকাশ পেতেই সে অবাক হলো। এই গ্রামের সমাজ, কি আশ্চর্য, আজকার এই শোভাযাত্রা, যেমন জোনাথন গাই বলতো, দশশালা বন্দোবস্তের ফল? অর্থাৎ নিজেদের ধন উৎপাদনের শ্রম করতে হয় না এমন এক শ্রেণীর ব্যসন? কিন্তু ওদিকে আবার গাইলস, যেনাকি মতবাদে মিলকে অনুসরণ করে, নিজেকে প্রকাশ্যে ইউটিলিটেরিয়ান বলে, বলে বৃটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভারতকে উন্নত করার জন্যই, সে নিজেই স্বীকার করেছিলো কর্নওয়ালিশ কতগুলো দালাল সৃষ্টি করেনি, ইংল্যান্ডের ভূমি-আভিজাত্যই অনেকটা এখানে প্রবর্তন করতে এসেছিলো। স্বীকার করেছিলো ইংল্যান্ডের তারাও শ্রম করে খায় না এবং ব্যসনও যথেষ্ট। দশশালার আগেকার জায়গীরদার প্রথাতে রায়তের অবস্থা ভালো না হয়ে বরং আরো খারাপ ছিলো নাকি।
