নয়নতারা বললো–ন্যায়রত্ন বলতেন মহাভারত বৃক্ষ।
–সেই যার মূল ধৃতরাষ্ট্র মহারাজা? সে তো সাধারণ মতই।
–ঠিক নয়। বলতেন বৃক্ষ জমি অনুসারে বৃদ্ধি পায়। মন অনুসারে মহাভারতের বৃদ্ধি।
কথাটা ভেবে দেখার মতো।
রানী স্থির করলেন তাকে এবার থেকে ভাবতে হবে। কিন্তু এখন নয়, অন্তত নয়নতারার পাশে থেকে নয়, যেমন নয় বিবর্ণমুখ তার সেই বর্ষীয়সী আত্মীয়াদের কাছে বসে। বিষয়টাকে নিজের আয়ত্তে এনে চিন্তা করতে হবে।
রানী বললেন–আ, নয়ন, ফরাসডাঙার ব্যাপারটা ভাবতে হয়। ওরা কি করছে? এবার শিবচতুর্দশীতেই কি সেখানে পুজো হবে? কেউ সেদিকটাকে দেখছে না যেন। ওদিকটার ভার নেবে? প্রকৃতপক্ষে রাজবাড়ির পুজোটুজোর ব্যাপারে বিশেষভাবে যাকে দায়িত্ব দেওয়া যায় এমন একজন কেউ নেই। নেবে সে ভার?
আপনার প্রয়োজন হলে তা করবো।
একবার রানী ভাবলেন নয়নতারার পাশে কি সত্যি তিনি ক্ষুদ্রকায়া ও মলিন হয়ে গেলেন? তা অবশ্যই নয়। নয়নতারা এখনো প্রাপ্তবয়স্ক রাজুকেও প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। এটা ভাবতে গিয়ে তেমন বোকামির কথা মনে এসে থাকবে? আসলে তিনি যা অনুভব করছেন তাকে কথায় আনলে এরকম হয়? আর দ্যাখো এই গরবিনীর রূপ, এই রূপসীর তেজ। চোখ দুটোকে দেখেছো?
স্নানের ঘাটে বসলেন রানী।
০৭. নয়নতারা রাজবাড়ির পালকিতে
সপ্তম পরিচ্ছেদ
০১.
সুতরাং একদিন পরেই নয়নতারা রাজবাড়ির পালকিতে ফরাসডাঙা চলেছিলো। তখন শীতের আরামদায়ক উষ্ণতার মধ্যাহ্ন। যোগাযোগের ফলে নয়নতারার পালকিতে হেডমাস্টারের স্ত্রী ক্যাথরিন, কেট। পালকির পাশে, কখনো কিছু আগে, রাজকুমার রাজচন্দ্র তার খয়েরি কালো প্রকাণ্ড ঘোটকীতে। পালকির কিছু আগে হাওদাদার হাতি, পায়ে পায়ে কয়েকজন বরকন্দাজ, পালকির পিছনে আর কয়েকজন বরকন্দাজের আগে আগে রূপচাঁদ। একটা চোখ ধাঁধানো শোভাযাত্রা।
যোগাযোগটা এই রকম। নয়নতারা আহারদি শেষে বন্দোবস্ত মতো নিজের বাড়ি থেকে রাজবাড়ির পালকিতে রওনা হয়েছিলো, পালকির সঙ্গে একজন বরকন্দাজ থাকেই। রাজুর তা জানার কথা নয়। আহারাদি শেষে দুপুরের রোদ ঝুলবারান্দায় যেখানে আরামদায়ক সেখানে দাঁড়িয়ে সে অন্যমনস্ক হয়ে নিচে কাছারি চত্বরে হাওদাদার হাতি, রূপচাঁদ,বরকন্দাজ প্রভৃতি দেখছিলো। কে যেন বললো, এরা কুতঘাটে যাবে। কুতঘাট বর্তমানে ফরাসডাঙা ঘেঁষে পড়েছে। তাতে রাজুর মনে হলো সেও ফরাসডাঙা যাওয়ার কথা ভাবছে। এই দুপুরটা তা যাওয়ার মতোই। সুতরাং সে আস্তাবল থেকে নতুন ঘোটকটাকে আনিয়ে রওনা হয়েছিলো।
রাজচন্দ্রর ঘোড়া যখন হেডমাস্টারের বাড়ির কাছে, সে দেখতে পেয়েছিলো গেটের বাইরে টপহ্যাট মাথায় ছাতা হাতে বাগচী, গেটের ভিতরে কিন্তু গেটের উপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে কেট। সে সুতরাং লাগাম টেনে সেখানকার রোদে দাঁড়িয়ে গল্পে জমেছিলো।
রূপচাঁদ গঞ্জের পথে উঠেই রাজবাড়ির সেই ঝালরদার আট বেহারার পালকি দেখে মাহুতকে হাতি ধীরে নিতে বলে পালকির দিকে নিজে এগিয়েছিলো। পালকির কাছে যেইমাত্র বুঝেছে পালকিতে নয়নতারা, তখনই অদূরে হেডমাস্টারের গেটের সামনের দৃশ্যটাও দেখতে পেলো। বললো, রাজকুমারকে দেখছি।
রূপচাঁদের কথায় পালকির দরজা আর একটু মেলে নয়নতারাও রাজকুমারকে দেখতে পেয়ে পালকি থামিয়েছিলো।
নিজেদের অজ্ঞাতসারে পালকি, হাতি, রূপচাঁদ এবং বরকন্দাজেরা যে শোভাযাত্রা তৈরী করেছিলো তা নিঃশব্দও নয়। বেহারাদের হুমহাম,হাতির গলার ঘণ্টা তো ছিলোই। পালকির ঝালরে, হাতির জামায়, বরকন্দাজদের পাগড়িতে তা রংদারও বটে।
নয়নতারা স্পষ্ট কিন্তু নিচু গলায় বললো–বেশ একটা ছবিই যেন। তার বক্তব্য ছিলো কেট, বাগচী ও রাজকুমারের সংযোগকে উদ্দিষ্ট করে।
রাজচন্দ্র মুখ ফিরিয়ে নয়নতারাকে দেখে হেসে বললো–কোথায় চলেছছ? দ্যাখো, দ্যাখো কেট, কবরেজমশায়ের রোগী দেখতে যাওয়া কাকে বলে।
নয়নতারা বললো, প্রজাদের নানা উপজীবিকা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু সামনে পিছনে চেয়ে সেই জৌলুস চোখে পড়ায় সেও বিস্মিত এবং লজ্জিত হলো। উপরন্তু বাগচীও তাকে বিস্মিত হয়ে দেখছে, আর বাগচীর সঙ্গে ছদ্ম ব্যবহারও চলে না। নয়নতারা একেবারে সহজ হয়ে বলনোক্যাথরিন, ফরাসডাঙার মন্দির দেখতে যাচ্ছি। তুমিও এসো না। এতক্ষণে তোমাদের লাঞ্চে নিশ্চয় শেষ হয়েছে।
কেট না-যাওয়ার অজুহাত হিসাবে বললে হাসিমুখে–জৌলুস থামিয়ে তো পোশাক করা যায় না, আর পোশাক না করে জৌলুসেও যাওয়া যায় না।
নয়নতারা সুবিধা পেয়ে বললো–যে পোশাকে রাজকুমারের সঙ্গে দেখা করা চলে সে পোশাকে তার রাজ্যে সর্বত্রই মুখ উঁচু করে চলা যায়। এসো এসো।
বাগচী হেসে বললো–যুক্তিতে হারলে কেট। অন্য কহ আর। কিংবা যাও না রোদটা গায়ে লাগাতে!
রাজকুমার বললো–গেট ইন, গেট ইন।
নয়নতারা বললো–ওমা, ইংরেজি বলছেন যে! শিগগির পালিয়ে এসো।
বাকিটা অবশ্যই তরুণী মনের রঙ্গমুখিনতা।
পালকির কাছাকাছিদলপতি রূপদ থেমে দাঁড়ানোর ফলে মাহুত তার হাতিকে খানিকটা এগিয়ে পথের ধারে দাঁড় করিয়েছিলো, রূপচাঁদের সঙ্গের বরকন্দাজেরা পালকির কিছু পিছনে। তাদের গন্তব্য যাই হোক রাজকুমারকে ডিঙিয়ে চলে যেতে কোনোরকমের একটা ইশারা চাই।
কেট পালকিতে উঠলে, পালকি কাহারদের কাঁধেউঠলে,নয়নতারা মুখ বাড়িয়ে বললো, আগে আগে চলুন রাজকুমার। রাজচন্দ্র বরং দ্বিধা করলো। ফরাসডাঙায় সে যেজন্য যাচ্ছে তা কি নয়নতারাদের সঙ্গে গেলে সার্থক হয়? তখন নয়নতারা হেসে কেট আর রাজচন্দ্র যাতে শোনে শুধু এমন গলায় বললো–দ্যাখো কেট, তোমাকে বলেছিলাম, হিন্দুদের অমন যে সদাশিব তারও বর দিতে কত বায়নাক্কা। কেট সম্ভবত নয়নতারা কবে এরকম বলেছিলো কী অর্থে তা ভেবে দেখতে গেলে, ফলে সে নয়নতারার জ্বর জ্যামুক্ত তীরটাকে দেখতে পেলো না।
